SURAH 28 : Al-Qasas

আয়াত ১

طسم

“ত্বা, সীন, মীম (আল্লাহর কিতাবের সুনির্দিষ্ট সুবিন্যস্ত সংকেত বা আইনি অনুশাসনের মূল চালিকাশক্তি ও মনস্তাত্ত্বিক চাবিকাঠি)।”


আয়াত ২

تِلْكَ آيَاتُ الْكِتَابِ الْمُبِينِ

“এগুলো হলো অত্যন্ত সুবিন্যস্ত, প্রকাশ্য ও অকাট্য বিধি-বিধানের নিদর্শন সংবলিত এক সুস্পষ্ট কিতাবের বাণী।”


আয়াত ৩

نَتْلُو عَلَيْكَ مِن نَّبَإِ مُوسَىٰ وَفِرْعَوْنَ بِالْحَقِّ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ

“আমি তোমার সামনে মূসা এবং ফেরাউনের সেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক ও বৈপ্লবিক সংবাদ পরম ও অকাট্য বাস্তব সত্যের সাথে ধারাবাহিক বিশ্লেষণ করে উপস্থাপন করছি (Natlū 'alayka min naba'i Mūsā wa Fir'awna bil-haqq), এমন এক জাতির কল্যাণের জন্য যারা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের ভিত্তিতে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে।”


আয়াত ৪

إِنَّ فِرْعَوْنَ عَلَا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَ أَهْلَهَا شِيَعًا يَسْتَضْعِفُ طَائِفَةً مِّنْهُمْ يُذَبِّحُ أَبْنَاءَهُمْ وَيَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ ۚ إِنَّهُ كَانَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ

“নিশ্চয়ই ফেরাউন সেই ভূখণ্ডে বা সমাজ-ক্ষেত্রে চরম ঔদ্ধত্য ও স্বৈরাচারী দাপট প্রদর্শন করেছিল ('Alā fil-ardi) এবং সেখানের অধিবাসীদের বিভিন্ন মনগড়া উপদল ও দলবাজিতে টুকরো টুকরো করে বিভক্ত করেছিল (Waja'ala ahlahā shī'aā), সে তাদের মধ্যকার একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী বা সমাজকে চরমভাবে দুর্বল ও শোষিত করে রেখেছিল; সে তাদের সুসংগত আদর্শিক অনুসারী বা শক্তিসমূহকে সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয় ও জবাই করত (Yuzabbihu abnā'ahum) এবং তাদের নরম, ফলপ্রসূ ও উৎপাদনশীল ক্ষেত্রসমূহকে নিজেদের স্বার্থে বাঁচিয়ে বা বাঁচিয়ে রাখত; নিশ্চয়ই সে ছিল চরম বিশৃঙ্খলা ও অবক্ষয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত।”

Keywords:

  • يُذَبِّحُ أَبْنَاءَهُمْ (Yuzabbihu abnā’ahum): আক্ষরিক নবজাতক শিশু জবাই নয়, বরং শোষিত সমাজের উদীয়মান সুসংগত মেধা, যুবশক্তি ও বিপ্লবী চালিকাশক্তিকে শুরুতেই আইনি বা প্রশাসনিক দমনে পিষে ফেলা।
  • وَيَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ (Wayastahyī nisā’ahum): আক্ষরিক নারী বাঁচিয়ে রাখা নয়, বরং সমাজের উৎপাদনশীল খাত, সম্পদ ও নরম ক্ষেত্রগুলোকে শোষকদের দাসত্বে টিকিয়ে রাখা।

আয়াত ৫

وَنُرِيدُ أَن نَّمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الْأَرْضِ وَجَعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ

“অথচ আমি এই সুনির্দিষ্ট বৈপ্লবিক ইচ্ছা পোষণ করেছিলাম যে—যাদেরকে সেই ভূখণ্ডে চরমভাবে দুর্বল, শোষিত ও অবদমিত করে রাখা হয়েছিল, আমি তাদের ওপর বিশেষ অনুগ্রহের নিয়ামত বর্ষণ করব (An namunna 'alal-lazīnas-tud'ifū), এবং আমি তাদেরকেই সমাজে সুদৃঢ় আদর্শিক নেতা বা গাইড বানাবো এবং তাদেরকেই এই সমাজ ও পৃথিবীর চূড়ান্ত উত্তরাধিকারী বা Custodian নিযুক্ত করব।”


আয়াত ৬

وَنُمَكِّنَ لَهُمْ فِي الْأَرْضِ وَنُرِيَ فِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا مِنْهُم مَّا كَانُوا يَحْذَرُونَ

“এবং আমি সেই ভূখণ্ডে তাদের জন্য এক সুদৃঢ় সাংগঠনিক ভিত্তি ও ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করব (Wanumakkina lahum fil-ardi), আর ফেরাউন, হামান এবং তাদের সেই শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বাহিনীকে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করাবো—সেই শোষিত দুর্বল শ্রেণীর পক্ষ থেকেই এমন এক বৈপ্লবিক আঘাত বা উলটপালট, যা থেকে তারা নিজেরা অবিরত সুরক্ষামূলক সতর্ক থাকত।”

Keywords:

  • هَامَانَ (Hāmān): ফেরাউনের প্রধান আমলা বা ধর্মীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাতিষ্ঠানিক যাজক গোষ্ঠী, যা স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে অপদর্শনের জাল বুনে।

আয়াত ৭

وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ أُمِّ مُوسَىٰ أَنْ أَرْضِعِيهِ ۖ فَإِذَا خِفْتِ عَلَيْهِ فَأَلْقِيهِ فِي الْيَمِّ وَلَا تَخَافِي وَلَا تَحْزَنِي ۖ إِنَّا رَادُّوهُ إِلَيْكِ وَجَعَلُوهُ مِنَ الْمُرْسَلِينَ

“এবং আমি মূসার মূল গর্ভাশয় বা সাংগঠনিক লালন-অনুকম্পার মাতৃ-ম্যাট্রিক্সের প্রতি এই মর্মে তীব্র সুক্ষ্ম বার্তা অবতীর্ণ করেছিলাম (Wa awhaynā ilā ummi Mūsā)—তুমি একে (মূসার এই নতুন বিপ্লবী মেধাকে) প্রথম স্তরে পুষ্ট বা স্তন্যদান করো; অতঃপর যখনই তুমি এর নিরাপত্তার বিষয়ে প্রতিপক্ষের চরম আঘাতের আশঙ্কা করবে, তখন তুমি সেটিকে সেই সামাজিক সংঘাত ও প্লাবনের উত্তাল স্রোতধারায় অর্পণ বা নিক্ষেপ করো (Fa-alqīhi fil-yammi), আর তুমি বিন্দুমাত্র ভীত বা চিন্তিত হয়ো না; নিশ্চয়ই আমি একে পুনরায় তোমারই সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে দেব এবং একে সুনির্দিষ্ট শাসনতান্ত্রিক বাণীবাহকদের অন্তর্ভুক্ত করব।”

Keywords:

  • أُمِّ مُوسَىٰ (Ummi Mūsā): আক্ষরিক মা ছাড়াও এর সাংগঠনিক অর্থ—মূসার মেধা ও চেতনার আদি উৎস, গোপন বিপ্লবী সেল বা প্রারম্ভিক সুরক্ষামূলক লালন-কাঠামো।
  • فِي الْيَمِّ (Fil-yamm): আক্ষরিক নীল নদ বা জলপ্রবাহ নয়, বরং উত্তাল সমাজ-বাস্তবতার এমন এক উন্মুক্ত স্রোতধারা বা রাজনৈতিক প্লাবন যেখানে সাধারণ মানুষ বা শত্রুর চোখ এড়িয়ে কোনো মেধা বিকসিত হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া হয়।

আয়াত ৮

فَالْتَقَطَهُ آلُ فِرْعَوْنَ لِيَكُونَ لَهُمْ عَدُوًّا وَحَزَنًا ۗ إِنَّ فِرْعَوْนَ وَهَامَانَ وَجُنُودَهُمَا كَانُوا خَاطِئِينَ

“অতঃপর ফেরাউনের সেই রাজকীয় ক্ষমতার চক্র বা এলিট পরিবারটি তাকে (সেই সামাজিক স্রোত থেকে কুড়িয়ে) নিজেদের আওতাভুক্ত করল (Faltaqatahu ālu Fir'awna), যাতে চূড়ান্ত পরিণতিতে সে তাদের নিজেদের জন্যই এক চরম শত্রু এবং সীমালঙ্ঘনের গভীর যন্ত্রণার কারণ হতে পারে; নিশ্চয়ই ফেরাউন, হামান এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বাহিনী ছিল এক অত্যন্ত বড় ভুল ও ভ্রান্ত নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত।”


আয়াত ৯

وَقَالَتِ امْرَأَتُ فِرْعَوْنَ قُرَّتُ عَيْنٍ لِّي وَلَكَ ۖ لَا تَقْتُلُوهُ عَسَىٰ أَن يَنفَعَنَا أَوْ نَتَّخِذَهُ وَلَدًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ

“আর ফেরাউনের সেই সহযোগী ক্ষেত্র বা রাজমহিষী বলেছিল (Wa qālatim-ra'atu Fir'awna): এ তো আমার জন্য এবং আপনার জন্যও এক পরম চক্ষুশীতলকারী ও স্বস্তির উৎস হতে পারে! তোমরা একে কোনো অবস্থাতেই হত্যা বা অবদমন কোরো না, আশা করা যায় সে আমাদের বড় কোনো প্রাতিষ্ঠানিক উপকারে আসবে অথবা আমরা একে নিজেদের সুযোগ্য উত্তরসূরি বা সন্তান হিসেবে গ্রহণ করতে পারব; অথচ তারা বিন্দুমাত্র টের পাচ্ছিল না যে তারা নিজেদের বিনাশের বীজ নিজেরাই বপন করছে।”


আয়াত ১০

وَأَصْبَحَ فُؤَادُ أُمِّ مُوسَىٰ فَارِغًا ۖ إِن كَادَتْ لَتُبْدِي بِهِ لَوْلَا أَن رَّبَطْنَا عَلَىٰ قَلْبِهَا لِتَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ

“এবং মূসার সেই আদি লালন-উৎসের বা মাতার অভ্যন্তরীণ অনুভূতিপ্রবণ চিন্তাকেন্দ্রটি (আশঙ্কায়) সম্পূর্ণ শূন্য ও ব্যাকুল হয়ে পড়ল (Wa asbaha fu'ādu ummi Mūsā fārighā); সে যদি সত্য প্রকাশ করে চরম সাংগঠনিক ভুল করে বসত—যদি না আমি তার সচেতন মনকে সুদৃঢ় রজ্জু দিয়ে শক্তভাবে বেঁধে রাখতাম ও স্থিরতা দিতাম (Lawlā ar-rabatnā 'alā qalbihā), যাতে সে পরম সুরক্ষামূলক ইমানদারদের অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।”

Keywords:

  • رَّبَطْنَا (‘Alā qalbihā): আল্লাহর অমোঘ নিয়মে মানুষের মনকে কঠিন সংকটের মুখেও অটল ধৈর্য, স্থিরতা ও সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক ভারসাম্য দান করা।

আয়াত ১১

وَقَالَتْ لِأُخْتِهِ قُصِّيهِ ۖ فَبَصُرَتْ بِهِ عَن جُنُوبٍ وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ

“এবং সে তার (মূসার) আদর্শিক ভগ্নিকে বা সহযোগী শাখাকে নির্দেশ দিয়েছিল: তুমি এর প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সুক্ষ্মভাবে অনুসরণ করো; অতঃপর সে প্রতিপক্ষের অগোচরে এক সুদূর প্রান্ত বা পাশের কোণ থেকে অত্যন্ত নিপুণভাবে তাকে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করল, অথচ তারা বিন্দুমাত্র সেটির তাৎপর্য টের পাচ্ছিল না।”


আয়াত ১২

وَحَرَّمْنَا عَلَيْهِ الْمَرَاضِعَ مِن قَبْلُ فَقَالَتْ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَىٰ أَهْلِ بَيْتٍ يَكْفُلُونَهُ لَكُمْ وَهُمْ لَهُ نَاصِحُونَ

“আর আমি ইতিপূর্বে মূসার সেই মেধার ওপর প্রতিপক্ষের সমস্ত মনগড়া লালনকারী বা স্তন্যদাত্রী প্রতিষ্ঠানের পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করা আইনিভাবে নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলাম (Wa harramnā 'alayhil-marādi'a); অতঃপর সে (তার বোন) সুযোগ বুঝে রাজদরবারে বলল: আমি কি আপনাদের এমন এক নির্ভরযোগ্য আদর্শিক কেন্দ্রের সন্ধান দেব—যারা আপনাদের হয়ে এর লালন-পালন ও সার্বিক সুরক্ষার দ্বিগুণ দায়িত্ব অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গ্রহণ করবে (Yakfulūnahū lakum), এবং তারা এর প্রতি পরম কল্যাণকামী ও আন্তরিক উপদেষ্টা হবে?”


আয়াত ১৩

فَرَدَدْنَاهُ إِلَىٰ أُمِّهِ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ وَلِتَعْلَمَ أَنَّ وَعْدَ اللَّهِ حَقٌّ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

“এভাবেই ওলটপালট সম্পন্ন হলো; আমি তাকে পুনরায় তার সেই আদি লালন-উৎস বা মাতার কোলেই ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চোখ পরম শান্ত ও শীতল হয় এবং সে বিন্দুমাত্র কোনো মানসিক যন্ত্রণায় না ভোগে, এবং সে যেন চাক্ষুষ জ্ঞানে সুস্পষ্ঠভাবে অনুধাবন করতে পারে যে—নিশ্চয়ই আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি বৈপ্লবিক প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণ অকাট্য বাস্তব সত্য (Anna wa'dallāhi haqqun); কিন্তু অধিকাংশ মানুষই এই অমোঘ নিয়ম বিন্দুমাত্র জানে না।”


আয়াত ১৪

وَلَمَّا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَاسْتَوَىٰ آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا ۚ وَكَذَٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ

“অতঃপর মূসা যখন নিজের পূর্ণ শারীরিক ও মানসিক শক্তিমত্তার পরিপক্বতায় পৌঁছাল এবং সম্পূর্ণ সুষম ও সুপ্রতিষ্ঠিত হলো (Walammā balagha ashuddahū wastawā), তখন আমি তাকে দান করলাম চূড়ান্ত আইনি প্রজ্ঞা, শাসনক্ষমতা এবং অকাট্য ঐশী জ্ঞান (Ātaynāhu Hukman wa 'ilmā); আর এভাবেই আমি সমাজে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠাকারী এহসানকারীদের সর্বোত্তম প্রতিদানে ভূষিত করি।”


আয়াত ১৫

وَدَخَلَ الْمَدِينَةَ عَلَىٰ حِينَ غَفْلَةٍ مِّنْ أَهْلِهَا فَوَجَدَ فِيهَا رَجُلَيْنِ يَقْتَتِلَانِ هَٰذَا مِن شِيعَتِهِ وَهَٰذَا مِنْ عَدُوِّهِ ۖ فَاسْتَغَاثَهُ الَّذِي مِن شِيعَتِهِ عَلَى الَّذِي مِنْ عَدُوِّهِ فَوَكَزَهُ مُوسَىٰ فَقَضَىٰ عَلَيْهِ ۖ قَالَ هَٰذَا مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ ۖ إِنَّهُ عَدُوٌّ مُّضِلٌّ مُّبِينٌ

“এবং সে (মূসা) সেই ক্ষমতার প্রধান শহর বা প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্রে প্রবেশ করল এমন এক সময়ে যখন সেখানের অধিবাসীরা চরম উদাসীনতা ও অসচেতনতার মধ্যে ডুবেছিল; অতঃপর সে সেখানে দুই ব্যক্তিকে তীব্র কোন্দল ও মারামারিতে লিপ্ত অবস্থায় দেখতে পেল—যার একজন ছিল তার নিজেরই আদর্শিক উপদলের অন্তর্ভুক্ত (Min shī'atihī), এবং অন্যজন ছিল তার চরম শত্রুপক্ষের অন্তর্ভুক্ত; তখন তার নিজের উপদলের লোকটি শত্রুপক্ষের লোকটির বিরুদ্ধে তার নিকট তীব্র আর্জি ও সাহায্য প্রার্থনা করল, অতঃপর মূসা (অন্যায় প্রতিরোধে) তাকে এক তীব্র ঘুষি বা ধাক্কা মারল, অমনি সেটির প্রভাবে তার কর্মের চূড়ান্ত সমাপ্তি বা মৃত্যু ঘটে গেল (Favakazahū Mūsā faqadā 'alayhi); মূসা (চরম অনুশোচনায়) বলল: এই যে উত্তেজনার ঘটনাটি ঘটে গেল, তা তো উগ্র শয়তানি মানসিকতা ও কুপ্রবৃত্তির তাড়না ব্যতিরেকে আর কিছুই নয়; নিশ্চয়ই সে হলো এক প্রকাশ্য শত্রু যা মানুষকে চরম লক্ষ্যহীন বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয়।”


আয়াত ১৬

قَالَ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي فَاغْفِرْ لِي فَغَفَر‏َ لَهُ ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ

“সে অবিরত আবেদন করেছিল: হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমি (এই অনিচ্ছাকৃত আবেগীয় উত্তেজনার কারণে) নিজের সত্তার ওপর ভারসাম্য নষ্ট করে অন্যায় করেছি, সুতরাং তুমি আমাকে সুরক্ষার ঢাল ও মার্জনা দাও; অতঃপর তিনি তার প্রতি তাঁর সুরক্ষার তাওফিক ফিরিয়ে দিলেন; নিশ্চয়ই তিনি পরম সুরক্ষাদাতা, পরম দয়ালু।”


আয়াত ১৭

قَالَ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِّلْمُجْرِمِينَ

“সে দৃঢ় সংকল্প করে বলেছিল: হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার ওপর যে বিশেষ জ্ঞান ও সুরক্ষার নিয়ামত বর্ষণ করেছ, তার কসম—আমি ভবিষ্যতে কখনই কোনো অপরাধী বা সমাজ-বিধ্বংসী চক্রের বিন্দুমাত্র কোনো সাহায্যকারী বা পৃষ্ঠপোষক হব না (Falan akūna zahīral-lil-mujrimīn)।”


আয়াত ১৮

فَأَصْبَحَ فِي الْمَدِينَةِ خَائِفًا يَتَرَقَّبُ فَإِذَا الَّذِي اسْتَنصَرَهُ بِالأَمْسِ يَسْتَصْرِخُهُ ۚ قَالَ لَهُ مُوسَىٰ إِنَّكَ لَغَوِيٌّ مُّبِينٌ

“অতঃপর সে সেই প্রধান শহরে এক অত্যন্ত আতঙ্কিত ও সদা সতর্ক নজরদারির অবস্থায় সকাল অতিবাহিত করল; এমতাবস্থায় আচমকা সে দেখতে পেল—যে ব্যক্তিটি গতকাল তার নিকট সাহায্য চেয়েছিল, সে আজ আবারও দূর থেকে তীব্র চিৎকার করে তাকে ডাকছে; মূসা তাকে কঠোর ভাষায় বলল: নিশ্চয়ই তুমি তো এক অত্যন্ত প্রকাশ্য, জঘন্য ও নীতিহীন অবাধ্য বা বিভ্রান্ত ব্যক্তি!”


আয়াত ১৯

فَلَمَّا أَنْ أَرَادَ أَن يَبْطِشَ بِالَّذِي هُوَ عَدُوٌّ لَّهُمَا قَالَ يَا مُوسَىٰ أَتُرِيدُ أَن تَقْتُلَنِي كَمَا قَتَلْتَ نَفْسًا بِالأَمْسِ ۖ إِن تُرِيدُ إِلَّا أَن تَكُونَ جَبَّارًا فِي الْأَرْضِ وَمَا تُرِيدُ أَن تَكُونَ مِنَ الْمُصْلِحِينَ

“অতঃপর মূসা যখন উভয়েরই সেই সাধারণ শত্রু বা নিপীড়ক লোকটির ওপর তীব্র প্রশাসনিক বা আইনি অ্যাকশন বা আক্রমণ করতে উদ্যত হলো (An yabtisha billazī), তখন সে (ভীত হয়ে) চিৎকার করে বলে উঠল: হে মূসা! তুমি কি আজ আমাকেও ঠিক সেইভাবেই হত্যা করতে চাও যেভাবে গতকাল এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে? তুমি তো এই ভূখণ্ডে বা সমাজে কেবল একজন চরম উদ্ধত, স্বৈরাচারী ও জবরদস্তিকারী অত্যাচারী হতে চাচ্ছ (An takūna jabbāran fil-ardi), অথচ তুমি কোনো অবস্থাতেই সমাজে সংশোধনমূলক ও ভারসাম্য স্থাপনকারী মصلিনহদের অন্তর্ভুক্ত হতে চাচ্ছ না!”


আয়াত ২০

وَجَاءَ رَبْجُلٌ مِّنْ أَقْصَى الْمَدِينَةِ يَسْعَىٰ قَالَ يَا مُوسَىٰ إِنَّ الْمَلأَ يَأْتَمِرُونَ بِكَ لِيَقْتُلُوكَ فَاخْرُجْ إِنِّي لَكَ مِنَ النَّاصِحِينَ

“এবং সেই প্রধান শহরের সুদূরতম প্রান্ত থেকে এক অত্যন্ত সচেতন ব্যক্তি তীব্র গতিতে দৌড়ে বা চেষ্টা করে রাজদরবার থেকে ছুটে এলো; সে বলল: হে মূসা! নিশ্চয়ই ফেরাউনের সেই এলিট কাউন্সিল বা উচ্চ প্রশাসনিক পরিষদ তোমাকে চিরতরে হত্যা বা অবদমন করার জন্য নিজেদের মধ্যে এক সুগভীর চক্রান্তের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করছে (Innal-mala'a ya'tamirūna bika), সুতরাং তুমি অবিলম্বে এই অঞ্চল থেকে দূরে অবস্থান নাও; নিশ্চয়ই আমি তোমার প্রতি একনিষ্ঠ ও পরম আন্তরিক কল্যাণকামী হিতৈষী।”


আয়াত ২১

فَخَرَجَ مِنْهَا خَائِفًا يَتَرَقَّبُ ۖ قَالَ رَبِّ نَجِّنِي مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

“অতঃপর মূসা সেই স্বৈরাচারী ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে এক অত্যন্ত আতঙ্কিত ও সদা সতর্ক নজরদারির অবস্থায় বের হয়ে অবস্থান নিল; সে অবিরত আবেদন করেছিল: হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে এই চরম ভারসাম্যহীন অন্যায়কারী ও জালিম জাতির চক্রান্ত থেকে সম্পূর্ণ উদ্ধার বা সুরক্ষা দান করো।”


আয়াত ২২

وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَاءَ مَدْيَنَ قَالَ عَسَىٰ رَبِّي أَن يَهْدِيَنِي سَوَاءَ السَّبِيلِ

“এবং যখন সে মাদইয়ানের (অর্থাৎ এক নতুন বুদ্ধিবৃত্তিক ও আইনি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের) অভিমুখে নিজের লক্ষ্য ও চেতনার মোড় ঘুরাল (Wa lammā tawajjaha tilqā'a Madyana), তখন সে দৃঢ় প্রত্যয়ে বলল: আশা করা যায় আমার প্রতিপালক আমাকে এক অত্যন্ত সুষম, নিখুঁত ও সোজা জীবন-পথের হিদায়াত দেখাবেন (Sawā'as-Sabīl)।”

Keywords:

  • مَدْيَنَ (Madyan): আক্ষরিক ভৌগোলিক শহর ছাড়াও এর আভিধানিক অর্থ—”আইন, বিচার, দায়বদ্ধতা এবং সুশৃঙ্খল সংস্কৃতির কেন্দ্র” (ধাতুমূল: দ-ই-ন = দ্বীন বা আইন/ঋণ)। এটি এমন এক ক্ষেত্র যেখানে মূসা ফেরাউনের রাজকীয় দম্ভের বিপরীতে ঐশী আইনের বাস্তব সামাজিক ডাইনামিক্স শেখেন।

আয়াত ২৩

وَلَمَّا وَرَدَ مَاءَ مَدْيَنَ وَجَدَ عَلَيْهِ أُمَّةً مَّنَ النَّاسِ يَسْقُونَ وَوَجَدَ مِن دُونِهِمُ امْرَأتَيْنِ تَذُودَانِ ۖ قَالَ مَا خَطْبُكُمَا ۖ قَالَتَا لَا نَسْقِي حَتَّىٰ يُصْدِرَ الرِّعَاءُ ۖ وَأَبُونَا شَيْخٌ كَبِيرٌ

“অতঃপর সে যখন মাদইয়ানের সেই প্রধান জ্ঞান-উৎস বা জীবনদায়ী পানির ঘাটে এসে পৌঁছাল (Mā'a Madyana), তখন সে সেখানে দেখতে পেল মানুষের এক বিশাল সুসংগঠিত দল বা সমাজ নিজেদের চালিকাশক্তি বা পশুপালকে পানি শোষণ বা পান করাচ্ছে, এবং সে তাদের বাইরে এক প্রান্তে দুই দুর্বল ক্ষেত্র বা নারীকে দেখতে পেল যারা নিজেদের ক্ষেত্রকে অত্যন্ত সসংকোচে আগলে রাখছে বা দূরে সরিয়ে রাখছে (Imra'ataini tazūdāni); সে তাদের জিজ্ঞাসা করল: তোমাদের আসল সমস্যা বা সাংগঠনিক উদ্দেশ্য কী? তারা উভয়ে বলল: আমরা আমাদের এই ক্ষেত্রকে বিন্দুমাত্র পুষ্ট বা সচল করতে পারি না—যতক্ষণ না এই প্রভাবশালী রাখাল বা একচেটিয়া সিন্ডিকেটসমূহ নিজেদের কাজ শেষ করে সরে যায়; অথচ আমাদের মূল আদর্শিক ভিত্তিমূল বা পিতা হলেন অত্যন্ত প্রাচীন ও বয়োবৃদ্ধ এক সুউচ্চ ব্যক্তিত্ব।”

Keywords:

  • امْرَأتَيْنِ (Imra’atain): আক্ষরিক দুই কুমারী মেয়ে ছাড়াও এর গূঢ় অর্থ—মাদইয়ানের আইনের অধীনে থাকা দুটি অত্যন্ত দুর্বল, অধিকারবঞ্চিত কিন্তু অত্যন্ত সম্ভাবনাময় সামাজিক ক্ষেত্র বা উপদল যা শক্তিশালী সিন্ডিকেটের দাপটে পিছিয়ে আছে।

আয়াত ২৪

فَسَقَىٰ لَهُمَا ثُمَّ تَوَلَّىٰ إِلَى الظِّلِّ فَقَالَ رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ

“অতঃপর মূসা (স্বার্থহীনভাবে এগিয়ে এসে) তাদের সেই ক্ষেত্র দুটিকে সম্পূর্ণ পুষ্ট ও সচল করে দিল, অতঃপর সে সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে এক পরম সুরক্ষামূলক শীতল ছায়ার আশ্রয় বা স্তরে অবস্থান নিল; সে অবিরত ব্যাকুল চিত্তে আবেদন করেছিল: হে আমার প্রতিপালক! তুমি উচ্চ সুরক্ষার স্তর থেকে আমার প্রতি যে কোনো কল্যাণ বা কিতাবের উপাদান অবতীর্ণ করবে (Min khairin), আমি সেটির তীব্র পরমুখাপেক্ষী ও চরম কাঙাল!”


আয়াত ২৫

فَجَاءَتْهُ إِحْدَاهُمَا تَمْشِي عَلَى اسْتِحْيَاءٍ قَالَتْ إِنَّ أَبِي يَدْعُوكَ لِيَجْزِيَكَ أَجْرَ مَا سَقَيْتَ لَنَا ۚ فَلَمَّا جَاءَهُ وَقَصَّ عَلَيْهِ الْقَصَصَ قَالَ لَا تَخَفْ ۖ نَجَوْتَ مِنَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ

“অতঃপর সেই দুই ক্ষেত্রের একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, মার্জিত ও বিনম্র পদক্ষেপে তার নিকট ফিরে এলো; সে বলল: নিশ্চয়ই আমার মূল আদর্শিক পিতা আপনাকে আহ্বান করছেন—যাতে আপনি আমাদের ক্ষেত্রকে সচল করার জন্য যে মহৎ শ্রম দিয়েছেন, তার উপযুক্ত শাসনতান্ত্রিক প্রতিদান বা পুরস্কার আপনাকে দান করতে পারেন; অতঃপর মূসা যখন সেই সুউচ্চ ব্যক্তিত্বের দরবারে এসে হাজির হলো এবং তার সামনে নিজের অতীত জীবনের সমস্ত ঐতিহাসিক উত্থান-পতনের বাস্তব সমীকরণ পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করল (Waqassa 'alayhil-qasasa), তখন তিনি (সেই প্রবীণ দূরদর্শী নেতা) আশ্বস্ত করে বললেন: তুমি বিন্দুমাত্র ভয় কোরো না; তুমি সেই চরম ভারসাম্যহীন অন্যায়কারী ও জালিম জাতির চক্রান্ত থেকে চিরতরে মুক্তি ও পরম সুরক্ষা লাভ করেছ।”


আয়াত ২৬

قَالَتْ إِحْدَاهُمَا يَا أَبَتِ اسْتَأْجِرْهُ ۖ إِنَّ خَيْرَ مَنِ اسْتَأْجَرْتَ الْقَوِيُّ الْأَمِينُ

“সেই দুই ক্ষেত্রের একটি বলেছিল: হে আমার পরম শ্রদ্ধেয় পিতা! আপনি একে আমাদের এই প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য স্থায়ীভাবে নিযুক্ত করুন; কারণ আপনার নিযুক্ত করা যে কোনো কর্মীর মধ্যে সে-ই হবে সর্বশ্রেষ্ঠ—যে অত্যন্ত শক্তিশালী, সামর্থ্যবান এবং পরম আমানতদার ও বিশ্বস্ত (Al-Qawiyyul-Amīn)।”


আয়াত ২৭

قَالَ إِنِّي أُرِيدُ أَنْ أُنكِحَكَ إِحْدَى ابْنَتَيَّ هَاتَيْنِ عَلَىٰ أَن تَأْجُرَنِي ثَمَانِيَ حِجَجٍ ۖ فَإِنْ أَتْمَمْتَ عَشْرًا فَمِنْ عِندِكَ ۖ وَمَا أُرِيدُ أَنْ أَشُقَّ عَلَيْكَ ۚ سَتَجِدُنِي إِن شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ

“তিনি (সেই প্রবীণ সুউচ্চ নেতা) মূসাকে বললেন: নিশ্চয়ই আমি এই সাংগঠনিক ইচ্ছা পোষণ করছি যে—আমার এই দুটি সুনির্দিষ্ট বিকাশমান ক্ষেত্রের বা শাখার একটির সাথে তোমার একনিষ্ঠ প্রাতিষ্ঠানিক মেলবন্ধন বা চুক্তি করিয়ে দেব (An unkihaka) এই শর্তে যে, তুমি আটটি সুদীর্ঘ বছর বা ঐতিহাসিক আবর্তনকাল পর্যন্ত আমার এই মিশন বা সংস্থায় নিজের সর্বোচ্চ শ্রম ও সেবা নিয়োজিত করবে (Samāniya hijajin); অতঃপর তুমি যদি তা পূর্ণ করে দশ বছর পর্যন্ত প্রসারিত করো, তবে তা হবে তোমার পক্ষ থেকে অতিরিক্ত এক বিশেষ ইহসান, আর আমি কোনো অবস্থাতেই তোমার ওপর কোনো প্রকার জবরদস্তি বা সংকীর্ণতা চাপিয়ে দিতে চাই না; আল্লাহ যদি ইচ্ছা করেন, তবে তুমি খুব শীঘ্রই আমাকে সমাজে সংশোধনমূলক ও ভারসাম্য স্থাপনকারী মصلিনহদের অন্তর্ভুক্ত পাবে।”

Keywords:

  • أُنكِحَكَ (Unkihaka): আক্ষরিক বিয়ে করা ছাড়াও এর প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ—কোনো মহৎ সমাজ গঠনমূলক মিশন বা দীর্ঘমেয়াদী সংস্থার সাথে কোনো দক্ষ মেধার অত্যন্ত নিবিড়, আইনি ও সুসংগত চুক্তি বা বৈপ্লবিক মেলবন্ধন সম্পাদন করা।

আয়াত ২৮

قَالَ ذَٰلِكَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ ۖ أَيَّمَا الْأَجَلَيْنِ قَضَيْتُ فَلَا عُدْوَانَ عَلَيَّ ۖ وَاللَّهُ عَلَىٰ مَا نَقُولُ وَكِيلٌ

“মূসা বলেছিল: এই চুক্তিটি আমার এবং আপনার মধ্যকার এক সুনির্দিষ্ট অলঙ্ঘনীয় ফায়সালা; এই দুই সময়সীমার বা লক্ষ্যের যেটিই আমি চূড়ান্তভাবে সম্পন্ন করি না কেন (Ayyamal-ajalaini qadaitu), আমার ওপর বিন্দুমাত্র কোনো জোরজবরদস্তি বা সীমালঙ্ঘন করা যাবে না; আর আমরা উভয়ে যে সমস্ত শাসনতান্ত্রিক কথাবার্তা বা অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি, সেটির ওপর আল্লাহই হলেন একমাত্র পরম জিম্মাদার ও ওকিল।”


আয়াত ২৯

فَلَمَّا قَضَىٰ مُوسَى الْأَجَلَ وَسَارَ بِأَهْلِهِ آنَسَ مِن جَانِبِ الطُّورِ نَارًا قَالَ لِأَهْلِهِ امْكُثُوا إِنِّي آنَسْتُ نَارًا لَّعَلِّي آتِيكُم مِّنْهَا بِخَبَرٍ أَوْ جَذْوَةٍ مِّنَ النَّارِ لَعَلَّكُمْ تَصْطَلُونَ

“অতঃপর মূসা যখন সেই পূর্বনির্ধারিত দীর্ঘ সময়সীমা ও লক্ষ্য সফলভাবে সম্পন্ন করল এবং তার নিজের সেই সুসংগত দল বা পরিবারকে নিয়ে সমাজ-বাস্তবতার দ্বন্দ্বে যাত্রা শুরু করল (Wa sāra bi-ahlihī), তখন সে আচমকা সেই সুদৃঢ় ও সুউচ্চ আদর্শিক পাহাড়ের পাশ থেকে এক প্রখর বৈপ্লবিক আলো বা আগুনের আভা প্রত্যক্ষ করল (Ānasa min jānibit-Tūri nārā); সে তার দলকে বলল: তোমরা এই অবস্থানে সাময়িকভাবে স্থির হয়ে অপেক্ষা করো, নিশ্চয়ই আমি এক অত্যন্ত প্রভাবশালী বৈপ্লবিক আলোর সন্ধান পেয়েছি; আশা করা যায় আমি সেখান থেকে তোমাদের জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট শাসনতান্ত্রিক দিকনির্দেশনা বা খবর নিয়ে আসতে পারব, অথবা সেই আগুন থেকে কোনো প্রজ্জ্বলিত মশাল বা অঙ্গার নিয়ে আসতে পারব—যার আলোয় তোমরা নিজেদের অন্ধকার দূর করে সম্পূর্ণ সুস্থির হতে পারো।”


আয়াত ৩০

فَلَمَّا أَتَاهَا نُودِيَ مِن شَاطِئِ الْوَادِ الْأَيْمَنِ فِي الْبُقْعَةِ الْمُبَارَكَةِ مِنَ الشَّجَرَةِ أَن يَا مُوسَىٰ إِنِّي أَنَا اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ

“অতঃপর মূসা যখন সেই পরম আলোর উৎসের নিকট এসে হাজির হলো, তখন সেই সুনির্দিষ্ট কাল্পনিক বা আত্মিক উপত্যকার ডান বা পরম কল্যাণময় কিনারার এক অত্যন্ত বরকতময় ও দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণপূর্ণ ক্ষেত্র থেকে—এক ফলপ্রসূ জীবন-বৃক্ষ বা ঐশী বাণীর অন্তরাল থেকে তাকে তীব্র ডিক্রির আহ্বান করা হলো (Nūdhiya min shāti'il-wādil-aymani minal-shajarati)—হে মূসা! তোমরা খুব ভালো করে জেনে রাখো: নিশ্চয়ই আমিই হলাম একমাত্র আল্লাহ, সমগ্র বিশ্ববাসীর লালনকর্তা ও পরম প্রতিপালক!”

Keywords:

  • مِنَ الشَّجَرَةِ (Minal-shajarah): আক্ষরিক কোনো জ্বলন্ত গাছ নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া অমোঘ সত্যের এমন এক চিরন্তন, ফলপ্রসূ ও ছায়াদানকারী প্রাতিষ্ঠানিক বৃক্ষ বা ঐশী বাণীর আধার যা মানুষের চিন্তাজগতে পরম সত্যের আলো ছড়ায়।

আয়াত ৩১

وَأَنْ أَلْقِ عَصَاكَ ۖ فَلَمَّا رَآهَا تَهْتَزُّ كَأَنَّهَا جَانٌّ وَلَّىٰ مُدْبِرًا وَلَمْ يُعَقِّبْ ۚ يَا مُوسَىٰ أَقْبِلْ وَلَا تَخَفْ ۖ إِنَّكَ مِنَ الْآمِنِينَ

“এবং নির্দেশ হলো: তুমি অবিলম্বে মনস্তাত্ত্বিক ক্ষেত্রে তোমার সেই সুদৃঢ় আদর্শিক লাঠি বা রূপরেখাকে কার্যকর বা নিক্ষেপ করো (Wa an alqi 'asāka); অতঃপর মূসা যখন সেটিকে (প্রতিপক্ষের চক্রান্তের ময়দানে) তীব্র গতিতে এমনভাবে আলোড়িত ও সচল হতে দেখল যেন তা এক অত্যন্ত ক্ষিপ্র গতির সুক্ষ্ম ও ভয়ঙ্কর অদৃশ্য শক্তিসদৃশ অজগর, তখন সে নিজেই পিঠ ফিরিয়ে উলটো দিকে পালাতে লাগল এবং বিন্দুমাত্র পেছনে ফিরে তাকাল না; (ঐশী ডিক্রি ঘোষণা করল:) হে মূসা! তুমি সামনের দিকে এগিয়ে এসো এবং বিন্দুমাত্র ভয় কোরো না; নিশ্চয়ই তুমি আমার সুরক্ষাব্যবস্থায় সর্বপ্রকার বিপদ থেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ ও সফলদের অন্তর্ভুক্ত।”


আয়াত ৩২

اسْلُكْ يَدَكَ فِي جَيْبِكَ تَخْرُجْ بَيْضَاءَ مِنْ غَيْرِ سُوءٍ وَاضْمُمْ إِلَيْكَ جَنَاحَكَ مِنَ الرَّهْبِ ۖ فَذَانِكَ بُرْهَانَانِ مِن رَّبِّكَ إِلَىٰ فِرْعَوْنَ وَمَلَئِهِ ۚ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمًا فَاسِقِينَ

“তুমি তোমার সুনির্দিষ্ট সাংগঠনিক ক্ষমতা বা হাতকে তোমার নিজের ভেতরের গোপন মনস্তাত্ত্বিক কেল্লা বা বক্ষপঞ্জরের আড়ালে প্রবেশ করাও (Usluk yadaka fī jaybika), অমনি তা সর্বপ্রকার দুর্নীতি, স্বার্থপরতা বা মন্দ উদ্দেশ্য থেকে মুক্ত হয়ে এক অত্যন্ত শুভ্র, স্বচ্ছ ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী জনকল্যাণমূলক শক্তিতে আত্মপ্রকাশ করবে; এবং তুমি ভীতি বা আশঙ্কার মুখে তোমার দরদমাখা সুরক্ষামূলক সাংগঠনিক ডানা বা আশ্রয়কে নিজের দলের সাথে আরও শক্তভাবে সংকুচিত ও মজবুত করো; সুতরাং এই দুটি উপাদানই হলো তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত দুটি অত্যন্ত অকাট্য, সুষ্পষ্ট চাক্ষুষ ও বুদ্ধিবৃত্তিক মহাপ্ৰমাণ (Fazānika burhānāni min Rabbika)—ফেরাউন এবং তার সেই এলিট কাউন্সিলের চক্রান্তের বিরুদ্ধে; নিশ্চয়ই তারা চিরকাল এক অত্যন্ত নীতিহীন ও নির্ধারিত আইনি সীমালঙ্ঘনকারী স্বৈরাচারী জাতি।”


আয়াত ৩৩

قَالَ رَبِّ إِنِّي قَتَلْتُ مِنْهُمْ نَفْسًا فَأَخَافُ أَن يَقْتُلُونِ

“মূসা আরজ করেছিল: হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই অতীত জীবনে অনিচ্ছাকৃতভাবে আমার হাত দিয়ে তাদের এক ব্যক্তির কর্মের সমাপ্তি ঘটেছিল, যার কারণে আমি মনে এই তীব্র আশঙ্কা বোধ করছি যে, তারা (সুযোগ পেলেই) আমাকে সাংগঠনিকভাবে বা শারীরিকভাবে হত্যা বা ধ্বংস করে ফেলবে,”


আয়াত ৩৪

وَأَخِي هَارُونُ هُوَ أَفْصَحُ مِنِّي لِسَانًا فَأَرْسَلْهُ مَعِيَ رِدْءًا يُصَدِّقُنِي ۖ إِنِّي أَخَافُ أَن يُكَذِّبُونِ

“—এবং আমার সহযোগী ভাই হারূন, সে সত্যকে মানুষের সামনে অত্যন্ত স্পষ্ট, প্রাঞ্জল ও বাগ্মী প্রচারশৈলীতে ফুটিয়ে তুলতে আমার চেয়ে অনেক বেশি পারদর্শী (Huwa afsahu minnī lisānā); সুতরাং তুমি তাকেও আমার সাথে এক অত্যন্ত সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্যকারী ও ব্যাকআপ বা চালিকাশক্তি হিসেবে প্রেরণ করো (Rīd'ay-yusaddiqunī)—যে আমার উপস্থাপিত কিতাবের রূপরেখাকে চাক্ষুষভাবে বাস্তবে সত্য প্রমাণিত করবে; নিশ্চয়ই আমি আশঙ্কা করছি যে প্রতিপক্ষের এলিটরা আমাকে সরাসরি মিথ্যা প্রতিপন্ন করে উড়িয়ে দেবে।”

আয়াত ৩৫

قَالَ سَنَشُدُّ عَضُدَكَ بِأَخِيكَ وَنَجْعَلُ لَكُمَا سُلْطَانًا فَلَا يَصِلُونَ إِلَيْكُمَا ۚ بِآيَاتِنَا أَنتُمَا وَمَنِ اتَّبَعَكُمَا الْغَالِبُونَ

“ঘোষণা হলো: আমি তোমার সহযোগী ভাইয়ের মাধ্যমে তোমার সাংগঠনিক বাহু বা শক্তিকে অত্যন্ত সুদৃঢ় ও শক্তিশালী করব (Sanashuddu 'adudaka bi-akhīka) এবং আমি তোমাদের উভয়কে এমন এক অকাট্য যৌক্তিক প্রমাণ, দলিল ও শাসনতান্ত্রিক কর্তৃত্ব দান করব (Wanaj'alu lakumā sultānā), যার ফলে প্রতিপক্ষের দাম্ভিক এলিটরা কোনো অবস্থাতেই তোমাদের ক্ষতি করতে তোমাদের স্তর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে না; আমার সুস্পষ্ট আয়াত ও অকাট্য বিধি-বিধানের নিদর্শনসমূহের শক্তিতে তোমরা উভয়ে এবং যারা তোমাদের নিখুঁত অনুসরণ করবে, তারাই চূড়ান্তভাবে বিজয়ী বা আধিপত্যশালী হবে।”


আয়াত ৩৬

فَلَمَّا جَاءَهُم مُّوسَىٰ بِآيَاتِنَا بَيِّنَاتٍ قَالُوا مَا هَٰذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّفْتَرًى وَمَا سَمِعْنَا بِهٰذَا فِي آبَائِنَا الْأَوَّلِينَ

“অতঃপর মূসা যখন তাদের নিকট আমার অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও চাক্ষুষ আয়াত বা আইনি অনুশাসনসমূহ নিয়ে হাজির হলো, তখন তারা (জনগণকে বিভ্রান্ত করতে) বলে উঠল: এই যে কিতাবের ব্যবস্থা, এ তো এক অত্যন্ত সুক্ষ্ম মনস্তাত্ত্বিক কূটকৌশল বা বানোয়াট প্রোপাগান্ডা ব্যতিরেকে আর কিছুই নয় যা সে নিজে বানিয়ে নিয়েছে (Mā hāzā illā sihrum muftarā), আর আমরা আমাদের সুদূর অতীতের প্রাচীন পিতৃপুরুষদের সুদীর্ঘ ইতিহাসে কখনো এমন কোনো অদ্ভুত শাসনতান্ত্রিক আদর্শের কথা শুনিনি।”


আয়াত ৩৭

وَقَالَ مُوسَىٰ رَبِّي أَعْلَمُ بِمَن جَاءَ بِالْهُدَىٰ مِنْ عِندِهِ وَمَن تَكُونُ لَهُ عَاقِبَةُ الدَّارِ ۖ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ

“এবং মূসা বলেছিল: আমার প্রতিপালক সবচেয়ে ভালো জানেন যে তাঁর বিশেষ স্তর থেকে কে সঠিক পথনির্দেশ বা হিদায়াত নিয়ে এসেছে (Man jā'a bil-hudā) এবং কার জন্য অবহারিত রয়েছে এই সমাজ-ব্যবস্থার বা চূড়ান্ত গৃহের মহিমান্বিত সুউচ্চ পরিণতি; নিশ্চয়ই ভারসাম্যহীন অন্যায়কারী ও জালিমরা কখনই চূড়ান্ত বিকাশ ও সফলতা লাভ করতে পারে না।”


আয়াত ৩৮

وَقَالَ فِرْعَوْنُ يَا أَيُّهَا الْمَلأُ مَا عَلِمْتُ لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرِي فَأَوْقِدْ لِي يَا هَامَانُ عَلَى الطِّينِ فَاجْعَل لِّي صَرْحًا لَّعَلِّي أَطَّلِعُ إِلَىٰ إِلَٰهِ مُوسَىٰ وَإِنِّي لَأَظُنُّهُ مِنَ الْكَاذِبِينَ

“আর ফেরাউন (চরম দম্ভে ও অহংকারে) বলল: হে আমার এলিট পরিষদ বা সাঙ্গোপাঙ্গরা! আমি তো আমার নিজের কায়েমী শাসন ব্যতিরেকে তোমাদের জন্য অন্য কোনো বৈধ উপাস্য বা চূড়ান্ত আইনদাতার অস্তিত্ব জানি না; সুতরাং হে হামান! তুমি অবিলম্বে মাটির ইট বা কাদা পোড়ানোর মতো করে আমার জন্য এক বিশাল ক্ষমতার চুল্লি বা বৈষয়িক শক্তি প্রজ্বলিত করো, অতঃপর আমার জন্য তৈরি করো এক অত্যন্ত সুউচ্চ, মজবুত ও জাঁকজমকপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতার মিনার বা প্রাসাদ (Faj'al lī sarhā), যাতে আমি সেটির দাপটে মূসার সেই উপাস্য বা আদর্শের স্বরূপ চাক্ষুষ পরীক্ষা করতে পারি; অথচ আমি তো নিশ্চিতভাবেই একে এক অত্যন্ত জঘন্য মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করি!”

Keywords:

  • صَرْحًا (Sarhā): আক্ষরিক ইটের তৈরি সুউচ্চ টাওয়ার নয়, বরং স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের দাপট ফুটিয়ে তুলতে এবং কিতাবের সত্যকে অবদমন করতে তৈরি করা অত্যন্ত সুউচ্চ, মজবুত ও জাঁকজমকপূর্ণ সামাজিক, রাজনৈতিক বা সামরিক ক্ষমতার ইমারত বা প্রাসাদ।

আয়াত ৩৯

وَاسْتَكْبَرَ هُوَ وَجُنُودُهُ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَظَنُّوا أَنَّهُمْ إِلَيْنَا لَا يُرْجَعُونَ

“এবং সে (ফেরাউন) এবং তার সেই শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক বাহিনী বা আমলাতন্ত্র কোনো যথার্থ অধিকার বা সত্য ব্যতিরেকেই সেই ভূখণ্ডে চরম দাম্ভিকতা ও অহংকার প্রদর্শন করেছিল (Wastakbara huwa wa junūduhū), এবং তারা এই অবান্তর ধারণা পোষণ করেছিল যে—তাদেরকে কোনো অবস্থাতেই আমার বিধিবদ্ধ প্রাকৃতিক ও ঐশী নিয়মের জবাবদিহিতায় ফিরে আসতে হবে না।”


আয়াত ৪০

فَأَخَذْنَاهُ وَجُنُودَهُ فَنَبَذْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ ۖ فَانظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الظَّالِمِينَ

“অতঃপর আমি তাকে এবং তার সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক বাহিনীকে আমার অমোঘ প্রাকৃতিক নিয়মে পাকড়াও করলাম এবং তাদের সবাইকে সেই সামাজিক সংঘাত ও প্লাবনের উত্তাল সমুদ্রের অতল গহ্বরে সম্পূর্ণরূপে ছুঁড়ে ফেলে ধ্বংস করলাম (Fanabaznāhum fil-yammi); সুতরাং তুমি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করো—সেই ভারসাম্যহীন অন্যায়কারী ও জালিমদের চূড়ান্ত পরিণতি কীরূপ ভয়ঙ্কর হয়েছিল!”


আয়াত ৪১

وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَدْعُونَ إِلَى النَّارِ ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ لَا يُنصَرُونَ

“আর আমি তাদের এমন নিকৃষ্ট আদর্শিক নেতা বা গাইড বানিয়ে রেখেছি যারা (নিজেদের ভ্রান্ত দর্শনের দাপটে সমাজকে) তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দহন, অশান্তি ও ধ্বংসের আগুনের দিকে আহ্বান করে (Yad'ūna ilan-nār); আর সেই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের দিনে তাদের কোনো প্রকার সাহায্য বা উদ্ধারকারী দেওয়া হবে না।”


আয়াত ৪২

وَأَتْبَعْنَاهُمْ فِي هَٰذِهِ الدُّنْيَا لَعْنَةً ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنَ الْمَقْبُوحِينَ

“এবং আমি এই ক্ষণস্থায়ী বৈষয়িক জীবনেও তাদের ওপর আমার অমোঘ প্রাকৃতিক নিয়মে এক অবধারিত ধিক্কার, লাঞ্ছনা ও বহিষ্কারের অভিশাপ চাপিয়ে দিয়েছি (La'natan); আর সেই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের দিনে তারা হবে সর্বপ্রকার মর্যাদা ও সুপ্ত সম্ভাবনা থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত ও চরম ধিক্কৃতদের অন্তর্ভুক্ত।”

Keywords:

  • لَعْنَةً (La’natan): আল্লাহর রহমত, সুরক্ষা, প্রগতি ও পরম বিকাশ-ব্যবস্থা থেকে কোনো সমাজ বা ব্যক্তির চিরতরে ছিটকে পড়া বা বঞ্চিত হওয়া।

আয়াত ৪৩

وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ مِن بَعْدِ مَا أَهْلَكْنَا الْقُرُونِ الْأُولَىٰ بَصَائِرَ لِلنَّاسِ وَهُدًى وَرَحْمَةً لَّعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ

“আর নিশ্চয়ই আমি পূর্ববর্তী প্রাচীন যুগের দাম্ভিক ও শোষক প্রজন্মসমূহকে (তাদের অন্যায়ের কুফলে) ধ্বংস করার পর—মূসাকে দান করেছিলাম এক চূড়ান্ত বিধিবদ্ধ সংবিধান বা কিতাব (Ātaynā Mūsal-Kitāba), যা ছিল মানবজাতির অন্তর্দৃষ্টি জাগ্রত করার অত্যন্ত সুক্ষ্ম ও উজ্জ্বল উপকরণ (Basā'ira linnāsi), এক সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এবং এক পরম পুষ্টিকর অনুকম্পা; যাতে তারা নিজেদের চিন্তাকে জাগ্রত করে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।”

Keywords:

  • بَصَائِرَ (Basā’ira): প্লুরাল অব বাসীরাহ; মানুষের ভেতরের সেই তীব্র মননশীলতা, অন্তর্দৃষ্টি বা প্রজ্ঞার চাক্ষুষ আলো যা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকে স্ফটিকের মতো পরিষ্কার করে দেখতে সাহায্য করে।

আয়াত ৪৪

وَمَا كُنتَ بِجَانِبِ الْغَرْبِيِّ إِذْ قَضَيْنَا إِلَىٰ مُوسَى الْأَمْرَ وَمَا كُنتَ مِنَ الشَّاهِدِينَ

“আর (হে বাণীবাহক!) তুমি সেই সুনির্দিষ্ট অন্ধকার, অজ্ঞতা বা পতনের খাদের (পশ্চিমের) পাশে বিন্দুমাত্র উপস্থিত ছিলে না—যখন আমি মূসার প্রতি সেই চূড়ান্ত বৈপ্লবিক নির্দেশ বা শাসনতান্ত্রিক ডিক্রি জারি করেছিলাম (Iz qadaynā ilā Mūsal-amra), আর তুমি সেই সুদূর অতীতের চাক্ষুষ প্রত্যক্ষকারীদের অন্তর্ভুক্তও ছিলে না;”

Keywords:

  • الْغَرْبِيِّ (Al-Gharbiy): আক্ষরিক ভৌগোলিক পশ্চিম দিক ছাড়াও এর গূঢ় শাসনতান্ত্রিক অর্থ—অজ্ঞানতা, অবক্ষয়, পতন বা সূর্যাস্তের এমন এক অন্ধকার পর্যায় বা স্তর যা সত্যের আলোর সম্পূর্ণ বিপরীত (ধাতুমূল: ঘ-র-ব = সূর্যাস্ত বা অদৃশ্য হওয়া)।

আয়াত ৪৫

وَلَٰكِنَّا أَنشَأْنَا قُرُونًا فَتَطَاوَلَ عَلَيْهِمُ الْعُمُرُ ۚ وَمَا كُنتَ ثَاوِيًا فِي أَهْلِ مَدْيَنَ تَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا وَلَٰكِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ

“কিন্তু আমি (মূসার পর) বহুবিদ প্রজন্ম ও দীর্ঘ সময়কালের উত্থান ঘটিয়েছিলাম, অতঃপর তাদের ওপর সুসুদীর্ঘ যুগ বা শতাব্দী অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল (যার কারণে তারা সত্য ভুলে বিকৃতিতে লিপ্ত হয়েছিল); আর তুমি মাদইয়ানের অধিবাসীদের বা সেই আইন ও বিচার কেন্দ্রের কর্মীদের মাঝেও স্থায়ীভাবে বসবাসকারী ছিলে না (Wa mā kunta sāwiyan fī ahli Madyana)—যে তুমি তাদের সামনে আমার সুস্পষ্ট আয়াত বা আইনি অনুশাসনসমূহ ধারাবাহিক বিশ্লেষণ করে শোনাতে; কিন্তু আমিই চিরকাল বাণীবাহক বা আদর্শ প্রেরণকারী (তাই আজ তোমার ওপর এই কিতাব অবতীর্ণ করেছি)।”


আয়াত ৪৬

وَمَا كُنتَ بِجَانِبِ الطُّورِ إِذْ نَادَيْنَا وَلَٰكِن رَّحْمَةً مِّن رَّبِّكَ لِتُنذِرَ قَوْمًا مَّا أَتَاهُم مِّن نَّذِيرٍ مِّن قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ

“এবং তুমি সেই সুদৃঢ় ও সুউচ্চ আদর্শিক পাহাড়ের পাশেও বিন্দুমাত্র উপস্থিত ছিলে না—যখন আমি মূসাকে তীব্র ডিক্রির আহ্বান করেছিলাম; কিন্তু এটি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বিশেষ পুষ্টিকর অনুকম্পা ও রহমত (Illā rahmatam min Rabbika), যাতে তুমি এর দ্বারা এক এমন জাতিকে আসন্ন ধ্বংসাত্মক পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে পারো—যাদের নিকট তোমার পূর্বে অন্য কোনো সুস্পষ্ট সতর্ককারী বা গাইড আসেনি; যেন তারা নিজেদের চিন্তাকে জাগ্রত করে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।”


আয়াত ৪৭

وَلَوْلَا أَن تُصِيبَهُم مُّصِيبَةٌ بِمَا قَدَّمَتْ أَيْدِيهِمْ فَيَقُولُوا رَبَّنَا لَوْلَا أَرْسَلْتَ إِلَيْنَا رَسُولًا فَنَتَّبِعَ آيَاتِكَ وَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ

“আর যদি এমন নিয়ম না থাকত যে—তাদের নিজেদের হাত পূর্বে যে সমস্ত অপকর্ম কামাই করে পাঠিয়েছে, সেটির অবধারিত ফল হিসেবে যখনই তাদের ওপর কোনো তীব্র সামাজিক বিপর্যয় বা আজাব আপতিত হতো (Tusībahum musībatun), তখন তারা (অজুহাত দিয়ে) চিৎকার করে বলত: হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি কেন আমাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট বাণীবাহক বা আদর্শ প্রেরণ করলেন না? তাহলে তো আমরা আপনার সুস্পষ্ট আয়াত ও অকাট্য বিধি-বিধানের নিখুঁত অনুসরণ করতে পারতাম এবং পরম সুরক্ষামূলক ইমানদারদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারতাম!”


আয়াত ৪৮

فَلَمَّا جَاءَهُمُ الْحَقُّ مِنْ عِندِنَا قَالُوا لَوْلَا أُوتِيَ مِثْلَ مَا أُوتِيَ مُوسَىٰ ۚ أَوَلَمْ يَكْفُرُوا بِمَا أُوتِيَ مُوسَىٰ مِن قَبْلُ ۖ قَالُوا سِحْرَانِ تَظَاهَرَا وَقَالُوا إِنَّا بِكُلٍّ كَافِرُونَ

“অতঃপর যখনই আমার বিশেষ স্তর থেকে তাদের নিকট পরম ও অকাট্য বাস্তব সত্য এসে হাজির হলো ( Lammā jā'ahumul-haqqu), তখন তারা (নতুন বাহানা তৈরি করে) বলতে লাগল: মূসাকে যেভাবে (অলৌকিক দাপটের) শাসনতান্ত্রিক শক্তি ও উপকরণ দেওয়া হয়েছিল, একেও ঠিক তেমনটি দেওয়া হলো না কেন? (আমার প্রাকৃতিক ফায়সালা জিজ্ঞাসা করে:) ইতিপূর্বে মূসাকে যা কিছু দেওয়া হয়েছিল, তারা কি সেটিকেও চরমভাবে অস্বীকার ও কুফরি করেনি? তারা তখন দম্ভ করে বলেছিল: এগুলো তো দুটি ভিন্ন ভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক কূটকৌশল বা জাদুর চক্রান্ত যা একে অপরকে গোপনে সাহায্য করছে (Sihrāni tazāharā), এবং তারা বলেছিল: নিশ্চয়ই আমরা এই প্রতিটি আদর্শিক রূপরেখাকেই সম্পূর্ণরূপে অস্বীকারকারী!”


আয়াত ৪৯

قُلْ فَأْتُوا بِكِتَابٍ مِّنْ عِندِ اللَّهِ هُوَ أَهْدَىٰ مِنْهُمَا أَتَّبِعْهُ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ

“তুমি তাদের চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জে ঘোষণা করে দাও: তোমরা যদি কিতাবের চাক্ষুষ জ্ঞান ও দাবিতে বিন্দুমাত্র পরম সত্যনিষ্ঠ ও সৎ হয়ে থাকো, তবে আল্লাহর বিশেষ স্তর থেকে এমন কোনো বিধিবদ্ধ কিতাব বা রূপরেখা নিয়ে এসো—যা নির্দেশনার দিক থেকে এই দুই কিতাবের (মূসার তাওরাত ও এই কুরআনের) চেয়ে অনেক বেশি উত্তম ও সঠিক পথপ্রদর্শক হবে (Huwa ahdā minhumā), আমি স্বয়ং নিজের ইচ্ছায় সেটির নিখুঁত অনুসরণ করব!”


আয়াত ৫০

فَإِن لَّمْ يَسْتَجِيبُوا لَكَ فَاعْلَمْ أَنَّمَا يَتَّبِعُونَ أَهْوَاءَهُمْ ۚ وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنِ اتَّبَعَ هَوَاهُ بِغَيْرِ هُدًى مِّنَ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ

“অতঃপর তারা যদি তোমার এই যৌক্তিক ও অকাট্য চ্যালেঞ্জে সাড়া দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়, তবে তুমি চাক্ষুষ জ্ঞানে সুস্পষ্ঠভাবে জেনে রাখো যে—তারা তো কেবল নিজেদের উগ্র অন্ধ কামনা, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও কুপ্রবৃত্তিরই অন্ধ অনুসরণ করছে (Innamā yattabi'ūna ahwā'ahum); আর তার চেয়ে বড় পথভ্রষ্ট ও লক্ষ্যহীন বিভ্রান্ত আর কে হতে পারে—যে আল্লাহর দেওয়া কোনো সুনির্দিষ্ট পথনির্দেশ বা হিদায়াত ছাড়াই কেবল নিজের অন্ধ কামনার দাসত্ব করে? নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো অবস্থাতেই সেই ভারসাম্যহীন অন্যায়কারী ও জালিম জাতিকে সঠিক পথ দেখান না।”


আয়াত ৫১

وَلَقَدْ وَصَّلْنَا لَهُمُ الْقَوْلَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ

“আর নিশ্চয়ই আমি এই পরম সত্যের বাণী বা রূপরেখাকে অত্যন্ত সুসংগতভাবে একটার সাথে আরেকটার মেলবন্ধন ঘটিয়ে ধারাবাহিকভাবে তাদের নিকট পৌঁছে দিয়েছি (Waladad wassalnā lahumul-qawla), যাতে তারা নিজেদের চিন্তাকে জাগ্রত করে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।”


আয়াত ৫২

الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ مِن قَبْلِهِ هُم بِهِ يُؤْمِنُونَ

“এই কুরআনের পূর্বে আমি যাদেরকে কিতাব বা ঐশী বিধিবদ্ধ অনুশাসন দান করেছিলাম (Ātaynāhumul-Kitāba), তারা (নিজেদের মৌলিক সততার কারণে) এই নতুন পরম সত্যের রূপরেখার প্রতিও পূর্ণ মানসিক শান্তি ও দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে।”


আয়াত ৫৩

وَإِذَا يُتْلَىٰ عَلَيْهِمْ قَالُوا آمَنَّا بِهِ إِنَّهُ الْحَقُّ مِن رَّبِّنَا إِنَّا كُنَّا مِن قَبْلِهِ مُسْلِمِينَ

“এবং যখনই তাদের নিকট এই কিতাবের বাণী ধারাবাহিক বিশ্লেষণ করে শোনানো হয়, তখন তারা অকপটে ঘোষণা করে: আমরা এর প্রতি পূর্ণ মানসিক শান্তি ও দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করলাম, নিশ্চয়ই এটি আমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত অকাট্য বাস্তব সত্য; নিশ্চয়ই আমরা এই নতুন রূপরেখা আসার পূর্বেই শান্তি ও নিরাপত্তার সাথে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পিত মুসলিম ছিলাম।”


আয়াত ৫৪

أُولَٰئِكَ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُم مَّرَّتَيْنِ بِمَا صَبَرُوا وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ

“তাদেরকে তাদের সেই সত্যের পথে চলতে গিয়ে প্রতিটি বাধার মুখে অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল থাকার অবধারিত পুরস্কার জ্যামিতিক হারে দ্বিগুণ বা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে (Yutawna ajrahum marratayni), এবং তারা নিজেদের সুষম ও গঠনমূলক সৌন্দর্যের নীতি দিয়ে সর্বপ্রকার মন্দ বা নেতিবাচক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত সুকৌশলে প্রতিহত বা তাড়িয়ে দেয় (Wayadra'ūna bil-hasanatis-sayyi'ah), এবং আমি তাদের ব্যক্তিত্ব ও মেধা বিকাশের জন্য যে সমস্ত ঐশী লালন-উপাদান দিয়েছি তা থেকে তারা মানব কল্যাণে অকাতরে ব্যয় করে।”


আয়াত ৫৫

وَإِذَا سَمِعُوا اللَّغْوَ أَعْرَضُوا عَنْهُ وَقَالُوا لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ

“এবং যখনই তারা কোনো অসার, নিরর্থক বা বিকৃত কথাবার্তা ও দর্শন শুনতে পায়, তখন তারা নিজেদের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রেখে অত্যন্ত সসম্মানে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেয়: আমাদের সুনির্দিষ্ট কর্ম ও আদর্শের সুদূরপ্রসারী ফলাফল আমাদের জন্য এবং তোমাদের কর্মের ফলাফল তোমাদের জন্য; তোমাদের ওপর পরম শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় থাকুক, আমরা কোনো অবস্থাতেই অজ্ঞ, গোঁড়া ও মূর্খদের অন্ধ সাহচর্য বা মতাদর্শ কামনা করি না (Lā nabtaghil-jāhilīn)।”


আয়াত ৫৬

إِنَّكَ لَا تَهْدِي مَنْ أَحْبَبْتَ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَهْدِي مَن يَشَاءُ ۚ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ

“নিশ্চয়ই তুমি সাংগঠনিকভাবে নিজের ইচ্ছায় বা ভালোবাসার টানে যাকে খুশি তাকে সরল পথে নিয়ে আসতে পারো না, বরং আল্লাহ (তাঁর অমোঘ প্রাকৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিয়মের ধারায়) তাকেই সঠিক পথ দেখান যে সত্য গ্রহণে আন্তরিক ইচ্ছা পোষণ করে (Walākinnallāha yahdī may-yashā'u); আর তিনি তাঁর নিয়মে সবচেয়ে ভালো জানেন যে কারা প্রকৃতপক্ষে সঠিক পথনির্দেশ বা হিদায়াত পাওয়ার যোগ্য।”


আয়াত ৫৭

وَقَالُوا إِن نَّتَّبِعِ الْهُدَىٰ مَعَكَ نُتَخَطَّفْ مِنْ أَرْضِنَا ۚ أَوَلَمْ نُمَكِّن لَّهُمْ حَرَمًا آمِنًا يُجْبَىٰ إِلَيْهِ ثَمَرَاتُ كُلِّ شَيْءٍ رِّزْقًا مِّن لَّدُنَّا وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَهُمْ لَا يَعْلَمُونَ

“আর তারা (নিজেদের কায়েমি পুঁজিবাদী স্বার্থের আশঙ্কায়) বাহানা দিয়ে বলে: আমরা যদি তোমার সাথে এই সঠিক পথ বা হিদায়াতের নিখুঁত অনুসরণ করতে যাই, তবে প্রতিপক্ষের দাপটে আমরা আমাদের এই সুপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সামাজিক ক্ষেত্র থেকে আচমকা ছিটকে পড়ব বা উৎখাত হয়ে যাব (Nutakhattaf min ardinā); (আমার প্রাকৃতিক ফায়সালা জিজ্ঞাসা করে:) তবে কি আমি তাদের জন্য এমন এক অত্যন্ত পবিত্র, সুরক্ষিত ও পরম নিরাপদ আশ্রয় বা প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র সুপ্রতিষ্ঠিত করে দিইনি (Haraman āminā), যার দিকে সর্বপ্রকার জীবন-বিকাশের ফলপ্রসূ উপাদান ও ফলাফল স্বতঃস্ফূর্তভাবে আকৃষ্ট ও সংগৃহীত হয়ে ধাবিত হয়—আমার বিশেষ স্তর থেকে এক অনন্য পুষ্টি লালন-উপাদান হিসেবে? কিন্তু তাদের অধিকাংশ মানুষই এই অমোঘ বৈপ্লবিক নিয়ম বিন্দুমাত্র জানে না।”

Keywords:

  • حَرَمًا آمِنًا (Haraman āminā): আক্ষরিক মক্কার হারাম শরীফ ছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিক পরিভাষায় এটি আল্লাহর দেওয়া কিতাবের এমন এক চিরন্তন, পবিত্র ও দুর্ভেদ্য আইনি ও সামাজিক কেল্লা যা শোষিত সমাজকে সর্বপ্রকার বাহ্যিক ও মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণ থেকে পরম নিরাপত্তা দেয়।

আয়াত ৫৮

وَكَمْ أَهْلَكْنَا مِن قَرْيَةٍ بَطِرَتْ مَعِيشَتَهَا ۖ فَتِلْكَ مَسَاكِنُهُمْ لَمْ تُسْكَنْ مِّن بَعْدِهِمْ إِلَّا قَلِিলًا ۖ وَكُنَّا نَحْنُ الْوَارِثِينَ

“অথច আমি (আমার প্রাকৃতিক নিয়মে) কত যে জনপদ বা সামাজিক জনসমষ্টিকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখোমুখি করেছি—যারা নিজেদের ভোগবিলাস ও কায়েমি অর্থনৈতিক ক্ষমতার দাপটে চরম উদ্ধত, অহংকারী ও উগ্র হয়ে উঠেছিল (Batirat ma'īshatahā); ফলে আজ লক্ষ্য করো—এই হলো তাদের ধসে যাওয়া আবাসস্থল বা ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানসমূহ, যা তাদের পতনের পর সামান্য কিছু ব্যতিক্রমী সময়কাল ব্যতিরেকে আর কোনো দিনই সচল বা আবাদ করা সম্ভব হয়নি; আর আমিই চিরকাল সমস্ত কিছুর চূড়ান্ত উত্তরাধিকারী ও আসল Custodian।”


আয়াত ৫৯

وَمَا كَانَ رَبُّكَ مُهْلِكَ الْقُرُونِ حَتَّىٰ يَبْعَثُ فِي أُمِّهَا رَسُولًا يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِنَا ۚ وَمَا كُنَّا مُهْلِكِي الْقَرْيَةِ إِلَّا وَأَهْلُهَا ظَالِمُونَ

“আর তোমার প্রতিপালক কোনো অবস্থাতেই কোনো প্রজন্ম বা সমাজকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেন না—যতক্ষণ না তিনি সেখানের মূল প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দুতে বা মাতৃ-সংস্কৃতির কেন্দ্রে এমন এক যোগ্য বাণীবাহক বা আদর্শের উত্থান ঘটান (Fī ummihā Rasūlā), যে তাদের সামনে আমার সুস্পষ্ট আয়াত বা আইনি অনুশাসনসমূহ ধারাবাহিক বিশ্লেষণ করে শোনায়; আর আমি কোনো জনপদকে কোনো অবস্থাতেই ধ্বংসকারী নই—তবে সেটির অধিবাসীরা নিজেরা যখন চরম ভারসাম্যহীন অন্যায় ও জুলুমে লিপ্ত হয়, তখন সেটির অবধারিত কুফলেই তারা ধ্বংস হয়।”

Keywords:

  • فِي أُمِّهَا (Fī ummihā): আক্ষরিক কোনো দেশের মা নয়, বরং কোনো রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডের মূল রাজধানী, সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র বা প্রধান প্রশাসনিক শহর যা থেকে পুরো সমাজ পরিচালিত হয়।

আয়াত ৬০

وَمَا أُوتِيتُم مِّن شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِينَتُهَا ۚ وَمَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ ۚ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

“আর তোমাদের আজ (নিজেদের মনগড়া প্রথায়) যা কিছু বৈষয়িক উপকরণ বা ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তা তো কেবলই এই ক্ষণস্থায়ী বৈষয়িক জীবনের সাময়িক ভোগ-বিলাস এবং বাহ্যিক চাকচিক্যের চাকচিক্য মাত্র; অথচ আল্লাহর কিতাবের সুনির্দিষ্ট বিধিতে যা কিছু নিহিত রয়েছে, তা-ই হলো মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ এবং চিরস্থায়ী; তবে কি তোমরা বিন্দুমাত্র নিজের বুদ্ধিবৃত্তি ও যৌক্তিক কার্যকারণকে কাজে লাগাবে না?”


আয়াত ৬১

أَفَمَن وَعَدْنَاهُ وَعْدًا حَسَنًا فَهُوَ لَاقِيهِ كَمَن مَّتَّعْنَاهُ مَتَاعَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ثُمَّ هُوَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِنَ الْمُحْضَرِينَ

“তবে কি ভেবে দেখেছ—যাকে আমি এক অত্যন্ত সর্বোত্তম ও মহিমান্বিত আদর্শিক প্রতিশ্রুতির কিতাব দান করেছি, অতঃপর সে নিজের নিষ্ঠার যোগ্যতায় সেটির বাস্তব সুফল লাভ করতে যাচ্ছে (Fahuwa lāqīhi), সে কি কখনো সেই ব্যক্তির সমকক্ষ হতে পারে—যাকে আমি কেবল এই ক্ষণস্থায়ী বৈষয়িক জীবনের সাময়িক ভোগ-বিলাসের উপকরণ দিয়ে রেখেছি, অতঃপর সেটির অবধারিত ফল হিসেবে সেই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের দিনে সে হবে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দহন ও শাস্তির দরবারে অপদস্থ অবস্থায় উপস্থিতদের অন্তর্ভুক্ত?”


আয়াত ৬২

وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ أَيْنَ شُرَكَائِيَ الَّذِينَ كُنتُمْ تَزْعُمُونَ

“আর সেই দিন, যখন আমার বিধিবদ্ধ নিয়মের অমোঘ চাক্ষুষ ফায়সালা তাদের তীব্র ভাষায় আহ্বান করে জিজ্ঞাসা করবে: কোথায় গেল আজ তোমাদের নিজেদের মনগড়া তৈরি করা সেইসব অংশীদার বা কৃত্রিম শোষক শক্তিগুলো—যাদেরকে তোমরা নিজেদের কায়েমি স্বার্থে চরম ক্ষমতার উৎস বলে অবান্তর ধারণা পোষণ করতে (Kuntum taz'umūn)?”


আয়াত ৬৩

قَالَ الَّذِينَ حَقَّ عَلَيْهِمُ الْقَوْلُ رَبَّنَا هَٰذُلَاءِ الَّذِينَ أَغْوَيْنَا أَغْوَيْنَاهُمْ كَمَا غَوَيْنَا ۖ تَبَرَّأْنَا إِلَيْكَ ۖ مَا كَانُوا إِيَّانَا يَعْبُدُونَ

“তখন যাদের ওপর তাদের অবাধ্যতার কারণে আমার আইনি দণ্ড বা অমোঘ বাণী সুনিশ্চিত হয়ে গেছে, সেই মনগড়া প্রবক্তা বা এলিটরা (নিজেদের বাঁচাতে) চিৎকার করে বলবে: হে আমাদের প্রতিপালক! এই যে সাধারণ জনতা, এদেরকেই আমরা সরল পথ থেকে বিচ্যুত ও লক্ষ্যহীন বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেছিলাম; আমরা এদেরকে ঠিক সেভাবেই বিভ্রান্ত করেছিলাম যেভাবে আমরা নিজেরা নিজেদের কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় লক্ষ্যহীন হয়ে বিভ্রান্ত হয়েছিলাম; আজ আমরা আপনার দরবারে এদের সমস্ত দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ সম্পর্করহিত ও দায়মুক্ত ঘোষণা করছি; এরা তো প্রকৃতপক্ষে আমাদের কোনো দাসত্ব বা আনুগত্য করত না, এরা তো কেবল নিজেদের স্বার্থে আমাদের তৈরি করা অপপ্রথার পেছনে অন্ধ হয়ে ছুটেছিল।”


আয়াত ৬৪

وَقِيلَ ادْعُوا شُرَكَاءَكُمْ فَدَعَوْهُمْ فَلَمْ يَسْتَجِيبُوا لَهُمْ وَرَأَوُا الْعَذَابَ ۚ لَوْ أَنَّهُمْ كَانُوا يَهْتَدُونَ

“এবং সাধারণ জনগণকে তীব্র তিরস্কারে বলা হবে: তোমরা অবিলম্বে আহ্বান করো তোমাদের সেইসব মনগড়া অংশীদার বা কায়েমি মোড়লদের; অতঃপর তারা সেগুলোকে তীব্র আকুতিতে ডাকবে, কিন্তু সেগুলো তাদের এই মহাবিপদে বিন্দুমাত্র কোনো সাড়া বা আইনি সমাধান দিতে পারবে না, আর তারা নিজেদের চোখের সামনে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করবে সেই অবধারিত ধ্বংসাত্মক পরিণতি; হায়! যদি তারা পূর্বেই কিতাবের সঠিক পথনির্দেশ বা হিদায়াত গ্রহণ করত!”


আয়াত ৬৫

وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ مَاذَا أَجَبْتُمُ الْمُرْسَلِينَ

“আর সেই দিন, যখন আমার বিধিবদ্ধ নিয়মের অমোঘ চাক্ষুষ ফায়সালা তাদের তীব্র ভাষায় আহ্বান করে জিজ্ঞাসা করবে: তোমরা পরম সত্যের বাণীবাহক বা সুনির্দিষ্ট শাসনতান্ত্রিক রূপরেখাকে কীরূপ বাস্তব জবাব বা সাড়া দিয়েছিলে?”


আয়াত ৬৬

فَعَمِيَتْ عَلَيْهِمُ الْأَنبَاءُ يَوْمَئِذٍ فَهُمْ لَا يَتَسَاءَلُونَ

“অতঃপর সেটির অবধারিত ফল হিসেবে সেই সুনির্দিষ্ট সন্ধিক্ষণে সমস্ত অজুহাত, বানোয়াট খবরাখবর বা মনগড়া যুক্তির মারপ্যাঁচে তাদের চোখ ও বুদ্ধিবৃত্তি সম্পূর্ণ অন্ধ ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়বে, ফলে তারা নিজেদের মধ্যে বিন্দুমাত্র কোনো জিজ্ঞাসাবাদ বা অজুহাত পেশ করার কোনো সুযোগ পাবে না।”


আয়াত ৬৭

فَأَمَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَعَسَىٰ أَن يَكُونَ مِنَ الْمُفْلِحِينَ

“অতঃপর পক্ষান্তরে যে কেউ নিজের ভুল পথ থেকে অনুতপ্ত হয়ে সত্যের দিকে ফিরে এসেছে (Tāba), বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের ভিত্তিতে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করেছে (Wa āmana) এবং সংশোধনমূলক কল্যাণকর কর্ম সম্পাদন করেছে (Wa 'amila sālihā), আশা করা যায় সে-ই হবে চূড়ান্তভাবে সফল, বিকসিত ও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে সমাসীনদের অন্তর্ভুক্ত (Minal-muflihīn)।”


আয়াত ৬৮

وَرَبُّكَ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَيَخْتَارُ ۗ مَا كَانَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ ۚ سُبْحَانَ اللَّهِ وَتَعَالَىٰ عَمَّا يُشْرِكُونَ

“আর তোমার প্রতিপালক (তাঁর অমোঘ নিয়মে) যা কিছু ইচ্ছা করেন তা নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেন এবং বৈপ্লবিক কাজের জন্য যোগ্যতম উপাদান বা ব্যক্তিত্বকে মনোনীত ও পছন্দ করেন (Wayakhtāru); কোনো বিষয়ে নিজের কায়েমি স্বার্থে মনগড়া সিদ্ধান্ত বা পছন্দের বিন্দুমাত্র কোনো আইনি অধিকার সাধারণ মানুষের নেই; তারা আল্লাহর পরম আইনের পাশাপাশি অন্য যাকে যাকে সমান কর্তৃত্ব বা অংশীদার বানাচ্ছে, আল্লাহ তা থেকে পরম পবিত্র ও সুউচ্চ স্তরে সমাসীন।”


আয়াত ৬৯

وَرَبُّكَ يَعْلَمُ مَا تُكِنُّ صُدُورُهُمْ وَمَا يُعْلِنُونَ

“আর তোমার প্রতিপালক সুস্পষ্ঠভাবে জানেন যা কিছু তাদের ভেতরের গোপন চিন্তার বক্ষপঞ্জর বা মানসিক কায়েমি স্বার্থ লুকিয়ে রাখছে (Mā tukinnu sudūruhum), এবং তারা প্রকাশ্যে জনগণের সামনে যা কিছু আদর্শিক বা বানোয়াট ঘোষণা করছে সে সম্পর্কেও নিখুঁতভাবে পরিজ্ঞাত।”


আয়াত ৭০

وَهُوَ اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ لَهُ الْحَمْدُ فِي الْأُولَىٰ وَالْآخِرَةِ ۖ وَلَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

“আর তিনিই হলেন একমাত্র আল্লাহ, যিনি ব্যতিরেকে অন্য কোনো মনগড়া ইলাহ বা প্রথার বিন্দুমাত্র কোনো বৈধতা নেই; এই জীবনের প্রতিটি প্রারম্ভিক স্তরে এবং ভবিষ্যতের প্রতিটি সুদূরপ্রসারী দীর্ঘস্থায়ী ফলাফলের স্তরে সমস্ত প্রশংসিত নিয়মের মালিকানা কেবল তাঁরই একক নিয়ন্ত্রণে; আর সমস্ত চূড়ান্ত আইনি ফায়সালা বা রায় জারি করার ক্ষমতা কেবল তাঁরই এখতিয়ারে (Walahul-Hukmu), এবং তাঁরই বিধিবদ্ধ নিয়মের জবাবদিহিতায় তোমাদের সবাইকে ফিরিয়ে আনা হবে।”


আয়াত ৭১

قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِن جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ اللَّيْلَ سَرْمَدًا إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَٰهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُم بِضِيَاءٍ ۖ أَفَلَا تَسْمَعُونَ

“তুমি তাদের চূড়ান্ত জাবাবে জিজ্ঞাসা করো: তোমরা কি বিন্দুমাত্র চাক্ষুষ জ্ঞান দিয়ে ভেবে দেখেছ—আল্লাহ যদি তাঁর প্রাকৃতিক নিয়মে তোমাদের ওপর অন্ধকার রাত বা অজ্ঞানতার কালকে চিরস্থায়ী বা দীর্ঘায়িত করে দেন (Al-Layla sarmadan) সেই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের দিন পর্যন্ত, তবে আল্লাহ ব্যতিরেকে এমন কোন মনগড়া ইলাহ বা ক্ষমতা আছে—যে তোমাদের চিন্তাজগতে পরম সত্যের সুস্পষ্ঠ চাক্ষুষ আলো নিয়ে আসতে পারে? তবে কি তোমরা বিন্দুমাত্র কিতাবের বাণী নিবিড়ভাবে গ্রহণ করবে না?”


আয়াত ৭২

قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِن جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارَ سَرْمَدًا إِلَىٰ يَوْมِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَٰهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُم بِلَيْلٍ تَسْكُنُونَ فِيهِ ۖ أَفَلَا تُبْصِرُونَ

“তুমি বলো: তোমরা কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছ—আল্লাহ যদি তোমাদের ওপর কর্মব্যস্ত দিন বা সত্যের প্রকাশ্য রূপকে চিরস্থায়ী করে দেন সেই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের দিন পর্যন্ত, তবে আল্লাহ ব্যতিরেকে এমন কোন মনগড়া ইলাহ আছে—যে তোমাদের জন্য এক সুরক্ষামূলক শান্ত অন্ধকার বা ক্লান্তি দূরকারী স্থিতিশীলতার পর্যায় নিয়ে আসতে পারে যার মধ্যে তোমরা পরম মানসিক শান্তি ও স্বস্তি লাভ করতে পারো? তবে কি তোমরা বিন্দুমাত্র নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে সত্য প্রত্যক্ষ করবে না?”


আয়াত ৭৩

وَمِن رَّحْمَتِهِ جَعَلَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَلِتَبْتَغُوا مِن فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

“আর এটি কেবল তাঁরই বিশেষ ঐশী লালন ও রহমতের অনুকম্পা যে—তিনি তোমাদের সমাজ ও জীবন বিকাশের জন্য অন্ধকার রাত এবং আলোকময় দিনকে সুনির্দিষ্ট সুশৃঙ্খল নিয়মে স্থাপন করেছেন; যাতে তোমরা সুরক্ষামূলক স্থিতিশীলতার পর্যায়ে পরম মানসিক স্বস্তি লাভ করতে পারো, এবং যাতে তোমরা কর্মব্যস্ত আলোর পর্যায়ে ধাবিত হয়ে তাঁরই অফুরন্ত অনুগ্রহ ও যোগ্যতা অনুসন্ধান করতে পারো এবং যেন তোমরা নিয়ামতের সঠিক বাস্তব মূল্যায়নের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারো।”


আয়াত ৭৪

وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ أَيْنَ شُرَكَائِيَ الَّذِينَ كُنتُمْ تَزْعُمُونَ

“আর সেই দিন, যখন আমার বিধিবদ্ধ নিয়মের চাক্ষুষ ফায়সালা তাদের তীব্র ভাষায় আহ্বান করে জিজ্ঞাসা করবে: কোথায় গেল আজ তোমাদের নিজেদের মনগড়া তৈরি করা সেইসব অংশীদার বা কায়েমি প্রবক্তারা—যাদেরকে তোমরা পরম ক্ষমতার উৎস বলে অবান্তর ধারণা পোষণ করতে?”


আয়াত ৭৫

وَنَزَعْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ شَهِيدًا فَقُلْنَا هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ فَعَلِمُوا أَنَّ الْحَقَّ لِلَّهِ وَضَلَّ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ

“এবং আমি প্রতিটি আদর্শিক সমাজ বা মানবগোষ্ঠী থেকে এক একজন চাক্ষুষ বাস্তবতার জীবন্ত সাক্ষী বা বাণীবাহককে আলাদা করে এনে দাঁড় করাবো (Wanaza'nā min kulli ummatin shahīdā), অতঃপর আমি প্রতিপক্ষের কায়েমি এলিটদের নির্দেশ দেব: তোমরা অবিলম্বে উপস্থাপন করো তোমাদের সেই দাবির সপক্ষে অকাট্য বুদ্ধিবৃত্তিক মহাপ্ৰমাণ বা দলিল (Hātū burhānakum); অতঃপর তারা চাক্ষুষ জ্ঞানে সুস্পষ্ঠভাবে অনুধাবন করবে যে—নিশ্চয়ই পরম ও অকাট্য বাস্তব সত্য কেবল আল্লাহর আইনের জন্যই সুনিশ্চিত, আর তাদের মন থেকে সম্পূর্ণরূপে ধূলিসাৎ ও বিলীন হয়ে যাবে তারা যে সমস্ত জঘন্য মনগড়া চক্রান্ত, অপপ্রথা ও মিথ্যা অপবাদের জাল বুনেছিল।”

আয়াত ৭৫

وَنَزَعْنَا مِن كُلِّ أُمَّةٍ شَهِيدًا فَقُلْنَا هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ فَعَلِمُوا أَنَّ الْحَقَّ لِلَّهِ وَضَلَّ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ

“এবং আমি প্রতিটি আদর্শিক সমাজ বা উপদল থেকে এক একজন চাক্ষুষ বাস্তবতার সাক্ষী বা রোল মডেল আলাদা করব (Wa naza'nā min kulli ummatin shahīdā); অতঃপর আমি তাদের কায়েমি কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেব—তোমাদের মনগড়া ব্যবস্থার সপক্ষে তোমাদের অকাট্য যৌক্তিক প্রমাণ বা দলিল নিয়ে এসো; তখন তারা চাক্ষুষ জ্ঞানে সুস্পষ্ঠভাবে অনুধাবন করতে পারবে যে—নিশ্চয়ই পরম ও অকাট্য বাস্তব সত্যের একমাত্র মালিকানা ও চূড়ান্ত আইনি কর্তৃত্ব কেবল আল্লাহরই (Annal-haqqa lillāh); আর তারা নিজেদের কায়েমি স্বার্থে যে সমস্ত অবাস্তব চক্রান্ত ও মিথ্যা মনগড়া অপদর্শন তৈরি করেছিল, তা সবকিছুই তাদের চেতনা থেকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন ও লক্ষ্যহীন হয়ে যাবে।”


আয়াত ৭৬

إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِن قَوْمِ مُوسَىٰ فَبَغَىٰ عَلَيْهِمْ ۖ وَآتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ

“নিশ্চয়ই কারূন (অর্থাৎ একচেটিয়া পুঁজিপতি ও শোষক শ্ৰেণী) ছিল মূলত মূসারই সমাজ বা জাতির অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু সে নিজের সম্পদের দাপটে তাদের ওপর চরম সীমালঙ্ঘন, অন্যায় ও নিপীড়ন চালিয়েছিল (Fabaghā 'alayhim); আর আমি তাকে এমন বিপুল গোপন ধনাগার ও রাষ্ট্রীয় খজানা দান করেছিলাম যার চাবিকাঠি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বহন করতে একদল অত্যন্ত শক্তিশালী ও সামর্থ্যবান ব্যক্তিরও কষ্ট হতো; যখন তার সমাজ বা সচেতন মুমিনেরা তাকে বলেছিল: তুমি বৈষয়িক দাপটে ও অহংকারে বিন্দুমাত্র সীমাহীন উল্লাসে মেতে উঠো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ অহংকারে মত্ত ও ভারসাম্যহীন উল্লাসকারীদের মোটেও পছন্দ করেন না।”

Keywords:

  • قَارُونَ (Qārūn): আক্ষরিক কোনো ব্যক্তি ছাড়াও সমাজতাত্ত্বিক পরিভাষায় এটি এমন এক বিশেষ পুঁজিপতি, সিন্ডিকেট বা একচেটিয়া একচেটিয়া শোষক গোষ্ঠী যা সমস্ত অর্থনৈতিক উপাদান নিজের কুক্ষিতে নিয়ে সমাজকে ক্রীতদাস বানায় (ধাতুমূল: ক-র-ন = মেলবন্ধন বা জমাটবদ্ধ করা)।

আয়াত ৭৭

وَابْتَغِ فِي مَا آتَاكَ اللَّهُ الدَّارَ الْآخِرَةَ ۖ وَلَا تَنسَ نَصِيبَكَ مِنَ الدُّنْيَا ۖ وَأَحْسِن كَمَا أَحْسَنَ اللَّهُ إِلَيْكَ ۖ وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ

“আর আল্লাহ তোমাকে যে সমস্ত বৈষয়িক পুষ্টি, সম্পদ বা সামর্থ্য দান করেছেন, সেটির দ্বারা তুমি ভবিষ্যতের দীর্ঘস্থায়ী বৈপ্লবিক জীবন ও সমাজ-কাঠামো গড়ার অনুসন্ধান করো (Wabtaghi fī mā ātākallāhad-Dāral-Ākhirah), এবং এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের স্বাভাবিক প্রয়োজন বা তোমার হকের অংশটুকুও ভুলে যেও না, এবং তুমি অন্য মানুষের প্রতি পরম ইহসান বা ভারসাম্যপূর্ণ কল্যাণ করো যেভাবে আল্লাহ তোমার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ ও ইহসান করেছেন; আর তুমি কোনো অবস্থাতেই এই বাস্তব পৃথিবীর বুকে চরম বিশৃঙ্খলা, ফাসাদ ও অবক্ষয় সৃষ্টির অপচেষ্টা কোরো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের মোটেও পছন্দ করেন না।”


আয়াত ৭৮

قَالَ إِنَّمَا أُوتِيتُهُ عَلَىٰ عِلْمٍ عِندِي ۚ أَوَلَمْ يَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ قَدْ أَهْلَكَ مِن قَبْلِهِ مِنَ الْقُرُونِ مَنْ هُوَ أَشَدُّ مِنْهُ قُوَّةً وَأَكْثَرُ جَمْعًا ۚ وَلَا يُسْأَلُ عَن ذُنُوبِهِمُ الْمُجْرِمُونَ

“সে (সেই পুঁজিপতি কারূন মানসিকতা) অত্যন্ত দাম্ভিকতায় বলেছিল: আমাকে এই সমস্ত ধনাগার বা সম্পদ দেওয়া হয়েছে কেবল আমার নিজের কাছে থাকা এক সুগভীর বৈষয়িক চাতুর্য, অর্থনৈতিক জ্ঞান ও চাক্ষুষ যোগ্যতার ভিত্তিতে ('Alā 'ilmin 'indī)! তবে কি সে বিন্দুমাত্র নিজের বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে ভেবে দেখেনি যে—নিশ্চয়ই আল্লাহ তার পূর্বেও কত যে সুদীর্ঘ সময়কাল বা দাম্ভিক প্রজন্মকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছেন, যারা ভৌত শক্তির দিক থেকে এর চেয়ে অনেক বেশি কঠোর বা শক্তিশালী ছিল এবং কায়েমি দলবল বা পুঁজির পুঞ্জীভবনের দিক থেকেও অনেক বড় ছিল? আর এই অপরাধী ও সমাজ-বিধ্বংসী চক্রের অপকর্মের বিচার করতে তাদের কোনো মনগড়া কৈফিয়ত বা অজুহাত জিজ্ঞাসা করার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন হয় না (তাদের ধ্বংসাত্মক পরিণতিই তাদের কুফল সাব্যস্ত করে)।”


আয়াত ৭৯

فَخَرَجَ عَلَىٰ قَوْمِهِ فِي زِينَتِهِ ۖ قَالَ الَّذِينَ يُرِيدُونَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا يَا لَيْتَ لَنَا مِثْلَ مَا أُوتِيَ قَارُونُ إِنَّهُ لَذُو حَظٍّ عَظِيمٍ

“অতঃपर সে (কারূন) তার সমাজ বা সাধারণ মানুষের সামনে নিজের সমস্ত বাহ্যিক জাঁকজমক, চাকচিক্য ও অলঙ্কারের দাপটে আত্মপ্রকাশ করল (Fakharaja 'alā qawmihī fī zīnatihī); তখন যারা কেবল এই ক্ষণস্থায়ী বৈষয়িক জীবনের তুচ্ছ চাকচিক্যই তীব্রভাবে কামনা করত, তারা (লোভাতুর চিত্তে) বলে উঠল: হায়, আমাদেরও যদি ঠিক তেমনই বিপুল পুঁজিবাদী ধনাগার থাকত যেমনটি কারূনকে দেওয়া হয়েছে! নিশ্চয়ই সে তো এক অত্যন্ত বিশাল ও মহিমান্বিত সৌভাগ্যের অধিকারী!”


আয়াত ৮০

وَقَالَ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ وَيْلَكُمْ ثَوَابُ اللَّهِ خَيْرٌ لِّمَنْ آمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا وَلَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الصَّابِرُونَ

“অথচ যাদেরকে প্রকৃত জ্ঞান ও ঐশী প্রজ্ঞা দান করা হয়েছিল (Ūtul-'ilma), তারা সেই অবোধদের উদ্দেশ্য করে কঠোর ভাষায় বলল: ধিক্কার তোমাদের এই বস্তুনিষ্ঠ মানসিকতার প্রতি! আল্লাহর দেওয়া চিরন্তন কিতাবের প্রতিদান ও আত্মিক পুষ্টিই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ—তার জন্য যে বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের ভিত্তিতে ইমান এনেছে এবং সমাজে সংশোধনমূলক কল্যাণকর কর্ম সম্পাদন করেছে (Thawābullāhi khayrul-liman āmana); আর এই সুউচ্চ মানসিক স্তরটি সত্যের পথে চলতে গিয়ে যে কোনো বাধা বা কষ্টের মুখে অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল ব্যক্তিত্ব বা সাবিরীন ব্যতীত অন্য কাউকে কখনই দেওয়া বা মেলবন্ধন করা হয় না।”


আয়াত ৮১

فَخَسَفْنَا بِهِ وَبِدَارِهِ الْأَرْضَ فَمَا كَانَ لَهُ مِن فِئَةٍ يَنصُرُونَهُ مِن دُونِ اللَّهِ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُنتَصِرِينَ

“সেটির অবধারিত ফল হিসেবে আমি (আমার প্রাকৃতিক ও সামাজিক ওলটপালটের নিয়মে) তাকে এবং তার সেই সমস্ত বৈষয়িক বাড়ি বা কায়েমি সাম্রাজ্যকে ভূখণ্ডের অতল গহ্বরে সম্পূর্ণরূপে ধসিয়ে বা বিলীন করে দিলাম (Fakhasafnā bihī wa bidārihil-arda); অতঃপর আল্লাহর বিধিবদ্ধ আইনি নিয়মের বিরুদ্ধে তাকে সাহায্য বা উদ্ধার করতে পারে—এমন কোনো কায়েমি দলবল বা কোয়ালিশন তার পক্ষে দাঁড়াতে পারল না এবং সে নিজে কোনো প্রকার আইনি প্রতিরোধ গড়ে তুলতেও বিন্দুমাত্র সক্ষম হলো না।”

Keywords:

  • فَخَسَفْنَا (Fakhasafnā): আক্ষরিক মাটি ফেটে মানুষ গিলে ফেলা নয়, বরং কোনো অন্যায় ও বৈষম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক সিন্ডিকেট বা স্বৈরাচারী সাম্রাজ্যের এমন এক আকস্মিক দেউলিয়া অবস্থা, পতন বা ধস যা সেটিকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

আয়াত ৮২

وَأَصْبَحَ الَّذِينَ تَمَنَّوْا مَكَانَهُ بِالْأَمْسِ يَقُولُونَ وَيْكَأَنَّ اللَّهَ يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ ۖ لَوْلَا أَن مَّنَّ اللَّهَ عَلَيْنَا لَخَسَفَ بِنَا ۖ وَيْكَأَنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ

“আর যারা গতকাল পর্যন্ত তার সেই উচ্চ বৈষয়িক সামাজিক অবস্থানের তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিল, তারা আজ সকাল হতেই (চরম বিস্ময়ে ও অনুশোচনায়) বলতে লাগল: আহা, কী আশ্চর্য! নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর অনুগত দাসদের মধ্য থেকে যার ক্ষেত্রে উপযুক্ত মনে করেন—তার ব্যক্তিত্ব বিকাশের উপাদান বা বৈষয়িক রিজিককে ক্রমান্বয়ে প্রসারিত করেন (Yabsutur-rizqa) এবং যার ক্ষেত্রে উপযুক্ত মনে করেন—তার জন্য তা এক সুনির্দিষ্ট নিখুঁত পরিমাপে সংকুচিত বা নির্ধারণ করেন; যদি আল্লাহ আমাদের ওপর বিশেষ অনুগ্রহের নিয়ামত দান না করতেন (অর্থাৎ আমাদের কারূনের মতো পুঁজিবাদ না দিতেন), তবে আজ আমাদেরও নিশ্চিতভাবেই এই দেউলিয়া বা পতনের অতল গহ্বরে ধসিয়ে দিতেন; আহা, এটি কতই না ধ্রুব সত্য বাস্তব যে—সত্য প্রত্যাখ্যানকারী অপশক্তিগুলো কখনই চূড়ান্ত বিকাশ ও সফলতা লাভ করতে পারে না (Lā yuflihul-kāfirūn)।”


আয়াত ৮৩

تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا ۚ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ

“এই হলো ভবিষ্যতের সেই সুউচ্চ দীর্ঘস্থায়ী বৈপ্লবিক জীবন বা সমাজ-কাঠামো, যা আমি সুনির্দিষ্টভাবে কেবল তাদের জন্যই নির্ধারিত করি—যারা এই বাস্তব পৃথিবীর বুকে বিন্দুমাত্র কোনো মনগড়া স্বৈরাচারী দাপট, উগ্র অহংকার বা উচ্চাভিলাষ চায় না (Lā yurīdūna 'uluwwan fil-ardi) এবং কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বা অবক্ষয় সৃষ্টি করতে চায় না; আর সমস্ত কর্মের শুভ ও চূড়ান্ত সুউচ্চ পরিণতি তো কেবল সুরক্ষামূলক সতর্কতা ও দায়িত্বশীলদের জন্যই সুনিশ্চিত (Wal-'āqibatu lil-muttaqīn)।”


আয়াত ৮৪

مَن جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ خَيْرٌ مِّنْهَا ۖ وَمَن جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى الَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ إِلَّا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

“যে কেউ আল্লাহর সামনে কোনো অত্যন্ত সুষম, সুন্দর ও কল্যাণকর কর্ম নিয়ে হাজির হবে, তার জন্য রয়েছে সেটির চেয়েও অনেক বড় ও মহিমান্বিত স্থায়ী কল্যাণ বা প্রতিদান (Falahū khayrum-minhā); আর যে কেউ কোনো বিকৃত, অন্যায় ও নেতিবাচক অপকর্ম নিয়ে হাজির হবে, তবে যারা অবিরত অপকর্ম সম্পাদন করেছে—তারা তাদের অস্তিত্বে সেটির অবধারিত ফল হিসেবে ঠিক সমপরিমাণ ধ্বংসাত্মক পরিণতিই ভোগ করবে যা তারা বাস্তবে অবিরত কামাই করছিল।”


আয়াত ৮৫

إِنَّ الَّذِي فَرَضَ عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لَرَادُّكَ إِلَىٰ مَعَادٍ ۚ قُل رَّبِّي أَعْلَمُ مَن جَاءَ بِالْهُدَىٰ وَمَنْ هُوَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ

“নিশ্চয়ই যিনি তোমার ওপর এই সুবিন্যস্ত ও চিরন্তন কিতাবের অনুশাসনকে পালন করা বা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত করা অবহারিত আইনি দায়িত্ব হিসেবে ফরজ বা অর্পণ করেছেন (Innal-lazī farada 'alaykal-Qur'āna), তিনি অবশ্যই তোমাকে (তোমার এই অবিরাম সংগ্রামের এক পর্যায়ে) এক অত্যন্ত মহিমান্বিত চূড়ান্ত গন্তব্য, লক্ষ্য বা বিজয়ের বৈপ্লবিক ক্ষেত্রে পুনরায় ফিরিয়ে আনবেন (Larāadduka ilā ma'ād); তুমি তাদের চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জে ঘোষণা করে দাও: আমার প্রতিপালক সবচেয়ে ভালো জানেন—কে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট পথনির্দেশ বা হিদায়াত নিয়ে হাজির হয়েছে এবং কে প্রকৃতপক্ষে এক প্রকাশ্য ও চাক্ষুষ লক্ষ্যহীন বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত রয়েছে।”

Keywords:

  • مَعَادٍ (Ma’ād): আক্ষরিক মক্কায় ফিরে আসা ছাড়াও এর সুগভীর শাসনতান্ত্রিক অর্থ—কোনো আন্দোলনের এমন এক সুনির্দিষ্ট বৈপ্লবিক উত্থান, বিজয়ের ক্ষেত্র বা কাঙ্ক্ষিত মূল লক্ষ্য যেখানে ধাপে ধাপে বিবর্তিত হয়ে সত্যপন্থীরা পুনরায় নিজেদের ক্ষমতা সুপ্রতিষ্ঠিত করে (ধাতুমূল: অ-ও-দ = ফিরে আসা)।

আয়াত ৮৬

وَمَا كُنتَ تَرْجُو أَن يُلْقَىٰ إِلَيْكَ الْكِتَابُ إِلَّا رَحْمَةً مِّن رَّبِّكَ ۖ فَلَا تَكُونَنَّ ظَهِيرًا لِّلْكَافِرِينَ

“আর তুমি তো কোনো অবস্থাতেই এই সুদূরপ্রসারী আশা বা প্রত্যাশা করতে পারোনি যে—তোমার চিন্তায় উচ্চ সুরক্ষার স্তর থেকে এই বিধিবদ্ধ কিতাব বা রূপরেখা অর্পণ বা নিক্ষেপ করা হবে (An yulqā ilaykal-Kitābu), এটি তো কেবল তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক বিশেষ ঐশী লালন ও রহমতের অনুকম্পা; সুতরাং তুমি কোনো অবস্থাতেই এই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী অপশক্তিগুলোর বিন্দুমাত্র কোনো সাহায্যকারী বা কায়েমি পৃষ্ঠপোষক হবে না (Falā takūnanna zahīral-lil-kāfirīn)।”


আয়াত ৮৭

وَلَا يَصُدُّنَّكَ عَنْ آيَاتِ اللَّهِ بَعْدَ إِذْ أُنزِلَتْ إِلَيْكَ ۖ وَادْعُ إِلَىٰ رَبِّكَ ۖ وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ

“আর তারা যেন কোনো অবস্থাতেই তোমার চিন্তায় উচ্চ সুরক্ষার স্তর থেকে আল্লাহর সুস্পষ্ট আয়াত ও অকাট্য বিধি-বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পর—সেটি সমাজে প্রয়োগ বা কার্যকর করার ক্ষেত্রে তোমাকে বিন্দুমাত্র কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে না পারে (Walā yasuddunnaka 'an āyātillāh); আর তুমি মানুষকে অবিরত আহ্বান করো তোমার প্রতিপালকের কিতাবের বিধানের দিকে, এবং তুমি কোনো অবস্থাতেই আল্লাহর আইনের পাশাপাশি মানুষের তৈরি আইনকে অংশীদার বানানো মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হবে না।”


আয়াত ৮৮

وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ ۘ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ ۚ لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

“আর তুমি আল্লাহর চূড়ান্ত আইনের পাশাপাশি অন্য কোনো মনগড়া উপাস্য, প্রথা বা সমান্তরাল কর্তৃপক্ষকে নিজের ক্ষমতার উৎস হিসেবে আহ্বান কোরো না, তিনি ব্যতিরেকে অন্য কোনো ইলাহ বা আইনি ব্যবস্থার বিন্দুমাত্র কোনো বৈধতা বা স্থায়িত্ব নেই; মহাবিশ্বের প্রতিটি সত্তা, উপাদান বা মানুষের তৈরি মনগড়া কায়া সম্পূর্ণরূপে ক্ষয়িষ্ণু ও ধ্বংসশীল (Kullu sha'iyin hālikun), কেবল তাঁরই সেই পরম সত্তা, চিরন্তন দিকনির্দেশনা ও অমোঘ নিয়ম ব্যতীত (Illā wajhahū); এই মহাবিশ্ব ও সমাজ পরিচালনার চূড়ান্ত আইনি রায় ও শাসনক্ষমতা কেবল তাঁরই একক নিয়ন্ত্রণে (Lahul-Hukmu), আর তাঁরই বিধিবদ্ধ অমোঘ নিয়মের জবাবদিহিতায় তোমাদের সবাইকে ধাপে ধাপে ফিরিয়ে আনা হবে।”

Keywords:

  • وَجْهَهُ (Wajhahū): আক্ষরিক ঈশ্বরের মুখ অবয়ব নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া সুনির্দিষ্ট আইনি দিক, চিরন্তন নীতি, কিতাবের অভিমুখ বা এমন পরম সত্তা যা কখনো ক্ষীয়মাণ নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *