| SURAH 25 : Al-Furqân |
আয়াত ১
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا
“পরম মহিমান্বিত ও অফুরন্ত দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণের উৎস হলেন সেই সত্তা—যিনি তাঁর অনুগত নিবেদিত দাসের ওপর সত্য ও মিথ্যার পরম পার্থক্যকারী এই সুনির্দিষ্ট রূপরেখা অবতীর্ণ করেছেন (Nazzalal-Furqāna 'alā 'abdihī), যাতে তা সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য এক সুস্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণাদিসহ সতর্ককারী হতে পারে।”
Keywords:
- الْفُرْقَانَ (Al-Furqān): সত্য ও মিথ্যার মধ্যে, সঠিক ও ভুলের মধ্যে একদম সুষ্পষ্ট প্রাচীর বা ব্যবধান রেখা টেনে দেওয়ার পরম জ্ঞানতাত্ত্বিক ও আইনি মানদণ্ড।
আয়াত ২
الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكٌ فِي الْمُلْكِ وَخَلَقَ كُلِّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا
“তিনিই সেই সত্তা, যাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে উচ্চ সুরক্ষামূলক স্তরের এবং এই বাস্তব পৃথিবীর বুকে সমস্ত কিছুর সার্বভৌম ক্ষমতা ও চূড়ান্ত কর্তৃত্ব (Al-Mulku), এবং তিনি নিজের জন্য কোনো আক্ষরিক সন্তান গ্রহণ করেননি এবং সেই ক্ষমতার সার্বভৌমত্বে তাঁর সাথে অন্য কোনো মনগড়া কর্তৃপক্ষের বিন্দুমাত্র কোনো বৈধতা নেই; আর তিনি মহাবিশ্বের প্রতিটি সত্তা ও উপাদান সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর সেটিকে এক সুনির্দিষ্ট নিখুঁত গাণিতিক পরিমাপ ও অমোঘ আইনে সুবিন্যস্ত করেছেন (Faqaddarahū taqdīrā)।”
আয়াত ৩
وَاتَّخَذُوا مِن دُونِهِ آلِهَةً لَّا يَخْلُقُونَ شَيْئًا وَهُمْ يُخْلَقُونَ وَلَا يَمْلَكُونَ لِأَنفُسِهِمْ ضَرًّا وَلَا نَفْعًا وَلَا يَمْلَكُونَ مَوْتًا وَلَا حَيَاةً وَلَا نُشُورًا
“অথচ তারা আল্লাহর সেই চূড়ান্ত আইনকে বর্জন করে অন্য কিছু মনগড়া উপাস্য বা অন্ধ আদর্শকে নিজেদের কর্তৃত্বের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছে, যারা নিজেরা বিন্দুমাত্র কোনো কিছু সৃষ্টি করতে পারে না বরং তারা নিজেরাই অন্যের দ্বারা সৃষ্ট বা চালিত; এবং তারা নিজেদের সত্তার জন্যও কোনো বাস্তব ক্ষতি রোধ করার বা কোনো বাস্তব উপকার করার বিন্দুমাত্র ক্ষমতা রাখে না, এবং তারা কোনো কর্মের সমাপ্তি বা ধ্বংসের ওপর, কোনো সজীব জীবনের ওপর এবং কোনো বৈপ্লবিক উত্থান বা প্রচারের ওপর বিন্দুমাত্র কোনো নিয়ন্ত্রণ বা ক্ষমতা রাখে না।”
আয়াত ৪
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَٰذَا إِلَّا إِفْكٌ افْتَرَاهُ وَأَعَانَهُ عَلَيْهِ قَوْمٌ آخَرُونَ ۖ فَقَدْ جَاءُوا ظُلْمًا وَزُورًا
“আর যারা সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরেও তা আড়াল বা অস্বীকার করেছে, তারা প্রচার করে: এই কিতাব বা রূপরেখা তো এক জঘন্য মনগড়া মিথ্যা বা চরম সত্য-বিচ্যুতি ব্যতিরেকে আর কিছুই নয় যা সে নিজে বানিয়ে নিয়েছে (In hāzā illā ifkunif-tarāhu), এবং এই চক্রান্তে অন্য এক সুনির্দিষ্ট মানবদল বা বহিরাগত গোষ্ঠী তাকে গোপনে সাহায্য করেছে; নিশ্চয়ই তারা এক চরম জঘন্য অন্যায়, জুলুম ও বানোয়াট মিথ্যা অপবাদ নিয়ে এসেছে।”
Keywords:
- إِفْكٌ (Ifkun): সত্যকে তার মূল জায়গা থেকে সম্পূর্ণরূপে উলটে দিয়ে বা বিকৃত করে এক ভয়ঙ্কর মিথ্যা বা বিভ্রান্তি তৈরি করা।
আয়াত ৫
وَقَالُوا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ اكْتَتَبَهَا فَهِيَ تُمْلَىٰ عَلَيْهِ بُكْرَةً وَأَصِيلًا
“এবং তারা অবিরত বলে: এগুলো তো সুদূর অতীতের প্রাচীন মানুষদের অন্ধ রূপকথা ও মনগড়া বানোয়াট উপাখ্যান যা সে নিজের স্বার্থে কিতাব আকারে লিখিয়ে নিয়েছে (Asātīrul-awwalīnak-tatabahā), অতঃপর সেগুলোই তার চিন্তায় সকাল-সন্ধ্যা বা অবিরত প্রজেক্ট বা প্ররোচনা হিসেবে ডিক্টেক্ট বা ইনজেক্ট করা হচ্ছে!”
আয়াত ৬
قُلْ أَنزَلَهُ الَّذِي يَعْلَمُ السِّرَّ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ إِنَّهُ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا
“তুমি তাদের চূড়ান্ত জবাবে ঘোষণা করে দাও: এই কিতাব বা রূপরেখা অবতীর্ণ করেছেন সেই পরম সত্তা—যিনি উচ্চ সুরক্ষামূলক মহাজাগতিক স্তরের এবং এই বাস্তব পৃথিবীর অন্তরালে থাকা প্রতিটি সুক্ষ্ম ও গোপন রহস্য সুস্পষ্ঠভাবে পরিজ্ঞাত (Ya'lamus-sirra); নিশ্চয়ই তিনি পরম সুরক্ষাদাতা, পরম দয়ালu।”
আয়াত ৭
وَقَالُوا مَالِ هَٰذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ ۙ لَوْلَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مَلَكٌ فَيَكُونَ مَعَهُ نَذِيرًا
“এবং তারা উপহাস করে বলে: কেমন বাণীবাহক বা আদর্শ এটি—যে সাধারণ মানুষের মতোই পুষ্টি বা অন্ন গ্রহণ করে (Ya'kulut-ta'āma) এবং সাধারণ নাগরিকদের মতোই বাজার-ঘাটে বা প্রকাশ্য সামাজিক ক্ষেত্রে বিচরণ করে? তার নিকট আকাশ থেকে কোনো অদৃশ্য মহাজাগতিক চালিকাশক্তি বা ফেরেশতা কেন অবতীর্ণ করা হলো না, যাতে সে তার সাথে থেকে এক সতর্ককারী হিসেবে কাজ করতে পারত?”
আয়াত ৮
أَوْ يُلْقَىٰ إِلَيْهِ كَنزٌ أَوْ تَكُونُ لَهُ جَنَّةٌ يَأْكُلُ مِنْهَا ۚ وَقَالَ الظَّالِمُونَ إِن تَتَّبِعُونَ إِلَّا رَجُلًا مَّسْحُورًا
“নাকি তার নিকট ওপর থেকে কোনো সুউচ্চ রাষ্ট্রীয় খজানা বা বিপুল ধন-সম্পদের ভাণ্ডার নিক্ষেপ করা হতো, অথবা তার নিজের কোনো একচ্ছত্র সুখ ও সুরক্ষার সুউচ্চ বাগান থাকত যা থেকে সে নিজে অবলীলায় ভোগ বা পুষ্টি গ্রহণ করতে পারত? আর এই ভারসাম্যহীন অন্যায়কারীরা সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করতে বলে: তোমরা তো কেবল এক চরম মনস্তাত্ত্বিক কূটকৌশল বা জাদुकরী প্রোপাগান্ডার মোহে অন্ধ হওয়া ব্যক্তির অনুসরণ করছ (Illā rajulam mashūrā)!”
আয়াত ৯
انظُرْ كَيْفَ ضَرَبُوا لَكَ الْأَمْثَالَ فَضَلُّوا فَلَا يَسْتَطِيعُونَ سَبِيلًا
“তুমি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করো—তারা তোমার আদর্শিক স্বরূপকে নস্যাৎ করতে কীরূপ অবান্তর, মনগড়া ও কদর্য উপমা বা বাস্তব সমীকরণ উপস্থাপন করছে! যার অবধারিত ফল হিসেবে তারা নিজেরা সম্পূর্ণ সরল পথ থেকে বিচ্যুত ও লক্ষ্যহীন বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত হয়েছে, ফলে তারা সত্যের কোনো সুনির্দিষ্ট আইনি পথ বা समाधान খুঁজে পাওয়ার বিন্দুমাত্র সামর্থ্য রাখে না।”
আয়াত ১০
تَبَارَكَ الَّذِي إِن شَاءَ جَعَلَ لَكَ خَيْرًا مِّن ذَٰلِكَ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ وَيَجْعَل لَّكَ قُصُورًا
“পরম মহিমান্বিত ও অফুরন্ত দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণের উৎস হলেন সেই সত্তা—যিনি যদি তাঁর প্রাকৃতিক নিয়মে ইচ্ছা করেন, তবে তোমাকে এর চেয়েও অনেক বেশি কল্যাণকর ও সুউচ্চ স্তরের বাগানসমূহ দান করতে পারেন (Jannātin), যার তলদেশ বা ভিত্তিমূল থেকে জ্ঞান ও জীবন-বিকাশের নদী বা অবিরাম কার্যপ্রবাহ জারি থাকে, এবং তিনি তোমার জন্য স্থাপন করতে পারেন সুদৃঢ় ও মজবুত সামাজিক বা সাংগঠনিক ক্ষমতার প্রাতিষ্ঠানিক অট্টালিকাসমূহ (Qusūrā)।”
Keywords:
- جَنَّاتٍ (Jannātin): এমন এক মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রাচুর্য, পরম শান্তি এবং সুরক্ষার বাগান যা আল্লাহর কিতাবের অনুশাসন প্রতিষ্ঠার ফলে সমাজ ও মানুষের অন্তরে তৈরি হয়।
- قُصُورًا (Qusūrā): আক্ষরিক সুরম্য প্রাসাদ নয়, বরং সত্যকে রক্ষা করার জন্য গঠিত সুদৃঢ় ও মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতার শক্ত কাঠামো।
আয়াত ১১
بَلْ كَذَّبُوا بِالسَّاعَةِ ۖ وَأَعْتَدْنَا لِمَن كَذَّبُ بِالسَّاعَةِ سَعِيرًا
“বরং তারা (তাদের কায়েমি স্বার্থের কারণে) সেই অবধারিত বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মুহূর্ত বা মহাসংকটকে সরাসরি অস্বীকার ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে (Kazzabū bis-Sā'ah); আর যারা সেই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মুহূর্তকে অস্বীকার করে, তাদের জন্য আমি প্রস্তুত করে রেখেছি এক তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দহন, ক্ষোভ ও অশান্তির আগুন (Sa'īrā)।”
Keywords:
- السَّاعَةِ (As-Sā’ah): একটি সুনির্দিষ্ট ও অবধারিত সময়কাল; ধারণাগতভাবে এটি কায়েমি স্বার্থবাদীদের পতন এবং সত্যপন্থীদের উত্থানের সেই চূড়ান্ত বৈপ্লবিক বা শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের মুহূর্ত।
আয়াত ১২
إِذَا رَأَتْهُم مِّن مَّكَانٍ بَعِيدٍ سَمِعُوا لَهَا تَغَيُّظًا وَزَفِيرًا
“যখন সেই দহনাবস্থা বা সামাজিক নরকের পরিস্থিতি সুদূর কোনো অবস্থান থেকেও তাদের দিকে ধেয়ে আসবে, তখন তারা সেটির ভেতরের তীব্র গর্জন, ক্রোধের হুংকার এবং বুকফাটা দীর্ঘশ্বাস চাক্ষুষভাবে শুনতে পাবে।”
আয়াত ১৩
وَإِذَا أُلْقُوا مِنْهَا مَكَانًا ضَيِّقًا مُّقَرَّنِينَ دَعَوْا هُنَالِكَ ثُبُورًا
“এবং যখন তাদের (তাদের অপকর্মের অবধারিত কুফল হিসেবে) সেই দহনাবস্থার এক অত্যন্ত সংকীর্ণ ও দমবন্ধকর স্থানে আষ্টেপৃষ্ঠে শৃঙ্খলিত অবস্থায় নিক্ষেপ করা হবে, তখন তারা সেখানে দাঁড়িয়ে নিজেদের চূড়ান্ত ধ্বংস ও মৃত্যুকে চিৎকার করে আহ্বান করবে।”
আয়াত ১৪
لَا تَدْعُوا الْيَوْمَ ثُبُورًا وَاحِدًا وَادْعُوا ثُبُورًا كَثِيرًا
“(আমার প্রাকৃতিক ও আইনি অনুশাসন চাক্ষুষ ফায়সালায় জানিয়ে দেবে:) আজ তোমরা কেবল একটিমাত্র ধ্বংস বা মৃত্যুকে আহ্বান কোরো না, বরং তোমরা অবিরত বহুবিদ ধ্বংস ও চিরতরে বিলীন হয়ে যাওয়ার বিপর্যয়কে আহ্বান করো (অর্থাৎ তোমাদের অপকর্মের জাল অত্যন্ত জটিল)।”
আয়াত ১৫
قُلْ أَذَٰلِكَ خَيْرٌ أَمْ جَنَّةُ الْخُلْدِ الَّتِي وُعِدَ الْمُتَّقُونَ ۚ كَانَتْ لَهُمْ جَزَاءً وَمَصِيرًا
“তুমি তাদের চূড়ান্ত চ্যালেঞ্জে জিজ্ঞাসা করো: এই জঘন্য দহনাবস্থা কি উত্তম, নাকি সেই চিরস্থায়ীত্বের পরম সুখ ও সুরক্ষার বাগান (Jannatul-khuld)—যার অবধারিত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে সুরক্ষামূলক সতর্ক ও দায়িত্বশীলদের (Al-Muttaqūn)? যা সবসময় তাদের জন্য এক মহান প্রতিদান এবং চূড়ান্ত গন্তব্য বা বিবর্তনের কেন্দ্র হিসেবে সাব্যস্ত রয়েছে।”
আয়াত ১৬
لَّهُمْ فِيهَا مَا يَشَاءُونَ خَالِدِينَ ۚ كَانَ عَلَىٰ رَبِّكَ وَعْدًا مَّسْئُولًا
“তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করে যা কিছু পবিত্র ও কল্যাণকর উপাদান তীব্রভাবে কামনা করবে, তার সমস্ত কিছুই লাভ করবে; এটি তোমার প্রতিপালকের ওপর এক অবধারিত শাসনতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি, যা পূর্ণ করার জন্য সেটির বাস্তবায়ন চাওয়া একটি অমোঘ আইনি অধিকার।”
আয়াত ১৭
وَيَوْمَ يَحْشُرُهُمْ وَمَا يَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ فَقُولُ أَأَنتُمْ أَضْلَلْتُمْ عِبَادِي هَٰذُلَاءِ أَمْ هُمْ ضَلُّوا السَّبِيلَ
“আর যেদিন তিনি তাদের সবাইকে এবং আল্লাহর আইন বর্জন করে তারা অন্য যার যার দাসত্ব ও অন্ধ আনুগত্য করছিল, তা সবকিছুকে একসাথে জড়ো করবেন, অতঃপর (আমার বিচারিক অনুশাসন চাক্ষুষ জিজ্ঞাসায় দাঁড় করিয়ে) বলবে: তোমরাই কি আমার এই অনুগত দাসদের বা মানবসমাজকে সরল পথ থেকে বিচ্যুত ও লক্ষ্যহীন বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেছিলে (A-antum adlaltum 'ibādī), নাকি তারা নিজেরাই সত্যের সুনির্দিষ্ট পথ হারিয়ে পথভ্রষ্ট হয়েছিল?”
আয়াত ১৮
قَالُوا سُبْحَانَكَ مَا كَانَ يَنبَغِي لَنَا أَن نَّتَّخِذَ مِن دُونِكَ مِنْ أَوْلِيَاءَ وَلَٰكِن مَّتَّعْتَهُمْ وَآبَاءَهُمْ حَتَّىٰ نَسُوا الذِّكْرَ وَكَانُوا قَوْمًا بُورًا
“তারা (সেই মনগড়া কর্তৃত্ব বা নেতৃবৃন্দ চরম সত্যের আলোয়) বলবে: তুমি সর্বপ্রকার মানবিক সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি থেকে পরম পবিত্র ও সুউচ্চ (Subhānakā)! তোমার চূড়ান্ত আইন বর্জন করে আমরা নিজেরা অন্য কাউকে অভিভাবক বা বিধানদাতা হিসেবে গ্রহণ করব—এমনটি হওয়া আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই উপযুক্ত বা আইনিভাবে সংগতিপূর্ণ ছিল না; কিন্তু তুমিই তো তাদেরকে এবং তাদের পিতৃপুরুষদের এই ক্ষণস্থায়ী জীবনে ভোগ-বিলাসের সাময়িক উপকরণ দিয়েছিলে, যার অবধারিত কুফলে তারা একসময় তোমার পরম স্মরণিকা ও ঐশী আইন ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ভুলে গিয়েছিল (Huttā nasuz-Zikra), আর তারা পরিণত হয়েছিল এক সম্পূর্ণ ধ্বংসোন্মুখ, নিষ্ফলা ও অকেজো জাতিতে।”
আয়াত ১৯
فَقَدْ كَذَّبُوكُم بِمَا تَقُولُونَ فَمَا تَسْتَطِيعُونَ صَرْفًا وَلَا نَصْرًا ۚ وَمَن يَظْلِم مِّنكُمْ نُذِقْهُ عَذَابًا كَبِيرًا
“অতঃপর (আমার শাসনতান্ত্রিক ফায়সালা অপরাধীদের জানিয়ে দেবে:) তোমরা আজ যে সমস্ত অবান্তর ও মনগড়া দাবি করছিলে, তোমাদের সেই উপাস্য বা নেতৃবৃন্দ আজ তা সবকিছু চাক্ষুষভাবে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে; সুতরাং আজ তোমরা এই অবধারিত কুফলকে বিন্দুমাত্র প্রতিহত বা ডাইভার্ট করার কোনো সামর্থ্য রাখো না এবং কোনো বাস্তব সাহায্য বা উদ্ধারকারীও পাবে না; আর তোমাদের মধ্যে যে কেউ বিন্দুমাত্র ভারসাম্য নষ্ট করে অন্যায় বা জুলুম করবে (Wa man yazlim minkum), সেটির অবধারিত ফল হিসেবে তার নিজের অস্তিত্বেই তীব্রভাবে অনুভূত ও সাব্যস্ত হবে এক অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ভয়ঙ্কর ধ্বংসাত্মক পরিণতি (Nuziqhu 'azāban kabīrā)।”
আয়াত ২০
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنَ الْمُرْسَلِينَ إِلَّا إِنَّهُمْ لَيَأْكُلُونَ الطَّعَامَ وَيَمْشِيَنَّ فِي الْأَسْوَاقِ ۗ وَجَعَلْنَا بَعْضَكُمْ لِبَعْضٍ فِتْنَةً أَتَصْبِرُونَ ۗ وَكَانَ رَبُّكَ بَصِيرًا
“আর তোমার পূর্বে আমি যত বাণীবাহক বা আদর্শিক চালিকাশক্তি প্রেরণ করেছি, তারা সবাই তো সাধারণ মানুষের মতোই পুষ্টি বা অন্ন গ্রহণ করত এবং সাধারণ নাগরিকদের মতোই বাজার-ঘাটে বা প্রকাশ্য সামাজিক ক্ষেত্রে বিচরণ করত; আর (আমার প্রাকৃতিক নিয়মে) আমি তোমাদের একদলকে অন্য দলের জন্য এক চরম সামাজিক পরীক্ষা, যাচাইকরণ ও মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি করেছি (Waja'alnā ba'dakum liba'din fitnah)—যাতে চাক্ষুষ স্পষ্ট হয় যে তোমরা সত্যের ওপর অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল থাকতে পারো কি না; আর তোমার প্রতিপালক সর্বদাই প্রতিটি স্তর নিখুঁতভাবে প্রত্যক্ষ করেন।”
আয়াত ২১
وَقَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونُ لِقَاءَنَا لَوْلَا أُنزِلَ عَلَيْنَا الْمَلَائِكَةُ أَوْ نَرَىٰ رَبَّنَا ۗ لَقَدِ اسْتَكْبَرُوا فِي أَنفُسِهِمْ وَعَتَوْ عُتُوًّا كَبِيرًا
“আর যারা আমার অমোঘ বিধিবদ্ধ নিয়মের জবাবদিহিতা বা চাক্ষুষ ফলাফলের মুখোমুখি হওয়ার বিন্দুমাত্র আশা বা আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না, তারা অহংকারে বলে: আমাদের ওপর সরাসরি অদৃশ্য মহাজাগতিক চালিকাশক্তি বা ফেরেশতা কেন অবতীর্ণ করা হলো না, অথবা আমরা কেন আমাদের প্রতিপালককে সরাসরি চাক্ষুষ দেখতে পাই না? নিশ্চয়ই তারা নিজেদের অন্তরের গভীরে চরম দাম্ভিকতা ও অহংকার লুকিয়ে রেখেছে এবং তারা নির্ধারিত আইনি সীমারেখা ভেঙে এক সুদূরপ্রসারী চরম অবাধ্যতা ও উগ্রতায় মেত্ত রয়েছে (Wa 'ataw 'utuwwan kabīrā)।”
আয়াত ২২
يَوْمَ يَرَوْنَ الْمَلَائِكَةُ لَا بُشْرَىٰ يَوْمَئِذٍ لِّلْمُجْرِمِينَ وَيَقُولُونَ حِجْرًا مَّحْجُورًا
“যেদিন তারা মহাবিশ্বের সেই অদৃশ্য প্রাকৃতিক নিয়মতান্ত্রিক চালিকাশক্তি বা ধ্বংসাত্মক শক্তিসমূহকে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করবে, সেই সুনির্দিষ্ট সন্ধিক্ষণে অপরাধী ও সমাজ-বিধ্বংসী চক্রের জন্য বিন্দুমাত্র কোনো সুসংবাদ বা স্বস্তি থাকবে না; এবং তারা (চরম আতঙ্কে) চিৎকার করে বলবে: আমাদের ও এই ধ্বংসের মাঝখানে এক দুর্ভেদ্য সুরক্ষাপ্রাচীর বা অন্তরাল টেনে দেওয়া হোক!”
আয়াত ২৩
وَقَدِمْنَا إِلَىٰ مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَّنثُورًا
“এবং তারা (নিজেদের মনগড়া প্রথায়) যে সমস্ত অপকর্ম বা কৃত্রিম এজেন্ডা সম্পাদন করেছিল, আমি সেগুলোর মুখোমুখি হব, অতঃপর সেগুলোকে বাতাসে উড়ে যাওয়া সম্পূর্ণ নিস্প্রাণ ও বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে ধূলিসাৎ করে দেব (Faja'alnāhu habā'am mansūrā)।”
Keywords:
- هَبَاءً مَّنثُورًا (Habā’am mansūrā): কোনো যৌক্তিক বা কিতাবের আইনি ভিত্তি না থাকার কারণে কোনো কর্ম বা দর্শনের চূড়ান্তভাবে মূল্যহীন, অকেজো ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া।
আয়াত ২৪
أَصْحَابُ الْجَنَّةِ يَوْمَئِذٍ خَيْرٌ مُّسْتَقَرًّا وَأَحْسَنُ مَقِيلًا
“সেই সুনির্দিষ্ট ফলাফল প্রকাশের দিনে পরম সুখ ও সুরক্ষার বাগানের অধিকারীরাই হবে সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে সর্বোত্তম ও সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত (Khairum mustaqarrā), এবং বিশ্রামের মনস্তাত্ত্বিক স্বস্তির ক্ষেত্রেও হবে সবচেয়ে বেশি চমৎকার ও শান্তিময়।”
আয়াত ২৫
وَيَوْمَ تَشَقَّقُ السَّمَاءُ بِالْغَمَامِ وَنُزِّلَ الْمَلَائِكَةُ تَنزِيلًا
“আর সেই দিন, যখন উচ্চ সুরক্ষামূলক বা আদর্শিক স্তরের মেঘাচ্ছন্নতা বা পুরোনো ভ্রান্ত ধারণার দেয়াল ফেটে সম্পূর্ণরূপে বিদীর্ণ হতে শুরু করবে এবং মহাবিশ্বের সমস্ত অদৃশ্য ঐশী চালিকাশক্তি ও প্রাকৃতিক শক্তিসমূহকে এক সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিকতায় অবতীর্ণ বা কার্যকর করা হবে (Wa nuzzilal-malā'ikatu tanzīlā)।”
আয়াত ২৬
الْمُلْكُ يَوْمَئِذٍ الْحَقُّ لِلرَّحْمَٰنِ ۚ وَكَانَ يَوْمًا عَلَى الْكَافِرِينَ عَسِيرًا
“সেই সুনির্দিষ্ট বৈপ্লবিক রূপান্তরের দিনে সমস্ত প্রকৃত সার্বভৌম ক্ষমতা ও চূড়ান্ত রাজত্ব থাকবে কেবল পরম দয়াময় আল্লাহরই একক নিয়ন্ত্রণে (Al-Mulku yawma'izinil-haqqu lir-Rahmāni); আর সেই সুদীর্ঘ দিনটি সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের জন্য হবে এক অত্যন্ত কঠিন, দুরূহ ও ভয়ঙ্কর পর্যায়কাল।”
আয়াত ২৭
وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَىٰ يَدَيْهِ يَقُولُ يَا لَيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلًا
“আর সেই দিন, যখন প্রতিটি ভারসাম্যহীন অন্যায়কারী বা জালিম চরম অনুশোচনা ও হতাশায় নিজের দুই হাত কামড়াতে কামড়াতে বলবে: হায়! এর চেয়ে যদি আমি সেই সুনির্দিষ্ট বাণীবাহক বা পরম আদর্শের সাথে এক সুনির্দিষ্ট আইনি পথ বা সমাধান গ্রহণ করতাম (Yā laytanit-takhaztu ma'ar-Rasūli sabīlā)!”
আয়াত ২৮
يَا وَيْلَتَىٰ لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا
“হায় আমার চরম ধ্বংস ও দুর্ভাগ্য! এর চেয়ে যদি আমি সমাজে অমুক বা তমুক মনগড়া ব্যক্তিত্বকে আমার নিভৃত আন্তরিক বন্ধু বা অন্ধ অনুকরণের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ না করতাম!”
আয়াত ২৯
لَّقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي ۗ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِلْإِنسَانِ خَذُولًا
“নিশ্চয়ই সে আমাকে আমার কাছে পরম স্মরণিকা ও ঐশী আইন ব্যবস্থা আসার পরেও তা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত ও লক্ষ্যহীন বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল; আর শয়তানি শক্তি বা উগ্র কুপ্রবৃত্তি সর্বদাই মানবজাতির জন্য এক চরম বিশ্বাসঘাতক ও চরম বিপদে বর্জনকারী (Khazūlā)।”
আয়াত ৩০
وَقَالَ الرَّسُولُ يَا رَبِّ إِنَّ قَوْمِي اتَّخَذُوا هَٰذَا الْقُرْآنَ مَهْجُورًا
“আর বাণীবাহক বা আদর্শ (নিজের চূড়ান্ত লড়াইয়ের ময়দানে আরজ করবে:) হে আমার প্রতিপালক! নিশ্চয়ই আমার এই সমাজ বা জাতি এই সুবিন্যস্ত পরম সত্যের রূপরেখা ও কিতাবকে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত, অবদমিত ও বর্জনীয় হিসেবে গ্রহণ করেছিল (Inna qawmit-takhazū hāzal-Qur'āna mahjūrā)!”
Keywords:
- مَهْجُورًا (Mahjūrā): কিতাবের আইনকে নিজেদের জীবন ও সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্র থেকে দূরে সরিয়ে রাখা, অগ্রাহ্য করা বা অকেজো করে রাখা (WQT কাঠামোর অন্যতম মূল মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জ)।
আয়াত ৩১
وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَا لِكُلِّ نَبِيٍّ عَدُوًّا مِّنَ الْمُجْرِمِينَ ۗ وَكَفَىٰ بِرَبِّكَ هَادِيًا وَنَصِيرًا
“আর এভাবেই আমি (আমার প্রাকৃতিক ও সামাজিক দ্বন্দের নিয়মে) প্রতিটি সত্যের সংবাদদাতা বা নবীর জন্য অপরাধী ও সমাজ-বিধ্বংসী চক্রের মধ্য থেকে এক চরম শত্রু বা আইনি প্রতিদ্বন্দ্বী খাড়া করেছি ('Aaduwwam minal-mujrimīn); আর পথপ্রদর্শক হিসেবে এবং অমোঘ সাহায্যকারী ও সুরক্ষাদাতা হিসেবে তোমার প্রতিপালকের বিধিবদ্ধ নীতিই সম্পূর্ণ পর্যাপ্ত।”
আয়াত ৩২
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلَا نُزِّلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً ۚ كَذَٰلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ ۖ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلًا
“আর যারা সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরেও তা আড়াল বা অস্বীকার করেছে, তারা (অজুহাত দিয়ে) বলে: এই সুবিন্যস্ত রূপরেখা বা কিতাব কেন তার ওপর একযোগে বা এক স্তরে সম্পূর্ণ অবতীর্ণ করা হলো না? (উত্তর হলো:) আমি এভাবেই এটি ধাপে ধাপে অবতীর্ণ করেছি—যাতে সেটির দ্বারা তোমার ভেতরের বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাকেন্দ্র ও মননকে সুদৃঢ় ও অটল রাখতে পারি (Linusabbita bihī fu'ādaka), এবং আমি এটিকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, বিন্যস্ত ও নিখুঁত ধারাবাহিকতায় খণ্ড খণ্ড করে সাজিয়ে উপস্থাপন করেছি (Warattalnāhu tartīlā)।”
Keywords:
- تَرْتِيلًا (Tartīlā): কোনো বিষয়ের উপাদানসমূহকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, সামঞ্জস্যপূর্ণ, বৈজ্ঞানিক ও নিখুঁত ধারাবাহিকতায় সাজানো যাতে সেটির প্রতিটি সংযোগ একদম স্পষ্ট হয়।
আয়াত ৩৩
وَلَا يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلَّا جِئْنَاكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسِيرًا
“এবং তারা তোমার আদর্শিক রূপরেখাকে নস্যাৎ করতে তোমার সামনে যখনই কোনো মনগড়া উপমা, সমীকরণ বা অবান্তর প্রশ্ন নিয়ে আসবে, তখনই আমি তোমার নিকট নিয়ে আসব পরম ও অকাট্য বাস্তব সত্য এবং অত্যন্ত সুষম ও সর্বোত্তম বিশ্লেষণ বা সমাধান (Wa ahsana tafsīrā)।”
Keywords:
- تَفْسِيرًا (Tafsīrā): কোনো জটিল বিষয়ের অন্তরালে থাকা সুক্ষ্ম জট খুলে সেটিকে একদম প্রকাশ্য, প্রাঞ্জল ও যুক্তিসঙ্গতভাবে ব্যাখ্যা বা স্পষ্ট করা (ধাতুমূল: ফ-স-র = আবরণ উন্মোচন করা)।
আয়াত ৩৪
الَّذِينَ يُحْشَرُونَ عَلَىٰ وُجُوهِهِمْ إِلَىٰ جَهَنَّمَ أُولَٰئِكَ شَرٌّ مَّكَانًا وَأَضْعَفُ سَبِيلًا
“যাদেরকে তাদের নিজেদের বাহ্যিক দাপট, নেতৃত্ব বা দম্ভের ওপর উপুড় করে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক দহন ও সামাজিক নরকের দিকে জড়ো করা হবে ('Alā wujūhihim ilā Jahannam), তারাই হবে সামাজিক অবস্থানের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি নিকৃষ্ট এবং জীবন-পথ বা সমাধানের দিক থেকেও সবচেয়ে বেশি অসাড় ও দুর্বল।”
আয়াত ৩৫
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَى الْكِتَابَ وَجَعَلْنَا مَعَهُ أَخَاهُ هَارُونَ وَزِيرًا
“আর নিশ্চয়ই আমি মূসাকে এই বিধিবদ্ধ কিতাব ও শাসনতান্ত্রিক সংবিধান দান করেছিলাম এবং তার সাংগঠনিক ভার বহন করার জন্য তার সহযোগী ভাই হারূনকে এক যোগ্য সাহায্যকারী বা মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেছিলাম (Wajā'alnā ma'ahū akhāhu Hārūna wāzīrā)।”
Keywords:
- وَزِيرًا (Wazīrā): আক্ষরিক মন্ত্রী নয়, বরং এমন এক যোগ্যতম সাংগঠনিক সহযোগী যিনি মূল নেতার কাজের ভারী বোঝা বা প্রশাসনিক দায়িত্ব নিজের কাঁধে শেয়ার করে নেন (ধাতুমূল: ও-জ-র = ভারী বোঝা বহন করা)।
আয়াত ৩৬
فَقُلْنَا اذْهَبَا إِلَى الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنا فَدَمَّرْنَاهُمْ تَدْمِيرًا
“অতঃपर আমি নির্দেশ দিলাম: তোমরা উভয়ে সেই জাতির বা কায়েমি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হও যারা আমার অকাট্য বিধি-বিধান ও নিদর্শনসমূহকে সরাসরি অস্বীকার করেছে; অতঃপর (তাদের অবাধ্যতার অবধারিত ফল হিসেবে) আমি সেগুলোকে সম্পূর্ণরূপে উলটে দিয়ে নিশ্চিহ্ন ও ধ্বংস করে দিলাম (Fadammarnāhum tadmīrā)।”
আয়াত ৩৭
وَقَوْمَ نُوحٍ لَّمَّا كَذَّبُوا الرُّسُلَ أَغْرَقْنَاهُمْ وَجَعَلْنَاهُمْ لِلنَّاسِ آيَةً ۖ وَأَعْتَدْنَا لِلظَّالِمِينَ عَذَابًا أَلِيمًا
“এবং নূহের জাতিকে—যখন তারা বাণীবাহক বা পরম আদর্শকে সরাসরি অস্বীকার ও প্রত্যাখ্যান করেছিল, তখন আমি (আমার প্রাকৃতিক নিয়মে) তাদের লক্ষ্যহীন বিভ্রান্তির প্লাবনে সম্পূর্ণরূপে ডুবিয়ে মারলাম এবং তাদের সমগ্র মানবজাতির জন্য এক অমোঘ চাক্ষুষ নিদর্শন বা শিক্ষা হিসেবে স্থাপন করলাম; আর এই ভারসাম্যহীন অন্যায়কারীদের জন্য আমি প্রস্তুত করে রেখেছি এক অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ও তীব্র ধ্বংসাত্মক পরিণতি।”
আয়াত ৩৮
وَعَادًا وَثَمُودَ وَأَصْحَابَ الرَّسِّ وَقُرُونًا بَيْنَ ذَٰلِكَ كَثِيرًا
“এবং আদ সম্প্রদায়, সামূদ সম্প্রদায়, আর্-রাস-এর (অন্ধকূপে বা কূপের পাড়ে থাকা গোঁড়া) অধিবাসীসমূহ এবং এই সমস্ত সুদীর্ঘ সময়কালের অন্তর্বর্তী বহুবিদ দাম্ভিক প্রজন্মকেও (আমি নিশ্চিহ্ন করেছি)।”
আয়াত ৩৯
وَكُلًّا ضَرَبْنَا لَهُ الْأَمْثَالَ ۖ وَكُلًّا تَبَّرْنَا تَتْبِيرًا
“আর তাদের প্রতিটি উপদল বা জাতির সামনেই আমি পরম সত্যের অত্যন্ত সুস্পষ্ঠ উপমা বা বাস্তব সমীকরণসমূহ বারবার উপস্থাপন করেছিলাম, তবুও তারা না মানায় আমি তাদের প্রতিটি ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে চূর্ণ-বিচূর্ণ ও ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে নিশ্চিহ্ন করলাম (Wa kullan tabbarnā tatbīrā)।”
আয়াত ৪০
وَلَقَدْ أَتَوْا عَلَى الْقَرْيَةِ الَّتِي أُمْطِرَتْ مَطَرَ السَّوْءِ ۚ أَفَلَمْ يَكُونُوا يَرَوْنَهَا ۚ بَلْ كَانُوا لَا يَرْجُونَ نُشُورًا
“আর নিশ্চয়ই এরা অবলীলায় বিচরণ করে সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদ বা সামাজিক জনসমষ্টির ওপর—যার ওপর বর্ষিত হয়েছিল এক অত্যন্ত কদর্য, জঘন্য ও নেতিবাচক ধ্বংসাত্মক প্লাবন বা বৃষ্টি; তবে কি তারা বিন্দুমাত্র চাক্ষুষ জ্ঞান দিয়ে সেটিকে প্রত্যক্ষ করে না? বরং আসল সত্য হলো—তারা নিজেরা কোনো এক নতুন বৈপ্লবিক উত্থান বা জীবন-ফলাফলের মুখোমুখি হওয়ার বিন্দুমাত্র আশা বা আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না।”
আয়াত ৪১
وَإِذَا رَأَوْكَ إِن يَتَّخِذُونَكَ إِلَّا هُزُوًا أَهَٰذَا الَّذِي بَعَثَ اللَّهُ رَسُولًا
“আর তারা যখনই তোমাকে বা তোমার উপস্থাপিত আদর্শকে প্রত্যক্ষ করে, তখন তারা তোমাকে কেবল উপহাস ও ঠাট্টার পাত্র হিসেবে গ্রহণ করে এবং (দাম্ভিকতায়) বলে: এই ব্যক্তিটিকেই কি আল্লাহ এক সুনির্দিষ্ট বাণীবাহক বা আদর্শিক নেতা হিসেবে সমাজে উত্থাপন করেছেন?”
আয়াত ৪২
إِن كَادَ لَيُضِلُّنَا عَنْ آلِهَتِنَا لَوْلَا أَن صَبَرْنَا عَلَيْهَا ۚ وَسَوْفَ يَعْلَمُونَ حِينَ يَرَوْنَ الْعَذَابَ مَنْ أَضَلُّ سَبِيلًا
“সে তো আমাদের নিজেদের প্রতিষ্ঠিত উপাস্য বা অন্ধ আদর্শসমূহ থেকে আমাদের সম্পূর্ণ বিচ্যুত ও লক্ষ্যহীন বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলেই দিয়েছিল, যদি না আমরা নিজেরা অত্যন্ত শক্তভাবে ও অবিচলতার সাথে সেগুলোর ওপর কামড়ে ধরে টিকে থাকতাম! (আমার প্রাকৃতিক ফায়সালা জানিয়ে দেয়:) যখন তারা সেই অবধারিত ধ্বংসাত্মক পরিণতির মুখোমুখি হবে, তখন তারা খুব শীঘ্রই চাক্ষুষভাবে জানতে পারবে—কে প্রকৃতপক্ষে জীবন-পথ বা সমাধানের দিক থেকে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট ছিল!”
আয়াত ৪৩
أَرَأَيْتَ مَنِ اتَّخَذَ إِلَٰهَهُ هَوَاهُ أَفَأَنتَ تَكُونُ عَلَيْهِ وَكِيلًا
“তুমি কি গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেছ সেই ব্যক্তিকে—যে নিজের উগ্র কুপ্রবৃত্তি, অন্ধ কামনা ও ব্যক্তিগত অহংকারকেই নিজের একমাত্র চূড়ান্ত ইলাহ বা আইনদাতা হিসেবে গ্রহণ করেছে (Manittakhaza ilāhahū hawāhu)? তবে কি তুমি নিজে এমন এক বক্র মানসিকতার ব্যক্তির ওপর কোনো যোগ্য অভিভাবক, কর্মবিধায়ক বা সুরক্ষাদাতা হতে পারো?”
Keywords:
- إِلَٰهَهُ هَوَاهُ (Ilāhahū hawāhu): আল্লাহর কিতাবের চিরন্তন আইন বর্জন করে নিজের ভেতরের জৈবিক চাহিদা, সাময়িক স্বার্থ ও অহংকারের নিঃশর্ত দাসত্ব করা (WQT দর্শনের অন্যতম মূল মনস্তাত্ত্বিক রূপক)।
আয়াত ৪৪
أَمْ تَحْسَبُ أَنَّ أَكْثَرَهُمْ يَسْمَعُونَ أَوْ يَعْقِلُونَ ۚ إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ ۖ بَلْ هُمْ أَضَلُّ سَبِيلًا
“নাকি তুমি এরূপ অবান্তর ধারণা পোষণ করছ যে, তাদের অধিকাংশ মানুষই পরম সত্যের বাণী নিবিড়ভাবে শোনে কিংবা বিন্দুমাত্র নিজের বুদ্ধিবৃত্তি ও যৌক্তিক কার্যकारण বিশ্লেষণকে কাজে লাগায়? তারা তো কেবল সহজলভ্য বস্তুগত উপকরণ বা পশুর মতো জীবন যাপন করে (In hum illā kal-an'āmi), বরং তারা জীবন-পথ বা সমাধানের দিক থেকে পশুর চেয়েও অনেক বেশি পথভ্রষ্ট ও সুদূর বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত।”
আয়াত ৪৫
أَلَمْ تَرَ إِلَىٰ رَبِّكَ كَيْفَ مَدَّ الظِّلَّ وَلَوْ شَاءَ لَجَعَلَهُ سَاكِنًا ثُمَّ جَعَلْنَا الشَّمسَ عَلَيْهِ دَلِيلًا
“তুমি কি তোমার প্রতিপালকের অমোঘ প্রাকৃতিক নিয়মের দিকে গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করোনি—কীভাবে তিনি (মহাজাগতিক বিবর্তনে) ছায়াকে সুদীর্ঘ ও প্রসারিত করেন (Kayfa maddaz-zilla)? আর তিনি যদি তাঁর প্রাকৃতিক অমোঘ নিয়মে ইচ্ছা করতেন, তবে সেটিকে সম্পূর্ণরূপে গতিহীন ও স্থির করে দিতে পারতেন; অতঃপর আমি সূর্যকে বা আলোর উৎসকে সেটির ওপর এক সুনির্দিষ্ট নির্দেশক বা গাইড হিসেবে স্থাপন করেছি;”
Keywords:
- الظِّلَّ (Az-Zill): আক্ষরিক ছায়া হলেও ধারণাগতভাবে এটি প্রকৃতির ও সমাজের এমন এক সাময়িক আশ্রয়, সুরক্ষামূলক ঢাকনা বা ক্রান্তিকালীন পর্যায় যা আলোর অনুপস্থিতিতে বা বিবর্তনের সুনির্দিষ্ট নিয়মে ধাপে ধাপে পরিবর্তিত হয়।
আয়াত ৪৬
ثُمَّ قَبَضْنَاهُ إِلَيْنَا قَبْضًا يَسِيرًا
“অতঃপর (আলোর তীব্রতা বৃদ্ধির সাথে সাথে) আমি সেই ছায়াকে অত্যন্ত সহজ ও সুক্ষ্ম নিয়মে ধাপে ধাপে নিজের দিকে গুটিয়ে বা সংকুচিত করে নিই (অর্থাৎ অজ্ঞানতার অন্ধকার এভাবেই জ্ঞানের আলো দ্বারা অপসারিত হয়)।”
আয়াত ৪৭
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ اللَّيْلَ لِبَاسًا وَالنَّوْمَ سُبَاتًا وَجَعَلَ النَّهارَ نُشُورًا
“আর তিনিই সেই পরম সত্তা, যিনি তোমাদের জন্য অন্ধকার পর্যায় বা রাতকে করেছেন এক সুরক্ষামূলক আবরণস্বরূপ (Al-Layla libāsā), এবং তোমাদের সাময়িক নিষ্ক্রিয়তা বা ঘুমকে করেছেন এক ক্লান্তি দূরকারী স্থিতিশীলতা (Wan-Nawma subātā), এবং কর্মব্যস্ত দিনকে করেছেন এক নতুন বৈপ্লবিক উত্থান, সজীবতা ও কর্মতৎপরতার ক্ষেত্র।”
Keywords:
- سُبَاتًا (Subātā): কোনো কর্ম বা গতির সাময়িক বিরতি, নিশ্চলতা, অথবা এমন এক সুস্থিত অবস্থা যা পুনরায় শক্তি সঞ্চয়ে সাহায্য করে।
- نُشُورًا (Nushūrā): মেধা, শ্রম বা কোনো আদর্শের সুপ্ত সম্ভাবনাকে চারদিকে ছড়িয়ে দেওয়া এবং এক নতুন উদ্দীপনায় সজীব হয়ে ওঠা।
আয়াত ৪৮
وَهُوَ الَّذِي أَرْسَلَ الرِّيَاحَ بُشْرًا بَيْنَ يَدَيْ رَحْمَتِهِ ۚ وَأَنزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً طَهُورًا
“আর তিনিই সেই সত্তা, যিনি তাঁর বিশেষ ঐশী লালন ও রহমতের আগাম বার্তা হিসেবে এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও গতিশীল চালিকাশক্তি বা বায়ু প্রেরণ করেন (Arsala-Rīyāha bushrā); এবং আমি উচ্চ সুরক্ষার স্তর থেকে অবতীর্ণ করি সর্বপ্রকার পঙ্কিলতা ও বিকৃতিমুক্ত অত্যন্ত বিশুদ্ধ, জীবনদায়ী পুষ্টি উপাদান বা কিতাবের বাণী (Mā'an tahūrā)।”
Keywords:
- مَاءً طَهُورًا (Mā’an tahūrā): আক্ষরিক বিশুদ্ধ পানি; ধারণাগতভাবে আল্লাহর কিতাবের এমন এক নিষ্কলুষ জ্ঞান যা মানুষের চিন্তাজগতের সমস্ত মনগড়া ময়লা, কুসংস্কার ও বিকৃতি ধুয়ে সাফ করে দেয়।
আয়াত ৪৯
لِّنُحْيِيَ بِهِ بَلْدَةً مَّيْتًا وَنُسْقِيَهُ مِمَّا خَلَقْنَا أَنْعَامًا وَأَنَاسِيَّ كَثِيرًا
“যাতে আমি সেটির দ্বারা (সেই ঐশী বাণী দ্বারা) পশুবৃত্তি ও অজ্ঞতায় লিপ্ত এক মৃত সমাজ-ক্ষেত্রকে পুনরুজ্জীবিত ও সজীব করতে পারি (LInuhyiya bihī baldatam maytā), এবং আমি তা শোষণ বা পান করাতে পারি—আমারই সৃষ্ট বহুবিদ জীবন ধারণের সহজলভ্য উপকরণসমূহকে এবং এক বিশাল মানব গোষ্ঠীকে।”
আয়াত ৫০
وَلَقَدْ صَرَّفْنَاهُ بَيْنَهُمْ لِيَذَّكَّرُوا فَأَبَىٰ أَكْثَرُ النَّاسِ إِلَّا كُفُورًا
“আর নিশ্চয়ই আমি এই পরম সত্যের বাণীকে বিভিন্ন কোণ থেকে তাদের মাঝে বারবার বিশ্লেষণ করেছি যাতে তারা নিজেদের চিন্তাকে জাগ্রত করে ও শিক্ষা গ্রহণ করে (Liyazzakkarū); কিন্তু অধিকাংশ মানুষই নিজেদের অহংকার ও কায়েমি স্বার্থের কারণে সত্যকে আড়াল, অস্বীকার ও অকৃতজ্ঞতা করা ব্যতিরেকে অন্য সবকিছু প্রত্যাখ্যান করেছে।”
আয়াত ৫১
وَلَوْ شِئْنَا لَبَعَثْنَا فِي كُلِّ قَرْيَةٍ نَّذِيرًا
“আর আমি যদি (আমার সুনির্দিষ্ট নিয়মে) ইচ্ছা করতাম, তবে প্রতিটি পৃথক পৃথক জনপদ বা সামাজিক জনসমষ্টির ভেতরেই এক একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী বা গাইড নিযুক্ত করতে পারতাম (কিন্তু আমি তা না করে এই একক বিশ্বজনীন কিতাব অবতীর্ণ করেছি)।”
আয়াত ৫২
فَلَا تُطِيعِ الْكَافِرِينَ وَجَاهِدْهُم بِهِ جِهَادًا كَبِيرًا
“সুতরাং তুমি কোনো অবস্থাতেই এই সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের মনগড়া দর্শনের বিন্দুমাত্র অন্ধ আনুগত্য বা তোষামোদ কোরো না (Falā tutī'il-Kāfirīn), এবং তুমি এই কিতাবের অকাট্য প্রমাণের শক্তিতে তাদের বিরুদ্ধে এক অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী, সুসংগত ও মহাবৈপ্লবিক বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম চালিয়ে যাও (Wa jāhidhum bihī jihādan kabīrā)।”
Keywords:
- جِهَادًا كَبِيرًا (Jihādan kabīrā): তলোয়ারের যুদ্ধ নয়, বরং আল্লাহর কিতাবের অকাট্য যুক্তি, বৈজ্ঞানিক তথ্য ও পরম সত্যের বিধান দিয়ে সমাজের কায়েমি কুসংস্কার ও মিথ্যার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে অবিরাম মেধা ও মননশীল সংগ্রাম চালানো।
আয়াত ৫৩
وَهُوَ الَّذِي مَرَجَ الْبَحْرَيْنِ هَٰذَا عَذَبٌ فُرَاتٌ وَهَٰذَا مِلْحٌ أُجَاجٌ وَجَعَلَ بَيْنَهُمَا بَرْزَخًا وَحِجْرًا مَّحْجُورًا
“আর তিনিই সেই পরম সত্তা, যিনি সমাজ-বাস্তবতার দুটি ভিন্ন স্রোত বা মতাদর্শের সমুদ্রকে পাশাপাশি সচল রেখেছেন (Marajal-bahrayni)—যার একটি হলো অত্যন্ত সুমিষ্ট, তৃষ্ণা দূরকারী ও স্বস্তিদায়ক (অর্থাৎ মুমিনদের আদর্শ), এবং অন্যটি হলো অত্যন্ত লোনা, তিক্ত ও দাহনকারী (অর্থাৎ কাফিরদের দর্শন); অথচ তিনি এই দুইয়ের মাঝখানে স্থাপন করেছেন এক প্রাকৃতিক অলঙ্ঘনীয় অন্তরাল এবং এক দুর্ভেদ্য সুরক্ষাপ্রাচীর যা একে অপরের সাথে মিশে যেতে বাধা দেয় (Barzakhaw wa hijram mahjūrā)।”
Keywords:
- بَرْزَخًا وَحِجْرًا (Barzakhaw wa hijrā): সত্য এবং মিথ্যার মধ্যকার এমন এক প্রাকৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক অলঙ্ঘনীয় দেয়াল বা আইনি সীমারেখা যা কিতাবের অনুসারীদের কাফিরদের পঙ্কিল দর্শনে বিলীন হতে দেয় না।
আয়াত ৫৪
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا فَجَعَلَهُ نَسَبًا وَصِهْرًا ۗ وَكَانَ رَبُّكَ قَدِيرًا
“আর তিনিই সেই সত্তা, যিনি পুষ্টিকর জীবনদায়ী তরল উপাদান বা জ্ঞান-উৎস থেকে এক সচেতন মানবীয় চেতনার উন্মেষ ঘটিয়েছেন (Khalaqa minal-mā'i basharā), অতঃপর তিনি তাকে (সামাজিক বিন্যাসের প্রয়োজনে) রক্তসম্পর্কিত বংশধারা এবং বৈবাহিক আত্মীয়তার বন্ধনে সুশৃঙ্খল করেছেন; আর তোমার প্রতিপালক চিরকাল পূর্ণ পরিমাপ, সামর্থ্য ও ক্ষমতার অধিকারী।”
আয়াত ৫৫
وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُهُمْ وَلَا يَضُرُّهُمْ ۗ وَكَانَ الْكَافِرُ عَلَىٰ رَبِّهِ ظَهِيرًا
“অথচ তারা আল্লাহর সেই চূড়ান্ত আইনকে বর্জন করে অন্য এমন কিছুর দাসত্ব ও অন্ধ আনুগত্য করে (Wa ya'budūna min dūnillāhi), যা তাদের বিন্দুমাত্র কোনো বাস্তব উপকার করার সামর্থ্য রাখে না এবং কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতাও রাখে না; আর এই সত্য প্রত্যাখ্যানকারী অপশক্তিগুলো সর্বদা তাদের প্রতিপালকের বিধিবদ্ধ নিয়মের বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য বিদ্রোহী ও কায়েমি স্বার্থের পৃষ্ঠপোষক (Kāna-Kāfiru 'alā Rabbihī zahīrā)।”
আয়াত ৫৬
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا مُبَشِّرًا وَنَذِيرًا
“আর আমি তোমাকে কেবল এক সুসংবাদদাতা এবং আসন্ন ধ্বংসাত্মক পরিণতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও অকাট্য প্রমাণাদিসহ সতর্ককারী হিসেবেই প্রেরণ করেছি।”
আয়াত ৫৭
قُلْ مَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِلَّا مَن شَاءَ أَن يَتَّخِذَ إِلَىٰ رَبِّهِ سَبِيلًا
“তুমি ঘোষণা করে দাও: আমি এই সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তোমাদের নিকট বিন্দুমাত্র কোনো বৈষয়িক প্রতিদান বা স্বার্থ দাবি করছি না; তবে আমার একমাত্র চাওয়া হলো—যে কেউ আন্তরিক ইচ্ছা পোষণ করে, সে যেন তার প্রতিপালকের দিকে যাওয়ার এক সুনির্দিষ্ট আইনি পথ অবলম্বন করে (An yattakhiza ilā Rabbihī sabīlā)।”
আয়াত ৫৮
وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ وَسَبِّحْ بِحَمْدِهِ ۚ وَكَفَىٰ بِهِ بِذُنُوبِ عِبَادِهِ خَبِيرًا
“সুতরাং তুমি পূর্ণ সাংগঠনিক ভরসা ও আস্থার সমর্পণ করো সেই চিরঞ্জীব সত্তার ওপর যাঁর বিধিবদ্ধ নিয়মের কখনো কোনো অবক্ষয় বা মৃত্যু ঘটে না (Watawakkal 'alal-Hayyi), এবং তাঁর সমস্ত প্রশংসিত নিয়মের পরম শ্রেষ্ঠত্ব সমাজে কার্যকর ও ফুটিয়ে তোলো; আর তাঁর দাসদের সমস্ত গোপন সাংগঠনিক বিচ্যুতি বা অপরাধের সম্যক খবরাখবর রাখার জন্য তিনিই একাই সম্পূর্ণ যথেষ্ট।”
Keywords:
- تَوَكَّلْ (Tawakkal): কোনো অন্ধ ভাগ্যবাদের ওপর হাত গুটিয়ে বসে থাকা নয়, বরং নিজের সর্বোচ্চ মেধা ও শ্রম দিয়ে কাজ করার পর ফলাফলের জন্য আল্লাহর অমোঘ প্রাকৃতিক নিয়মের ওপর পূর্ণ মানসিক আস্থা ও ভরসা রাখা।
আয়াত ৫৯
الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ ۚ الرَّحْمَٰنُ فَاسْأَلْ بِهِ خَبِيرًا
“তিনিই সেই সত্তা, যিনি উচ্চ সুরক্ষামূলক স্তরসমূহ, এই বাস্তব পৃথিবী এবং এই দুইয়ের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু ছয়টি সুনির্দিষ্ট বিবর্তনমূলক পর্যায়কাল বা ঐতিহাসিক ধাপে সৃষ্টি করেছেন (Fī sittati ayyāmin), অতঃপর তিনি তাঁর সেই মহিমান্বিত শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতার কেন্দ্রে সমাসীন বা নিয়ন্ত্রণ সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন; তিনিই পরম দয়াময় আল্লাহ, সুতরাং তুমি তাঁর বিধান সম্পর্কে যেকোনো জিজ্ঞাসায় এক সম্যক পরিজ্ঞাত বা জ্ঞানতাত্ত্বিক বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হও।”
Keywords:
- سِتَّةِ أَيَّامٍ (Sittati ayyām): আক্ষরিক ২৪ ঘণ্টার ছয়টি দিন নয়, বরং সৃষ্টিজগৎ বা কোনো মহৎ সামাজিক আন্দোলন পূর্ণতা পাওয়ার সুনির্দিষ্ট ছয়টি বড় ঐতিহাসিক বিবর্তনমূলক পর্যায় বা পর্যায়ক্রমিক স্তর।
আয়াত ৬০
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اسْجُدُوا لِلرَّحْمَٰنِ قَالُوا وَمَا الرَّحْمَٰنُ أَنَسْجُدُ لِمَا تَأْمُرُنَا وَزَادَهُمْ نُفُورًا
“আর যখনই তাদের সুস্পষ্ঠভাবে বলা হয়—তোমরা পরম দয়াময় আল্লাহর বিধিবদ্ধ নিয়মের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও নিঃশর্ত সমর্পণ প্রদর্শন করো (Usjudū lir-Rahmāni), তখন তারা (দাম্ভিক অহংকারে) বলে ওঠে: পরম দয়াময় আবার কে বা কী? তুমি আমাদের নির্দেশ দিলেই কি আমরা তোমার সেই মনগড়া নিয়মের সামনে মাথা নত করব? আর এই পরম সত্যের আহ্বান তাদের ভেতরের সত্য-বিমুখতা ও হিংস্র অবাধ্যতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।”
আয়াত ৬১
تَبَارَكَ الَّذِي جَعَلَ فِي السَّمَاءِ بُرُوجًا وَجَعَلَ فِيهَا سِرَاجًا وَقَمَرًا مُّنِيرًا
“পরম মহিমান্বিত ও অফুরন্ত কল্যাণের আধার হলেন সেই সত্তা—যিনি উচ্চ সুরক্ষামূলক স্তরে বা আকাশে স্থাপন করেছেন অত্যন্ত সুদৃঢ় ও শক্তিশালী দুর্গসদৃশ নক্ষত্রমণ্ডলী বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরসমূহ (Burūjā), এবং তার মধ্যে প্রজ্জ্বলিত করেছেন এক প্রদীপসদৃশ প্রখর আলোর উৎস (সূর্য) এবং এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক (চাঁদ);”
Keywords:
- بُرُوجًا (Burūjā): আক্ষরিক রাশিচক্রের দুর্গ বা নক্ষত্রমণ্ডলী; শাসনতান্ত্রিক পরিভাষায় এটি আল্লাহর আইনের দ্বারা সুরক্ষিত সুউচ্চ ক্ষমতার স্তর বা নিখুঁত সাংগঠনিক কাঠামোসমূহ।
আয়াত ৬২
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِّمَنْ أَرَادَ أَن يَذَّكَّرُ أَوْ أَرَادَ شُكُورًا
“আর তিনিই সেই পরম সত্তা, যিনি অন্ধকার রাত এবং আলোকময় দিনকে একে অপরের স্থলাভিষিক্ত বা পর্যায়ক্রমিক অনুগামী করেছেন (Khilfatan); এটি তার জন্য এক চাক্ষুষ নিদর্শন—যে নিজের চিন্তাকে জাগ্রত করে শিক্ষা নিতে চায় অথবা যে নিয়ামতের সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চায়।”
আয়াত ৬৩
وَعِبَادُ الرَّحْمَٰنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا وَإِذَا خَاطَبَهُمُ الْجَاهِلُونَ قَالُوا سَلَامًا
“আর পরম দয়াময় আল্লাহর সেই প্রকৃত আদর্শিক দাস তো তারাই—যারা এই বাস্তব পৃথিবীর বুকে অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, বিনীত, শান্ত ও অহংকারমুক্ত পদক্ষেপে বিচরণ করে (Yamshūna 'alal-ardi hawnā), এবং যখনই অজ্ঞ, গোঁড়ারা বা মূর্খেরা তাদের সাথে অসার তর্কে লিপ্ত হতে বা আক্রমণ করতে আসে, তখন তারা তাদের বিপরীতে কেবল পরম শান্তি, নিরাপত্তা ও এড়িয়ে চলার নীতি ব্যক্ত করে (Qālū salāmā)।”
আয়াত ৬৪
وَالَّذِينَ يَبِيتُونَ لِرَبِّهِمْ سُجَّدًا وَقِيَامًا
“আর তারাই তারা—যারা তাদের রাতের আঁধারে বা সমাজ জীবনের সুগভীর অন্ধকার সংকটের প্রহরগুলোতেও তাদের প্রতিপালকের বিধিবদ্ধ আইনের প্রতি পূর্ণ আনুগত্যে সেজদাবনত থাকে এবং তাঁরই শাসনব্যবস্থা সুপ্রতিষ্ঠিত রাখতে অনড় ও দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকে (Sujjadan wa qiyāmā)।”
আয়াত ৬৫
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا اصْرِفْ عَنَّا عَذَابَ جَهَنَّمَ ۖ إِنَّ عَذَابَهَا كَانَ غَرَامًا
“আর যারা অবিরত ব্যাকুল চিত্তে আবেদন করে: হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের থেকে সেই তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ধ্বংসাত্মক অনুশোচনার নরক-অবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে দূর বা প্রতিহত করো (Isrif 'annā 'azāba Jahannam); নিশ্চয়ই সেটির ধ্বংসাত্মক পরিণতি হলো এক অবিচ্ছেদ্য, আঠার মতো লেগে থাকা এক ভয়ঙ্কর দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয়;”
Keywords:
- غَرَامًا (Gharāmā): এমন এক অমোঘ ঋণ বা ধ্বংসাত্মক কুফল যা মানুষের পিছু ছাড়ে না, বরং আঠার মতো তার অস্তিত্বকে কামড়ে ধরে ধ্বংস করে দেয়।
আয়াত ৬৬
إِنَّهَا سَاءَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا
“নিশ্চয়ই সেই নরক-অবস্থা সাময়িক অবস্থানের দিক থেকেও অত্যন্ত নিকৃষ্ট এবং স্থায়ী বা দীর্ঘকালীন বসবাসের দিক থেকেও এক চরম জঘন্যতম জায়গা।”
আয়াত ৬৭
وَالَّذِينَ إِذَا أَنفَقُوا لَمْ يُسْرِفُوا وَلَمْ يَقْتُرُوا وَكَانَ بَيْنَ ذَٰلِكَ قَوَامًا
“আর তারা যখনই (মানব কল্যাণে বা সমাজ গঠনে নিজের জ্ঞান ও সম্পদ) ব্যয় করে, তখন তারা বিন্দুমাত্র কোনো অপচয় বা ভারসাম্যহীন সীমালঙ্ঘন করে না (Lam yusrifū) এবং বিন্দুমাত্র কোনো কার্পণ্য বা সংকীর্ণতাও প্রদর্শন করে না (Walam yaqturū); বরং তাদের সেই ব্যয়ের নীতিটি থাকে এই দুই প্রান্তিকতার একদম মাঝখানে এক নিখুঁত সুষম ভারসাম্য ও মধ্যপন্থায় প্রতিষ্ঠিত (Kāna bayna zālika qawāmā)।”
Keywords:
- قَوَامًا (Qawāmā): এমন এক দৃঢ়, সুষম ও সোজা নীতি যা কোনো ডানে-বামে চরমপন্থী বিচ্যুতি ছাড়াই অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যকে নিখুঁতভাবে রক্ষা করে।
আয়াত ৬৮
وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ يَلْقَ أَثَامًا
“আর তারা আল্লাহর চূড়ান্ত আইনের পাশাপাশি অন্য কোনো মনগড়া উপাস্য বা প্রথাকে নিজের ক্ষমতার উৎস হিসেবে আহ্বান করে না, এবং আল্লাহ যে মানবীয় সত্তার ধ্বংস বা হত্যাকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করেছেন পরম সত্য ও ন্যায়সঙ্গত আইনি প্রক্রিয়া ব্যতিরেকে তারা তাকে কখনই হত্যা বা ধ্বংস করে না (Illā bil-haqq), এবং তারা বিন্দুমাত্র কোনো চারিত্রিক বা আদর্শিক বিকৃতির ব্যভিচারে লিপ্ত হয় can না (Walā yaznūn); আর যে কেউ এই সমস্ত জঘন্য অন্যায়ে লিপ্ত হবে, সে নিজের অস্তিত্বেই অবধারিতভাবে টের পাবে অপরাধের এক ভয়ঙ্কর ধ্বংসাত্মক কুফল বা শাস্তি।”
Keywords:
- يَزْنُونَ (Yaznūn): আক্ষরিক শারীরিক ব্যভিচারের পাশাপাশি ধারণাগত পরিভাষায় এটি কিতাবের মূল আইনের সাথে অন্য কোনো মনগড়া নোংরা দর্শনের মিশ্রণ ঘটানো এবং চারিত্রিক ও আদর্শিক চরম বিকৃতি সাধন করা।
- أَثَامًا (Asāmā): অপরাধ বা পাপের অবধারিত কুফল যা মানুষের ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনকে পঙ্গু ও কলুষিত করে দেয়।
আয়াত ৬৯
يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا
“সেই চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের দিনে তার সেই ধ্বংসাত্মক পরিণতির মাত্রাকে জ্যামিতিক হারে দ্বিগুণ বা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হবে, এবং সে সেটির ভেতরে চিরকাল এক অত্যন্ত লাঞ্ছিত, অপদস্থ ও মূল্যহীন অবস্থায় নিমজ্জিত থাকবে।”
আয়াত ৭০
إِلَّا مَن تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَٰئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ ۗ وَكَانَ اللَّهَ غَفُورًا رَّحِيمًا
“তবে সে ব্যতীত—যে নিজের বিকৃতি থেকে অনুতপ্ত হয়ে সত্যের দিকে ফিরে এসেছে (Tāba), বুদ্ধিবৃত্তিক প্রমাণের ভিত্তিতে দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করেছে (Wa āmana) এবং সংশোধনমূলক কল্যাণকর কর্ম সম্পাদন করেছে (Wa 'amila 'amalan sālihā); অতঃপর আল্লাহ তাদের অতীত জীবনের সমস্ত নেতিবাচক খামতি বা মন্দ বিষয়গুলোকে ইতিবাচক কল্যাণ ও সৌন্দর্যে ওলটপালট বা প্রতিস্থাপিত করে দেবেন; আর আল্লাহ চিরকাল পরম সুরক্ষাদাতা, পরম দয়ালু।”
আয়াত ৭১
وَمَن تَابَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَإِنَّهُ يَتُوبُ إِلَى اللَّهِ مَتَابًا
“আর যে কেউ নিজের ভুল পথ থেকে অনুতপ্ত হয়ে ফিরে আসে এবং সংশোধনমূলক কল্যাণকর কর্ম সম্পাদন করে, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর বিধিবদ্ধ নিয়মের দিকেই এক অত্যন্ত মহিমান্বিত ও সফল প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করে।”
আয়াত ৭২
وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ وَإِذَا مَرُّوا بِاللَّغْوِ مَرُّوا كِرَامًا
“আর তারা কখনই কোনো বানোয়াট মিথ্যা, অপবাদ বা সত্য-বিকৃতির মজলিসে উপস্থিত বা সাক্ষী হয় না (Lā yashhadūnaz-zūra), এবং যখনই তারা কোনো অসার, নিরর্থক বা বিকৃত কথাবার্তা ও দর্শনের পাশ দিয়ে অতিক্রম করে, তখন তারা নিজেদের মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রেখে অত্যন্ত সসম্মানে তা এড়িয়ে চলে যায় (Marrū kirāmā)।”
আয়াত ৭৩
وَالَّذِينَ إِذَا ذُكِّرُوا بِآيَاتِ رَبِّهِمْ لَمْ يَخِرُّوا عَلَيْهَا صُمًّا وَعُمْيَانًا
“আর তারা তারাই—যাদের নিকট যখন তাদের প্রতিপালকের সুস্পষ্ট আয়াত ও অকাট্য বিধি-বিধানের নিদর্শনসমূহ স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়, তখন তারা সেগুলোর ওপর কোনো বধির বা অন্ধের মতো অন্ধবিশ্বাসে হুমড়ি খেয়ে পড়ে না (Lam yakhirrū 'alayhā summaw wa 'umyānā — অর্থাৎ তারা প্রতিটি বিধানকে নিজেদের চোখ, কান ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে যাচাই করে গ্রহণ করে)।”
Keywords:
- صُمًّا وَعُمْيَانًا (Summaw wa ‘umyānā): কিতাবের আইনকে না বুঝে, অন্ধ আবেগ দিয়ে বা যুক্তিহীনভাবে অন্ধ অনুকরণ করার সেই সনাতনী কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানসিকতা।
আয়াত ৭৪
وَالَّذِينَ يَقُولُونَ رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
“আর তারা অবিরত ব্যাকুল চিত্তে আবেদন করে: হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের সহযোগী সমাজ-ক্ষেত্রসমূহ থেকে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বা উত্তরসূরিদের মধ্য থেকে আমাদের চোখের জন্য পরম শীতলতা ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশান্তির উৎস উপহার দাও (Qurrata a'yun), এবং তুমি আমাদের সমগ্র মানবজাতির সামনে সেই সুরক্ষামূলক সতর্ক ও দায়িত্বশীলদের জন্য এক অনন্য রোল মডেল বা সুদৃঢ় আদর্শিক নেতা হিসেবে নিযুক্ত করো (Waj'alnā lil-muttaqīna imāmā)।”
Keywords:
- قُرَّةَ أَعْيُنٍ (Qurrata a’yun): এমন এক পরম স্থিরতা, সাফল্য ও মানসিক শান্তি যা নিজের সমাজ ও সন্তানদের সত্যের পথে প্রতিষ্ঠিত দেখার মাধ্যমে অর্জিত হয়।
আয়াত ৭৫
أُولَٰئِكَ يُجْزَوْنَ الْغُرْفَةَ بِمَا صَبَرُوا وَيَتَلَقَّوْنَ فِيهَا تَحِيَّةً وَسَلَامًا
“তাদের সেই সত্যের পথে চলতে গিয়ে যে কোনো বাধা ও কষ্টের মুখে অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল থাকার অবধারিত পুরস্কার হিসেবে ভূষিত করা হবে এক সুউচ্চ, সুরক্ষিত শাসনতান্ত্রিক প্রাসাদ বা চেম্বারে (Yujzawnal-ghurfata), এবং সেখানে তাদের অত্যন্ত সম্মানিত স্বাগত জানানো হবে এক অফুরন্ত আত্মিক সজীবতা, শান্তি ও পরম নিরাপত্তার মাধ্যমে;”
Keywords:
- الْغُرْفَةَ (Al-Ghurfah): আক্ষরিক কক্ষ বা কামরা নয়, বরং শাসনতান্ত্রিক পরিভাষায় এটি আল্লাহর আইনের দ্বারা সুউচ্চ ও বিশেষভাবে সুরক্ষিত এমন এক বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ প্রশাসনিক বা আদর্শিক চেম্বার যা সাধারণের নাগালের বাইরে।
আয়াত ৭৬
خَالِدِينَ فِيهَا ۚ حَسُنَتْ مُسْتَقَرًّا وَمُقَامًا
“সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে; সেই পরম সুরক্ষার প্রাসাদটি সাময়িক অবস্থানের দিক থেকেও কতই না চমৎকার, সুন্দর এবং স্থায়ী বা দীর্ঘকালীন বসবাসের দিক থেকেও এক পরম মহিমান্বিত জায়গা!”
আয়াত ৭৭
قُلْ مَا يَعْبَأُ بِكُمْ رَبِّي لَوْلَا دُعَاؤُكُمْ ۖ فَقَدْ كَذَّبْتُمْ فَسَوْفَ يَكُونُ لِزَامًا
“তুমি চূড়ান্ত ঘোষণা করে দাও: আমার প্রতিপালক তোমাদের বিন্দুমাত্র পরোয়া বা মূল্যায়ন করতেন না যদি না তোমরা (সংকটের মুখে) তাঁর বিধিবদ্ধ নিয়মকে পরম আকুতিতে আহ্বান করতে; কিন্তু তোমরা যেহেতু পরম সত্যকে সরাসরি মিথ্যা প্রতিপন্ন করে উড়িয়ে দিয়েছ, সুতরাং সেটির অবধারিত ধ্বংসাত্মক কুফল বা শাস্তি খুব শীঘ্রই তোমাদের অস্তিত্বকে এক অলঙ্ঘনীয় শৃঙ্খলের মতো আঁকড়ে ধরবে (Fasawfa yakūnu lizāmā)।”
Keywords:
- لِزَامًا (Lizāmā): এমন এক অবধারিত পাওনা, কর্মের কুফল বা পরিণতি যা কোনো সত্তাকে আঠার মতো জড়িয়ে ধরে এবং যা থেকে কোনো অবস্থাতেই নিষ্কৃতি পাওয়া সম্ভব নয়।