| SURAH 21 : Al- Anbiya |
আয়াত ১
اقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ مُّعْرِضُونَ
“মানবসমাজের জন্য তাদের কৃতকর্মের অবধারিত হিসাব-নিকাশ বা ফলাফল প্রকাশের সময় অত্যন্ত নিকটবর্তী হয়ে গেছে (Iqtaraba linnāsi hisābuhum), অথচ তারা এক চরম উদাসীনতার মধ্যে লিপ্ত হয়ে সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখছে।”
حِسَابُهُمْ (হিসাবুহুম): তাদের কর্মের নিখুঁত হিসাব ও চূড়ান্ত ফলাফল।
مُعْرِضُونَ (মু’রিদ্বুন/আরাজা): সত্যকে অবজ্ঞা করা, এর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা অগ্রাধিকার তালিকা থেকে বাদ দিয়ে চলা
আয়াত ২
مَا يَأْتِيهِم مِّن ذِكْرٍ مِّن رَّبِّهِم مُّحْدَثٍ إِلَّا اسْتَمَعُوهُ وَهُمْ يَلْعَبُونَ
“তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যখনই কোনো নতুন চেতনা-উদ্বোধক বিধি-বিধান বা পরম স্মরণিকা তাদের নিকট আসে (Min zikrim min Rabbihim), তখন তারা তা কেবল উপহাস, খামখেয়ালি ও ক্রীড়া-কৌতুকের ছলে শ্রবণ করে।”رٍ (জিকর): আল্লাহর আয়াত বা বিধিবিধান অনুধাবন ও তা জীবনে বাস্তবায়ন করা (1 Vocabula… p. 32)।رَبِّهِمْ (রব্বিহিম): তাদের প্রতিপালক, যিনি সমগ্র মহাবিশ্বের লালন ও বিকাশ সাধন করছেন
আয়াত ৩
لَاهِيَةً قُلُوبُهُمْ ۗ وَأَسَرُّوا النَّجْوَى الَّذِينَ ظَلَمُوا هَلْ هَٰذَا إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ ۖ أَفَتَأْتُونَ السِّحْرَ وَأَنتُمْ تُبْصِرُونَ
“তাদের সচেতন মন বা বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র সম্পূর্ণ দিশেহীন ও বিভ্রান্ত (Lāhiyatan qulūbuhum); আর এই ভারসাম্যহীন অন্যায়কারীরা গোপনে কুতর্কের পরামর্শ করে বলে: এই ব্যক্তি তো তোমাদের মতোই একজন সাধারণ মানুষ বৈ কিছু নয়; তবে কি তোমরা চাক্ষুষ জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও এই জাদুকরী বিভ্রান্তি বা মনস্তাত্ত্বিক কূটকৌশলকে গ্রহণ করবে?”قُلُوبُهُمْ (কুলুবুহুম): মানুষের সচেতন সিদ্ধান্ত ও সংকল্প গ্রহণের কেন্দ্র (অন্তর)
।بَشَرٌ (বশর): মানুষের কেবল বাহ্যিক আকৃতি, দৃশ্যমান অবয়ব বা জৈবিক ও শারীরিক গঠন (একে “সাধারণ মানুষ” অনুবাদ করা ভুল, কারণ বিরোধীরা রাসূলের ভেতরের বুদ্ধিবৃত্তি ও ওহীর জ্ঞানকে অস্বীকার করে শুধু তার বাইরের শারীরিক কাঠামোকে দেখছিল)
আয়াত ৪
قَالَ رَبِّي يَعْلَمُ الْقَوْلَ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
“সে বলে: উচ্চ সুরক্ষার স্তরে এবং এই বাস্তব পৃথিবীতে যা কিছু বলা বা প্রকাশ করা হয়, তার সমস্ত কিছুই আমার প্রতিপালক নিখুঁতভাবে জানেন; আর তিনি সবকিছু শোনেন ও সর্বজ্ঞ।”
السَّمَاءِ (আস-সামা): সর্বোচ্চ উচ্চতা, শ্রেষ্ঠত্ব, গৌরব, বা উচ্চতর মহাজাগতিক নিয়মাবলী ও ঐশী আইন (ভৌগোলিক আকাশ নয়) ।
الْأَرْضِ (আল-আরদ): মানুষের বাস্তব জীবনের পার্থিব সামাজিক ভিত্তি বা জড় জাগতিক পরিমণ্ডল। (জড় মাটি বা পৃথিবী নয়) ।
الْقَوْلَ (আল-কাওল): মানুষের সামগ্রিক বক্তব্য, আচরণ ও ক্রিয়াকলাপ।
আয়াত ৫
بَلْ قَالُوا أَضْغَاثُ أَحْلَامٍ بَلِ افْتَرَاهُ بَلْ هُوَ شَاعِرٌ فَلْيَأْتِنَا بِآيَةٍ كَمَا أُرْسِلَ الْأَوَّلُونَ
“বরং তারা (সত্যকে নস্যাৎ করতে) বলে: এগুলো তো কেবলই এলোমেলো কাল্পনিক স্বপ্নের সমষ্টি, কেউ বলে সে এটি নিজে বানিয়ে মিথ্যা আরোপ করেছে, আবার কেউ বলে সে তো একজন উগ্র আবেগ বা ভাবোচ্ছ্বাস ছড়ানো কবি (Bal huwā shā'irun); (যদি সে সত্যবাদী হয়) তবে সে আমাদের কাছে কোনো অলৌকিক চাক্ষুষ নিদর্শন বা প্রমাণ নিয়ে আসুক, যেমন পূর্ববর্তী বাণীবাহকদের পাঠানো হয়েছিল।”افْتَرَاهُ (আফতারা): নিজের বা মানুষের কোনো মনগড়া বক্তব্য বা কাল্পনিক আইনকে আল্লাহর বাণী বা ঐশী বিধান হিসেবে দাবি করা
بِآيَةٍ (বি-আয়াহ): আল্লাহর সৃষ্টিজগতের অলঙ্ঘনীয় সত্য বা ঐশী বাণীর অকাট্য প্রমাণ
আয়াত ৬
مَا آمَنَتْ قَبْلَهُم مِّن قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا ۖ أَفَهُمْ يُؤْمِنُونَ
“তাদের পূর্বে যেসব সমাজ বা আদর্শিক জনগোষ্ঠীকে (কারইয়াহ) তাদের নিজস্ব কুফরের কারণে নিষ্ক্রিয় ও দেউলিয়া (আহলাকনা) করেছি, তাদের কেউই জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে বিশ্বাস (ঈমান) স্থাপন করেনি; তবে কি এরা বিশ্বাস করবে?”قَرْيَةٍ (কারইয়াহ): কোনো নির্দিষ্ট সংস্কৃতি বা মতাদর্শের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমাজ, সভ্যতা বা জনগোষ্ঠী। (ভৌগোলিক শহর নয়)।
أَهْلَكْنَاهَا (আহলাকনাহা): কোনো সমাজকে তার ভুল কর্মের অমোঘ নিয়মে মেধা, নৈতিকতা ও সামর্থ্যের দিক থেকে দেউলিয়া, অচল বা নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া।
আয়াত ৭
وَمَا أَرْسَلْنَا قَبْلَكَ إِلَّا رِجَالًا نُّوحِي إِلَيْهِمْ ۖ فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
আর তোমার পূর্বেও আমি কেবল উপায়-উপকরণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্যসম্পন্ন দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরই (রিজাল) পাঠিয়েছি, যাদের কাছে আমি ওহী পাঠাতাম। সুতরাং তোমরা যদি না জানো, তবে যারা এই জীবনবিধানের দায়িত্বশীল বা রক্ষণাবেক্ষণকারী (আহলে জিকর), তাদের জিজ্ঞাসা করো।(Fas'alū ahla-z-Zikri)।”রিজাল” উপায়-উপকরণ ও সামর্থ্যসম্পন্ন ব্যক্তি: সমাজে যারা কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জন বা দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি, জ্ঞান, সম্পদ, প্রভাব ও যোগ্যতা ধারণ করেন। যারা কোনো আদর্শ বা বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে যান এবং সেই দায়িত্ব বহন করার মতো মানসিক ও বস্তুগত দৃঢ়তা রাখেন
আয়াত ৮
وَمَا جَعَلْنَاهُمْ جَسَدًا لَّا يَأْكُلُونَ الطَّعَامَ وَمَا كَانُوا خَالِدِينَ
“আর আমি তাদেরকে এমন কোনো জড় বা বস্তুগত কাঠামো (জাসাদ) দিয়ে তৈরি করিনি যে তারা (জগতের অভিজ্ঞতা ও পরিবেশ থেকে) কোনো জ্ঞান, চিন্তা বা পুষ্টি আত্মস্থ ও গ্রহণ (ইয়াকুলুন) করবে না;আর তারা কেউ এই বৈষয়িক জীবনে চিরকাল স্থায়ীও ছিল না।”
خَالِدِينَ (খালিদিন): এর প্রচলিত অনুবাদ “চিরস্থায়ী”, “অমর” বা “মৃত্যুহীন” করা ব্যাকরণগত ও যৌক্তিকভাবে একটি বড় ভুল। WQT-এর মূল ডক্স এবং ক্লাসিক্যাল আরবি অনুযায়ী, এর প্রকৃত অর্থ কোনো ভৌগোলিক স্থান বা জড় দেহে অনন্তকাল বেঁচে থাকা বা অমর হওয়া নয়। خلد (খালাদ) শব্দের মূল অর্থ হলো— এমন এক দীর্ঘস্থায়ী অবস্থা বা পরিণতি, যা মানুষের কর্মের ও চিন্তার অমোঘ নিয়মে অপরিবর্তিত বা দীর্ঘকাল স্থায়ী রূপে বহাল থাকে (Long-lasting state, enduring outcome, or established legacy of actions)।
الطَّعَام (ত্বআম): এর অর্থ কেবল পেট ভরানোর বস্তুগত খাদ্য নয়; বরং এর মূল অর্থ হলো— এমন জ্ঞান, শিক্ষা, বিচারবুদ্ধি ও অভিজ্ঞতা যা মানুষের ব্যক্তিত্ব, মনন, নৈতিকতা এবং চিন্তাভাবনার পুষ্টি ও বিকাশ সাধন করে (Intellectual and Cognitive Nourishment)।
أَكَلَ / يَأْكُلُونَ (আকালা / ইয়াকুলুন): কুরআনের গভীর ধারণায় এর অর্থ মুখ দিয়ে খাবার চিবিয়ে খাওয়া নয়; বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো— কোনো বিষয়কে নিজের ভেতরে গ্রহণ করা, শোষণ করা, আত্মস্থ করা, ব্যবহার করা কিংবা কোনো প্রক্রিয়া বা জ্ঞানকে ধারণ ও গ্রাস করা (To Absorb, Consume, or Internalize)।
আয়াত ৯
ثُمَّ صَدَقْنَاهُمُ الْوَعْدَ فَأَنجَيْنَاهُمْ وَمَن نَّشَاءُ وَأَهْلَكْنَا الْمُسْرِفِينَ
অতঃপর আমি তাদের দেওয়া নিয়ম ও প্রতিশ্রুত সুনির্দিষ্ট ফলাফলকে (ওয়াদ) সত্যে পরিণত করলাম; ফলে আমি তাদের উদ্ধার করলাম এবং যারাই (সুনির্দিষ্ট নিয়মের) মানদণ্ড ও শর্তাবলী পূরণ করল (মান নাশা) তাদেরও; আর সীমার অপব্যবহারকারী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীরা নিষ্ক্রিয় ও দেউলিয়া হয়ে পড়ল (আহলাকনা) (Wa ahlaknal-musrifīn)।”
شأ (শা’আ / শায়ুন): এর অর্থ আল্লাহর কোনো আকস্মিক, অলৌকিক বা খেয়ালী “ইচ্ছা” নয়। কুরআনের অমোঘ নিয়মানুযায়ী, ‘শা’আ’ শব্দের প্রকৃত অর্থ হলো— আল্লাহর নির্ধারিত প্রাকৃতিক ও সামাজিক আইন, সুনির্দিষ্ট কার্যকারণ নীতি বা নিয়মাবলী (The Divine Laws, Cause-and-Effect Rules, or Criteria established by Allah)অতএব, من نشاء (মান নাশা) এর সঠিক ধারণাগত অর্থ হলো— “যারা আল্লাহর নির্ধারিত সেই অমোঘ নিয়ম, মানদণ্ড বা শর্তাবলী পূরণ করে বা যারাই সেই নিয়মের আওতাভুক্ত হয়”
أَهْلَكْنَا (আহলাকনা): এর মূল ধাতু হলাক (Halak) (1 Vocabula… p. 16)। কুরআনের বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিনিষ্ঠ ধারা অনুযায়ী, আল্লাহ কোনো অলৌকিক হাত দিয়ে সরাসরি কোনো জাতিকে হুট করে ধ্বংস বা দেউলিয়া “করে দেন না”
আয়াত ১০
لَقَدْ أَنزَلْنَا إِلَيْكُمْ كِتَابًا فِيهِ ذِكْرُكُمْ ۖ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
“আমি তোমাদের প্রতি এমন এক সংকলিত আইন ও জীবনবিধান (কিতাব) অবতীর্ণ করেছি, যাতে তোমাদেরই বাস্তব দিকনির্দেশনা রয়েছে; তবুও কি তোমরা তোমাদের যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিকে (আকল) কাজে লাগাবে না??”
আয়াত ১১
وَكَمْ قَصَمْنَا مَن قَرْيَةٍ كَانَتْ ظَالِمَةً وَأَنشَأْنَا بَعْدَهَا قَوْمًا آخَرِينَ
“আর কত ভারসাম্যহীন ও হক-অস্বীকারকারী (জালিমাহ) সমাজ বা জনগোষ্ঠী (কারইয়াহ) তাদের অহংকারের মেরুদণ্ড চূর্ণ-বিচূর্ণ (কসামনা) হওয়ার মাধ্যমে তাদের আধিপত্য হারিয়েছিল, এবং তাদের পর গড়ে উঠেছিল অন্য এক সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির প্রজন্ম (কওম)!”
আয়াত ১২
فَلَمَّا أَحَسُّوا بَأْسَنَا إِذَا هُم مِّنْهَا يَرْكُضُونَ
“অতঃপর যখনই তারা আমার সুনির্দিষ্ট বিধিবদ্ধ কঠোর সামাজিক আইনের তীব্র ফলাফলকে (বা’স) সুনিশ্চিতভাবে উপলব্ধি ও অনুধাবন করল, তক্ষুণি তারা তা থেকে বাঁচার জন্য অন্ধ হুড়োহুড়ি ও ক্ষিপ্র তৎপরতায় লিপ্ত হয়ে পড়ল (ইয়াকজুদুন)।”
أَحَسُّوا (আহাস্সু): এর মূল ধাতু হিস্স (Hiss/H-S-S)। প্রচলিত অর্থে একে স্রেফ ইন্দ্রিয় অনুভূতি বা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের সংকেত মনে করা হয়। কিন্তু কুরআনের গভীর মনস্তাত্ত্বিক ধারায়, এর প্রকৃত অর্থ কোনো শারীরিক কাঁপুনি বা হঠাৎ ভয় পাওয়া নয়। এর মূল অর্থ হলো— জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সচেতনতার সর্বোচ্চ স্তরে গিয়ে কোনো সত্য, বাস্তব পরিস্থিতি বা কর্মের অমোঘ পরিণতিকে নিশ্চিতভাবে উপলব্ধি বা অনুধাবন করা (To perceive intellectually, to realize fully, or to become consciously aware of the ground reality)।বিরোধীরা যখন আল্লাহর বিধিবদ্ধ সামাজিক ও প্রাকৃতিক নিয়মের কঠোর প্রতিক্রিয়াকে তাদের আকল ও বুদ্ধিবৃত্তি দিয়ে সুনিশ্চিতভাবে উপলব্ধি বা অনুধাবন করল (আহাস্সু), তখন তারা পলায়নপর মনোবৃত্তি ধারণ করেছিল। এটি কোনো আকস্মিক ভয়ের “টের পাওয়া” নয়, বরং এটি হলো তাদের দীর্ঘদিনের অন্ধত্বের পর চূড়ান্ত সত্যের “সুনিশ্চিত বাস্তব সচেতনতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উপলব্ধি”
رَكَضَ / يَرْكُضُونَ (রাকাদ্বা / ইয়াকজুদুন): এর মূল অর্থ কেবল পা দিয়ে দৌড়ানো বা শারীরিকভাবে কোনো স্থান থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। এর মূল আরবি ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হলো— কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য চরম ক্ষিপ্রতা, তীব্র তৎপরতা, অন্ধ হুড়োহুড়ি বা অন্ধ আবেগে গা ভাসিয়ে তীব্র বেগে ধাবিত হওয়া (To rush blindly, to push forward with aggressive urgency, or to act with impulsive frenzy)।
আয়াত ১৩
لَا تَرْكُضُوا وَارْجِعُوا إِلَىٰ مَا أُتْرِفْتُمْ فِيهِ وَمَسَاكِنِكُمْ لَعَلَّكُمْ تُسْأَلُونَ
(আল্লাহর অমোঘ নিয়মের প্রক্রিয়া তাদের স্পষ্ট করে দেয়—) “তোমরা অন্ধ আবেগে হুড়োহুড়ি ও ক্ষিপ্র তৎপরতা করো… না; বরং তোমরা আত্মপর্যালোচনা ও পুনর্বিবেচনা করো (ওয়ারজিউ) সেই সব বিষয়ের ওপর যার মধ্যে তোমরা বিলাসবহুল জীবন ও অহংকার করছিলে এবং তোমাদের সেই সব প্রতিষ্ঠিত চিন্তার ভিত্তি ও আশ্রয়স্থলগুলোর (মাসাকিনিকুম) ওপর, যাতে তোমরা (নিজেদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের ভিত্তিহীনতা অনুধাবন করে বাস্তব সত্যের) প্রকৃত অনুসন্ধান ও যৌক্তিক কারণ খতিয়ে দেখতে পারো (তুসআলুন)।”
لَا تَرْكُضُوا (লা তারকুদু): অন্ধ আবেগে হুড়োহুড়ি বা অবিন্যস্ত তৎপরতা করো না।مَسَاكِنِكُمْ (মাসাকিনিকুম): তোমাদের প্রতিষ্ঠিত মতবাদ, চিন্তার ভিত্তি, আরামদায়ক আশ্রয়স্থল বা মানসিক ধারণার জায়গা (ভৌগোলিক ঘরবাড়ি নয়)।
رَجَعَ / وَارْجِعُوا (রাজা’আ / ওয়ারজিউ): এর অর্থ পা দিয়ে হেঁটে কোনো ভৌগোলিক স্থানে সশরীরে “ফিরে যাওয়া” বা প্রত্যাবর্তন নয় (1 Vocabula… p. 16)। কুরআনের বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধারায়, এর প্রকৃত অর্থ হলো— নিজের কৃতকর্মের দিকে দৃষ্টিপাত করা, কোনো বিষয়কে পুনরায় খতিয়ে দেখা, আত্মপর্যালোচনা করা, পূর্বের চিন্তাধারা বা সিদ্ধান্তের ওপর পুনর্বিবেচনা করা কিংবা নিজের কর্মের যৌক্তিক পরিণতি বিশ্লেষণ করা (To refer back, to review, to audit oneself, or to reconsider the baseline of one’s actions)
سَأَلَ / تُسْأَلُونَ (সাআলা / তুসআলুন): এর অর্থ কোনো কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে মৌখিকভাবে স্রেফ “জিজ্ঞেস করা” বা “প্রশ্ন করা” নয়। কুরআনের বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধারায়, এর প্রকৃত অর্থ হলো— কোনো বিষয়ের গভীর অনুসন্ধান করা, সত্য ও অকাট্য প্রমাণের খোঁজে তদন্ত করা, সত্যের অন্বেষণ করা, কিংবা কোনো দাবির বাস্তব ভিত্তি ও যৌক্তিক কারণ অনুসন্ধান করা (To investigate, to inquire deeply for evidence, to seek verification, or to analyze the baseline of claims)
আয়াত ১৪
قَالُوا يَا وَيْلَنَا إِنَّا كُنَّا ظَالِمِينَ
“তারা (চরম হতাশায়) চিৎকার করে উঠেছিল: হায় আমাদের দুর্ভোগ! নিশ্চয়ই আমরা নিজেরা চরম অন্যায়কারী ও ভারসাম্যহীন ছিলাম!”
আয়াত ১৫
فَمَا زَالَت تِّلْكَ دَعْوَاهُمْ حَتَّىٰ جَعَلْنَاهُمْ حَصِيدًا خَامِدًا
“অতঃপর তাদের এই হাহাকার ও আত্মোপলব্ধির দাবি বন্ধ হলো না, যতক্ষণ না আল্লাহর অমোঘ সামাজিক নিয়মের অমোঘ ধারায় তারা কর্তিত শস্যের মতো সম্পূর্ণ নিস্তেজ ও নিষ্ক্রিয় অবস্থায় (খমিদিলীন) নিমজ্জিত হলো।
আয়াত ১৬
وَمَا خَلَقْنَا السَّمَاءَ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا لَاعِبِينَ
“আর উচ্চ সুরক্ষামূলক স্তরসমূহকে এবং এই বাস্তব পৃথিবীকে এবং এই দুইয়ের অন্তর্বর্তী কোনো কিছুকেই আমি বিন্দুমাত্র কোনো উদ্দেশ্যহীন খেলা বা খামখেয়ালির ছলে সৃষ্টি করিনি।
لَدُنْ / لَدُنَّا (লাদুন / লাদুন্না): এর অর্থ আল্লাহর কোনো ভৌগোলিক বা বস্তুগত “নিজস্ব স্থান”, “ব্যক্তিগত দিক” কিংবা স্রেফ “নিজের স্তর” নয়। কুরআনের বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিনিষ্ঠ ধারায়, এর প্রকৃত অর্থ হলো— আল্লাহর পরম জ্ঞান, চূড়ান্ত প্রজ্ঞা, অমোঘ বিধান এবং প্রাকৃতিক নিয়মের অলঙ্ঘনীয় মূল উৎস“
আয়াত ১৭
لَوْ أَرَدْنَا أَن نَّتَّخِذَ لَهْوًا لَّاتَّخَذْنَاهُ مِن لَّدُنَّا إِن كُنَّا فَاعِلِينَ
“আমি যদি কোনো উদ্দেশ্যহীন, বিভ্রান্তিকর বা অনর্থক বিষয় (লাহওয়ান) গ্রহণ করতে চাইতাম (যা সৃষ্টির মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে), তবে তা আমার পরম জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অমোঘ বিধানের মূল উৎস (মিন লাদুন্না) থেকেই আসত; যদি আমি তেমন কিছু করার হতাম (কিন্তু আল্লাহর পুরো সৃষ্টি ব্যবস্থা সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও উদ্দেশ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত)।।”
لَهْوًا (লাহওয়ান): এর মূল ধাতু লহা (L-H-W)। এর প্রকৃত অর্থ কেবল মুখরোচক খেলাধুলা বা কৌতুক নয়। কুরআনের বৈজ্ঞানিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধারায় এর প্রকৃত অর্থ হলো— এমন যেকোনো নিরর্থক বা গুরুত্বহীন বিষয় যা মানুষকে তার আসল উদ্দেশ্য, মূল দায়িত্ব, বাস্তব লক্ষ্য ও সত্যের পথ থেকে বিচ্যুত বা গাফেল করে রাখে (Anything that distracts, diverts from prime responsibilities, or causes heedlessness of the ultimate purpose)
আয়াত ১৮
بَلْ نَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَى الْبَاطِلِ فَيَدْمَغُهُ فَإِذَا هُوَ زَاهِقٌ ۚ وَلَكُمُ الْوَيْلُ مِمَّا تَصِفُونَ
বরং আমি অমোঘ বাস্তব সত্যের (হক) এমন এক শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ ঘটাই বা সজোরে আঘাত হানি (নাকজিফু) অসত্য ও অলীক ধারণার (বাতিল) ওপর, ফলে সত্য তার মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয় এবং তক্ষুণি অসত্য বিলুপ্ত হয়ে যায়; আর তোমরা যে সমস্ত কাল্পনিক বা মনগড়া কথা বানিয়ে বলছ (তাসিফুন), তার জন্য তোমাদের ওপর দুর্ভোগ।”
قَذَفَ / نَقْذِفُ (ক্বাজাফা / নাকজিফু): এর অর্থ হাত দিয়ে কোনো বস্তু “ছুড়ে মারা” বা “নিক্ষেপ করা” নয়। কুরআনের বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিনিষ্ঠ ধারায় এর প্রকৃত অর্থ হলো— কোনো অকাট্য সত্য, অকাট্য যুক্তি বা অলঙ্ঘনীয় নিয়মের এমন এক শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ ঘটানো যা অসত্যের ভিত্তিকে সরাসরি আঘাত করে, সত্যকে সজোরে সামনে আনা বা সত্যের দ্বারা অসত্যকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত ও উন্মোচিত করা (To forcefully project, to launch an unyielding impact, or to establish the absolute truth as a crushing counterweight against falsehood)।
আয়াত ১৯
وَلَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ وَمَنْ عِندَهُ لَا يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِهِ وَلَا يَسْتَحْسِرُونَ
“উচ্চ সুরক্ষার স্তরে এবং এই বাস্তব পৃথিবীতে যারা বা যা কিছু রয়েছে, তার সমস্ত কিছুর মালিকানা ও চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ কেবল তাঁরই; আর যারা তাঁর বিধিবদ্ধ নিয়মের নিবিড় সান্নিধ্যে বা সংযোগে রয়েছে, তারা কখনই তাঁর দাসত্ব ও অনুশাসন কার্যকর করতে বিন্দুমাত্র অহংকার প্রদর্শন করে না এবং কখনো ক্লান্ত বা অবসন্ন হয় না।”
আয়াত ২০
يُسَبِّحُونَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لَا يَفْتُرُونَ
“তারা জীবনের প্রতিটি অন্ধকার প্রহরে এবং কর্মব্যস্ত আলোকময় স্তরেও আল্লাহর দেওয়া নিয়মের অমোঘ শ্রেষ্ঠত্ব ফুটিয়ে তুলতে অবিরত সচল থাকে (Yusabbihūnal-layla wan-nahāra), তারা বিন্দুমাত্র শিথিলতা প্রদর্শন করে না।”
আয়াত ২১
أَمِ اتَّخَذُوا آلِهَةً مِّنbox الْأَرْضِ هُمْ يُنشِرُونَ
“তবে কি এরা এই বাস্তব পৃথিবী থেকে এমন কিছু মনগড়া উপাস্য বা অন্ধ আদর্শকে নিজেদের কর্তৃত্বের উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছে, যা কোনো মৃত চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে?”
আয়াত ২২
لَوْ كَانَ فِيهَا آلِهَةٌ إِلَّا اللَّهُ لَفَسَدَتَا ۚ فَسُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ
“যদি এই উচ্চ সুরক্ষার স্তরে এবং পৃথিবীতে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোনো মনগড়া ইলাহ বা বহুবিধ শাসন-কর্তৃত্বের অস্তিত্ব থাকত, তবে এই গোটা মহাবিশ্ব ও সমাজ ব্যবস্থা নিশ্চিতভাবেই ধ্বংস ও বিশৃঙ্খল হয়ে যেত (Lafasadatā); সুতরাং আরশের লালনকর্তা ও চূড়ান্ত অধিপতি আল্লাহ পরম পবিত্র ও সুউচ্চ—তারা তাঁর প্রতি যে সমস্ত মনগড়া প্রথা বা বৈশিষ্ট্য আরোপ করে তা থেকে।”
আয়াত ২৩
لَا يُسْأَلُ عَمَّا يَفْعَلُ وَهُمْ يُسْأَلُونَ
“তিনি তাঁর প্রাকৃতিক ও ঐশী নিয়মে যা কিছু সম্পাদন করেন, সেটির জন্য তাঁকে কোনো মনগড়া প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় না; বরং মানুষের তৈরি করা সমস্ত ব্যবস্থাকেই অবধারিতভাবে জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়।”
আয়াত ২৪
أَمِ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ آلِهَةً ۖ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ ۖ هَٰذَا ذِكْرُ مَن مَّعِيَ وَذِكْرُ مَن قَبْلِي ۗ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ الْحَقَّ ۖ فَهُم مُّعْرِضُونَ
“তবে কি তারা আল্লাহকে বর্জন করে অন্য কিছু মনগড়া আদর্শকে নিজেদের উপাস্য বা আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করেছে? তুমি বলো: তোমরা তোমাদের অকাট্য যৌক্তিক প্রমাণ উপস্থাপন করো (Hātū burhānakum); এই হলো আমার সাথে যারা রয়েছে তাদের জন্য পরম জীবনবিধান বা কিতাব এবং আমার পূর্ববর্তীদেরও মূল ঐশী রূপরেখা; কিন্তু তাদের অধিকাংশ মানুষই অকাট্য বাস্তব সত্য সম্পর্কে কোনো সঠিক জ্ঞান রাখে না, ফলে তারা সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখছে।”
আয়াত ২৫
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
“আর তোমার পূর্বে আমি এমন কোনো বাণীবাহক প্রেরণ করিনি, যার দিকে আমি এই মর্মে সুনির্দিষ্ট বার্তা ও আইনি ডিক্রি জারি করিনি যে—নিশ্চয়ই আমি ব্যতীত অন্য কোনো মনগড়া উপাস্য বা আইনের বিন্দুমাত্র কোনো বৈধতা নেই, সুতরাং তোমরা কেবল আমারই দাসত্ব ও অনুশাসনকে সমাজে কার্যকর করো (Fa'budūn)।”
আয়াত ২৬
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَٰنُ وَلَدًا ۗ سُبْحَانَهُ ۚ بَلْ عِبَادٌ مُّكْرَمُونَ
“অথচ তারা দাবি করে বসেছে: পরম দয়াময় আল্লাহ নাকি নিজের জন্য কোনো আক্ষরিক সন্তান বা উপজাত সৃষ্টি করেছেন! তিনি সর্বপ্রকার মানবিক সীমাবদ্ধতা থেকে পরম পবিত্র ও সুউচ্চ; বরং (বাণীবাহক বা ঐশী চালিকাশক্তিসমূহ হলেন) তাঁরই অত্যন্ত সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ অনুগত দাস।”
আয়াত ২৭
لَا يَسْبَقُونَهُ بِالْقَوْلِ وَهُم بِأَمْرِهِ يَعْمَلُونَ
“তারা আল্লাহর বিধিবদ্ধ বাণী বা সিদ্ধান্তের আগে বেড়ে নিজেদের কোনো মনগড়া কথা বলে না, এবং তারা কেবল তাঁরই সুনির্দিষ্ট আইনি নির্দেশ বা ডিক্রি অনুযায়ী সমস্ত কর্ম সম্পাদন করে।”
আয়াত ২৮
يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِم| وَمَا خَلْفَهُمْ وَلَا يَشْفَعُونَ إِلَّا لِمَنِ ارْتَضَىٰ وَهُم مِّنْ خَشْيَتِهِ مُشْفِقُونَ
“তাদের সম্মুখে যা কিছু বর্তমান রয়েছে এবং তাদের অগোচরে পেছনে যা কিছু অনাগত বা অতীত হয়ে গেছে, তার সমস্ত কিছুই তিনি নিখুঁতভাবে জানেন; আর তারা কারও পক্ষে কোনো কোয়ালিশন, সুপারিশ বা আইনি সহায়তা খাড়া করতে পারে না, তবে সে ব্যতীত—যাকে আল্লাহ সন্তুষ্টির সাথে গ্রহণ করেছেন; আর তারা নিজেরা আল্লাহর জ্যান্ত আইনের প্রতি সুগভীর শ্রদ্ধা ও সতর্কতার কারণে সর্বদা সজাগ ও চিন্তিত থাকে।”
আয়াত ২৯
وَمَن يَقُلْ مِنْهُمْ إِنِّي إِلَٰهٌ مِّن دُونِهِ فَذَٰلِكَ نَجْزِيهِ جَهَنَّمَ ۚ كَذَٰلِكَ نَجْزِي الظَّالِمِينَ
- إِلَٰهٌ (ইলাহ): এটি কেবল উপাস্য কোনো সত্তা নয়, বরং যার আইন, বিচার, শাসন ও আদেশ চূড়ান্তভাবে অন্ধভাবে মেনে চলা হয় (চূড়ান্ত আইনপ্রণেতা ও কর্তৃত্ব)।
- জ্বালিমীন (الظَّالِمِينَ): যারা সমাজে ভারসাম্য নষ্ট করে, অন্যের হক নষ্ট করে এবং ঐশী আইনের পরিপন্থী মানব-রচিত নিয়ম প্রতিষ্ঠা করে সমাজকে অন্ধকারে ঠেলে দেয়।
ধারণাভিত্তিক সঠিক অনুবাদ: “এবং তাদের মধ্যে যে কেউ বলে যে, ‘আল্লাহ ব্যতীত নিশ্চয়ই আমি একজন চূড়ান্ত বিধানদাতা বা হুকুমতের মালিক (إِلَٰهٌ)’, তবে তাকে আমরা প্রতিফল হিসেবে জাজাবিয়া বা দুর্ভোগের চূড়ান্ত রূপ (জাহান্নাম) দেব। এভাবেই আমরা সীমালঙ্ঘনকারী ও ভারসাম্য নষ্টকারীদের (الظَّالِمِينَ) প্রতিফল দিয়ে থাকি।
আয়াত ৩০
أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا ۖ وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاء كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ ۖ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ
- كَفَرُوا (কাফারু): সত্যকে জানা সত্ত্বেও নিজের অহংকার, স্বার্থ বা অন্ধ বিশ্বাসের কারণে তা ঢেকে রাখা, অস্বীকার করা বা সত্যের মুখোমুখি হতে অনীহা প্রকাশ করা।
- رَتْقًا (রাৎকান) ও فَفَتَقْنَاهُمَا (ফাফাতাকনাহুমা): ‘রাৎক’ অর্থ একত্রিত, জমাটবদ্ধ বা সমজাতীয় অবস্থা; এবং ‘ফাতক’ অর্থ আলাদা করা, উন্মোচন করা বা সজোরে বিভক্ত করে সুশৃঙ্খল করা।
- الْمَاءِ (আল-মা-ই): প্রচলিত অর্থে পানি, তবে ধারণাগতভাবে এটি “জীবনের ভিত্তি বা জ্ঞানের সেই মৌলিক উৎস” যা প্রতিটি জীবন্ত বা সক্রিয় বিষয়কে পুষ্টি ও স্থায়িত্ব দেয়। [1, 2]
ধারণাভিত্তিক সঠিক অনুবাদ: “যারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান ও গোপন করে (كَفَرُوا), তারা কি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা করে না যে—এই মহাকাশসমূহ ও পৃথিবী (উচ্চতর জগত ও বৈষয়িক জগত) একসময়ে সম্পূর্ণ অবিচ্ছেদ্য ও জমাটবদ্ধ অবস্থায় ছিল (رَتْقًا), অতঃপর আমরা এদেরকে পৃথক ও উন্মোচিত করেছি (فَفَتَقْنَاهُمَا); এবং জীবন বা চেতনার মৌলিক উৎস (الْمَاءِ) থেকে প্রতিটি সক্রিয় ও জীবন্ত বিষয় সৃষ্টি করেছি? তবুও কি তারা পরম প্রত্যয়ে বিশ্বাস স্থাপন করবে না?
“
আয়াত ৩১
وَجَعَلْنَا فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِهِمْ وَجَعَلْنَا فِيهَا فِجَاجًا سُبُلًا لَّعَلَّهُمْ يَهْتَدُونَ
- رَوَاسِيَ (রাওয়াসিয়া): সাধারণত পর্বতমালা বলা হলেও, এর মূল অর্থ সমাজ বা ব্যবস্থাকে দৃঢ়তা প্রদানকারী শক্তিশালী ও অটল নিয়ামক বা ভিত্তি।
- سُبُلًا (সুবুলান): জীবনের পথ, কর্মপন্থা বা সত্য ও কল্যাণের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক ও বাস্তবিক উপায়সমূহ।
- يَهْتَدُونَ (ইয়াহ্তাদুন): হিদায়াত বা সঠিক দিকনির্দেশনা প্রাপ্ত হওয়া, জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পাওয়া।
ধারণাভিত্তিক সঠিক অনুবাদ: “এবং আমরা পৃথিবীতে সুদৃঢ় ও অটল ভিত্তি স্থাপন করেছি (رَوَاسِيَ), যেন তা সমাজ বা মানুষকে নিয়ে আন্দোলিত বা ভারসাম্যহীন না হয়ে পড়ে; এবং আমরা তার মধ্যে উন্মুক্ত ও প্রশস্ত কর্মপন্থা বা পথসমূহ (سُبُلًا) তৈরি করেছি, যাতে তারা সঠিক পথের দিশা লাভ করতে পারে (يَهْتَدُونَ)।
আয়াত ৩২
وَجَعَلْنَا السَّمَاءَ سَقْفًا مَّحْفُوظًا ۖ وَهُمْ عَنْ آيَاتِهَا مُعْرِضُونَ
- سَقْفًا مَّحْفُوظًا (সাকফাম মাহফুজা): একটি সুরক্ষিত ছাদ বা আবরণ। এটি প্রকৃতির সুরক্ষা বলয় এবং ঐশী নিয়মের সেই অভেদ্য সীমানা যা মানুষের জীবন ও সমাজকে বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা করে।
- آيَاتِهَا (আয়াতিহা): আল্লাহর সৃষ্টিজগতের প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী, প্রাকৃতিক নিয়ম এবং কিতাবের সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ।
- مُعْرِضُونَ (মু’রিযুন): ফাইলের ‘ARIZ’A শব্দের মূল বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী—উপেক্ষা করা, মুখ ফিরিয়ে নেওয়া বা সত্য সামনে উন্মোচিত থাকা সত্ত্বেও সেটিকে অগ্রাধিকার না দিয়ে অন্যমনস্ক থাকা।
এবং আমরা উচ্চতর জগত বা আকাশকে একটি সুসংরক্ষিত এবং সুরক্ষিত ছাদ বা নিরাপত্তা বলয় (سَقْفًا مَّحْفُوظًا) বানিয়েছি; অথচ তারা এর ভেতরের ও চারপাশের সুস্পষ্ট ঐশী নিদর্শনসমূহ (آيَاتِهَا) থেকে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে রাখছে বা সেগুলোকে অবজ্ঞা করছে (مُعْرِضُونَ)।”
“
আয়াত ৩৩
وَهُوَ الَّذِي خَلَقَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ ۖ كُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ
- اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ (আল-লাইলা ওয়ান-নাহার): রাত ও দিন; রূপক অর্থে অজ্ঞতা/অন্ধকারের পর্যায় এবং জ্ঞান/আলোর পর্যায়।
- فَلَكٍ (ফালাকিন): একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথ, গণ্ডি বা সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক ও গাণিতিক নিয়মাবলী।
- يَسْبَحُونَ (ইয়াসবাহুন): সাতার কাটা বা অবিরাম গতিশীল থাকা। ফাইলের ‘Sabah’ শব্দের মূল ধারণা অনুযায়ী—নিজের সমস্ত সত্ত্বা দিয়ে ঐশী নিয়মের অধীনে অবিরাম চেষ্টা ও কঠোর সংগ্রাম জারি রাখা।
“এবং তিনিই সেই সত্তা যিনি অন্ধকার ও আলোর পর্যায়সমূহকে (اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ) এবং শক্তি ও আলো প্রতিফলনের উৎসসমূহকে (সূর্য ও চন্দ্র) নিয়মের অধীনে এনেছেন; তাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ সুনির্দিষ্ট কক্ষপথে বা গণ্ডির মধ্যে (فَلَكٍ) অবিরাম গতিশীল ও সক্রিয়ভাবে সাঁতার কেটে চলেছে (يَسْبَحُونَ)।”
(
Kullun fī falakin yasbahūn)।”
আয়াত ৩৪
وَمَا جَعَلْنَا لِبَشَرٍ مِّن قَبْلِكَ الْخُلْدَ ۖ أَفَإِن مِّتَّ فَهُمُ الْخَالِدُونَ
- لِبَشَرٍ (লি-বাশারিন): কিতাবের পরিভাষায় মানুষের কেবল বাহ্যিক, শারীরিক বা দৃশ্যমান অবয়ব বা মানব রূপ।
- الْخُلْدَ / الْخَالِدُونَ (আল-খুলদ / আল-খালিদুন): কোনো একটি অবস্থায় স্থবির হয়ে থাকা, চিরস্থায়ী হওয়া বা অপরিবর্তনীয় থাকা।
“এবং আপনার পূর্বেও কোনো দৃশ্যমান মানব রূপের (لِبَشَرٍ) জন্য আমরা এই বৈষয়িক জীবনে চিরস্থায়ী বা অপরিবর্তনীয় অবস্থা (الْخُلْدَ) নির্ধারণ করিনি; অতএব আপনার যদি রূপান্তর বা মৃত্যু ঘটে, তবে কি তারা চিরকাল অপরিবর্তনীয় অবস্থায় টিকে থাকবে (الْخَالِدُونَ)?
আয়াত ৩৫
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۗ وَنَبْلُوكُم بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ فِتْنَةً ۖ وَإِلَيْنَا تُرْجَعُونَ
- نَفْسٍ (নাফসিন): মানুষের নিজস্ব চেতনা, মন বা ব্যক্তিত্ব।
ذَائِقَةُ (যাইকাতু): স্বাদ নেওয়া বা ভোগ করা; এর মূল অর্থ হলো—কোনো কিছুর প্রভাব সরাসরি ও পুরোপুরি নিজের ওপর অনুভব করা বা তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হওয়া- الْمَوْتِ (আল-মাউত): চেতনার নিষ্ক্রিয়তা, স্থবিরতা বা চরম কুফরের কারণে আত্মিক মৃত্যু।
- وَنَبْلُوكُم (ওয়া নাবলুকুম): কোনো কিছুর ভেতরের গুণাগুণ যাচাই করার জন্য পরীক্ষা বা মূল্যায়নের প্রক্রিয়া।
- بِالشَّরِّ وَالْخَيْرِ (বিশ-শাররি ওয়াল-খাইর): ক্ষতিকর/ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি এবং কল্যাণকর/উন্নত অবস্থা।
- “প্রত্যেকটি ব্যক্তি-চেতনাকেই (نَفْسٍ) তার স্থবিরতার (الْمَوْتِ) চূড়ান্ত পরিণতি ভোগ করতে হবে গ্রহণ করতে হবে; এবং আমরা ক্ষতিকর-ভারসাম্যহীন অবস্থা ও কল্যাণকর-উন্নত অবস্থার (بِالشَّرِّ وَالْخَيْرِ) মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে তোমাদের ভেতরের গুণাগুণ মূল্যায়ন করা হয় (وَنَبْلُوكُم) পরীক্ষার মাধ্যমে; এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের নিয়মেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটবে।”
আয়াত ৩৬
وَإِذَا رَآكَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِن يَتَّخِذُونَكَ إِلَّا هُزُوًا أَهَٰذَا الَّذِي يَذْكُرُ آلِهَتَكُمْ وَهُمْ بِذِكْرِ الرَّحْمَٰنِ هُمْ كَافِرُونَ
- رَآكَ (রা’আকা): এর মূল ধাতু R-A-Y (رأي)। এর অর্থ কেবল চোখ দিয়ে কোনো ব্যক্তিকে বা বস্তুকে ‘অবলোকন বা পর্যবেক্ষণ করা’ নয়। এর প্রকৃত অর্থ হলো—কারও মতাদর্শ, চিন্তাধারা, ওহীর বার্তা বা মিশনকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বিচার করা, দেখা বা অনুধাবন করা
- أَهَٰذَا (আ-হাযা): ‘এটি কি?’ বা ‘এই কি সেই ধারা/আদর্শ?’ (এখানে কেবল একজন ব্যক্তি নয়, বরং তার প্রচারিত ওহীর বিপ্লবী বার্তা ও সংস্কারের ধারাকে নির্দেশ করা হচ্ছে)
- كَفَرُوا / كَافِرُونَ (কাফারু / কাফিরুন): সত্য সামনে আসার পরও তা ঢেকে রাখা, অস্বীকার করা বা অন্ধ অনুকরণে মগ্ন থাকা।
- هُزُوًا (হুজুওয়ান): কোনো দায়িত্বশীল বিষয়কে হালকাভাবে নেওয়া, উপহাস বা তামাশা করা।
- آلِهَتَكُمْ (আলিহাতাকুম): তোমাদের সেইসব কর্তৃত্ব বা মানব-রচিত নিয়ম, যাদের আইন তোমরা আল্লাহর আইনের সমকক্ষ করে অন্ধভাবে মেনে চলো।
يَذْكُرُ (ইয়াজকুরু): —ত্রুটি বা বাস্তব সত্য উন্মোচন করা, জনসমক্ষে বিশ্লেষণ করা, বা অসারতা উল্লেখ করে চ্যালেঞ্জ করা।অনুবাদ: “এবং যারা সত্যকে গোপন ও অস্বীকার করে (كَفَرُوا), তারা যখন প্রচারিত ওহীর মতাদর্শ বা মিশনকে অনুধাবন ও বিচার করে (وَإِذَا رَآكَ), তখন তারা কেবল উপহাস বা হালকা বিষয় (هُزُوًا) হিসেবেই গ্রহণ করে এবং বলে, ‘এই কি সেই আদর্শ বা বার্তা (أَهَٰذَا الَّذِي), যা তোমাদের তৈরি করা মনগড়া আইন ও শাসন-কর্তৃত্বের (آলِهَتَكُمْ) অসারতা বা ত্রুটিগুলো উন্মোচন করে আলোচনা করছে?’ অথচ তারা নিজেরা পরম দয়াময়ের ঐশী বিধান বা স্মারক অনুধাবন করতে সম্পূর্ণ অস্বীকৃতি জানায় (كَافِرُونَ)।
আয়াত ৩৭
خُلِقَ الْإِنسَانُ مِنْ عَجَلٍ ۚ سَأُرِيكُمْ آيَاتِي فَلَا تَسْتَعْجِلُونِ
- عَجَلٍ / تَسْتَعْجِلُونِ (আজালিন / তাস্তাজিলুন): আপনার আপলোড করা ভোকাবুলারি ফাইলের ৪ নম্বর পৃষ্ঠার ব্যাখ্যা অনুযায়ী—ধৈর্যের অভাব হওয়া, যাচাই না করে হঠকারিতা করা বা কোনো কিছুতে অধীর হয়ে তাড়াহুড়ো করা।
مْ (সা-উরিকুম): এর মূল ধাতু R-A-Y (رأي)। এর সাথে যুক্ত سَ (সিন) বর্ণটি কেবল দূরবর্তী ভবিষ্যৎ নির্দেশ করে না, বরং এটি একটি অকাট্য নিশ্চয়তা এবং স্থায়ী বাস্তবতা (Certainty & Continuous Exposure) প্রকাশ করে। এর প্রকৃত অর্থ হলো—“আমি তোমাদের সামনে স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করছি/রেখেছি” বা “আমি তোমাদের দৃষ্টিগোচর করাচ্ছি- الْإِنسَانُ (আল-ইনসান): সামগ্রিকভাবে মানবজাতি বা মানব সমাজ।
- آيَاتِي (আয়াতি): আল্লাহর অকাট্য প্রাকৃতিক নিয়ম এবং কিতাবের সুস্পষ্ট নির্দেশনাবলী।
“”মানব সমাজ বা চেতনাকে তীব্র গতিশীলতা ও ক্রমাগত পরিবর্তনশীল পর্যায় দিয়ে (مِنْ عَجَلٍ) সৃষ্টি করা হয়েছে; আমি তোমাদের সামনে আমার অকাট্য নিয়ম ও নিদর্শনসমূহ প্রতিনিয়ত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত করেই রাখছি, অতএব তোমরা আমার বিধানের চূড়ান্ত পরিণতির জন্য এই প্রগতির গতিবেগকে বাধাগ্রস্ত বা বিকৃত করার চেষ্টা করো না (فَلَا تَسْتَعْجِلُونِ)।”
আয়াত ৩৮ (Verse 21:38)
وَيَقُولُونَ مَتَىٰ هَٰذَا الْوَعْدُ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ
- الْوَعْدُ (আল-ওয়াদ): ঐশী হিসাব-নিকাশ, কর্মের অকাট্য পরিণতি বা প্রতিশ্রুত সময়কাল।
- صَادِقِينَ (সাদিকিন): যারা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত, আন্তরিক এবং বাস্তবনিষ্ঠ।
- অনুবাদ: “এবং তারা প্রশ্ন করে, ‘যদি তোমরা তোমাদের দাবিতে সত্যবাদী ও আন্তরিক হও (صَادِقِينَ), তবে এই কর্মের চূড়ান্ত পরিণতির প্রতিশ্রুতি বা ঐশী হিসাব-নিকাশ কখন বাস্তবায়িত হবে (الْوَعْدُ)?’”
আয়াত ৩৯ (Verse 21:39)
لَوْ يَعْلَمُ الَّذِينَ كَفَرُوا حِينَ لَا يَكُفُّونَ عَن وُجُوهِهِمُ النَّارَ وَلَا عَن ظُهُورِهِمْ وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ
- لَا يَكُفُّونَ (লা ইয়াকুফফুন): কোনো কিছুকে প্রতিরোধ করতে না পারা বা রুখে দিতে না পারা।
- النَّارَ (আন-নার): রূপক অর্থে ভুল কর্মপন্থার কারণে সমাজে বা জীবনে তৈরি হওয়া ধ্বংসাত্মক আগুন, দুর্ভোগ ও অশান্তি।
حِينَ (হীনা): এটি কেবল কাল বা সময় (Time) নয়। ডিকশনারি এবং WQT পরিভাষায় এর প্রকৃত অর্থ হলো—একটি সুনির্দিষ্ট অবস্থা, পরিস্থিতি, বা সংকটের দশা (A specific state, phase, or condition of crisis) যা মানুষের ভুল কর্মপন্থার অবধারিত ফসল হিসেবে সামনে এসে দাঁড়ায়। - يُنصَرُونَ (ইউনসারুন): সাহায্যপ্রাপ্ত হওয়া বা কোনো বিপর্যয় থেকে সুরক্ষা পাওয়া।
ه(উজুহ): এর মূল ধাতু W-J-H (وجه)। ফাইলের ধারণা অনুযায়ী, এর অর্থ কেবল শারীরিক মুখ নয়, বরং এটি মানুষের প্রধান লক্ষ্য, সামাজিক মর্যাদা, নেতৃত্ব, আদর্শিক পরিচিতি বা সম্মুখসারির শক্তি (Leadership/Identities/Directions)। - ظُهُورِ (জুহুর): এর মূল ধাতু Z-H-R (ظهر)। এর প্রকৃত অর্থ হলো—কোনো কিছুর পেছনের শক্তি, অতীত ঐতিহ্য, ব্যাক-আপ সাপোর্ট, সুরক্ষার দেয়াল বা পৃষ্ঠপোষকতা (Backing/Support structures/Past traditions) যা মানুষকে টিকিয়ে রাখে।
- “যারা সত্যকে গোপন ও প্রত্যাখ্যান করেছে (الَّذِينَ كَفَرُوا), তারা নিজেদের কুফরির কারণে সৃষ্ট সেই অবধারিত বিপর্যয়কর পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন (لَوْ يَعْلَمُ… حِينَ)—যখন তারা নিজেদের সামাজিক মর্যাদা, নেতৃত্ব ও আদর্শিক পরিচয় থেকে (عَن وُجُوهِهِمُ)] ধ্বংসের এই আগুন ও দুর্ভোগকে (النَّارَ) প্রতিরোধ করতে পারবে না, আর না পারবে তাদের অতীত ঐতিহ্য ও পেছনের শক্তিসমূহকে রক্ষা করতে (وَلَا عَن ظُهُورِهِمْ); এবং তাদের কোনো রকম বাহ্যিক সাহায্য বা সুরক্ষাও দেওয়া হবে না (وَلَا هُمْ يُنصَرُونَ)।”
আয়াত ৪০ (Verse 21:40)
আরবি পাঠ: بَلْ تَأْتِيهِم بَغْتَةً فَتَبْهَتُهُمْ فَلَا يَسْتَطِيعُونَ رَدَّهَا وَلَا هُمْ يُنظَرُونَ
-
- بَغْتَةً (বাগাতাতান): সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে, আকস্মিকভাবে বা অসচেতন অবস্থায়।
- فَتَبْهَتُهُمْ (ফাতাবাহাতুহুম): বুদ্ধিকে স্তম্ভিত বা অচল করে দেওয়া, চরম কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে ফেলা।
- فَلَا يَسْتَطِيعُونَ رَدَّهَا (ফালা ইয়াসতাতীউনা রাদ্দাহা): সেটিকে ফিরিয়ে দেওয়া বা প্রতিহত করার ন্যূনতম ক্ষমতা বা সক্ষমতা না থাকা।
- অনুবাদ: “বরং সেই দুর্ভোগ বা কর্মের অকাট্য পরিণতি তাদের ওপর সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিকভাবে আসবে (بَغْتَةً), যা তাদের বুদ্ধিকে স্তব্ধ ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেবে (فَتَبْهَتُهُمْ); অতঃপর তা প্রতিহত বা ফিরিয়ে দেওয়ার কোনো ক্ষমতাই তাদের থাকবে না (فَلَا يَسْتَطِيعُونَ رَدَّهَا) এবং তাদের কোনো রকম অবকাশও দেওয়া হবে না।”
আয়াত ৪১ (Verse 21:41)
আরবি পাঠ: وَلَقَدِ اسْتُهْزِئَ بِرُسُلٍ مِّن قَبْلِكَ فَحَاقَ بِالَّذِينَ سَخِرُوا مِنْهُم مَّا كَانُوا بِهِ يَسْتَهْزِئُونَ
-
- اسْتُهْزِئَ / يَسْتَهْزِئُونَ (উস্তুহজিআ / ইয়াস্তাহজিউন): ঐশী আইন বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল বিষয়সমূহকে হালকাভাবে নেওয়া, তাচ্ছিল্য করা বা উপহাস করা।
- بِرُسُلٍ (বি-রুসুলিন): আল্লাহর প্রেরিত বার্তাবাহক বা বার্তা বহনকারী ঐশী নির্দেশনাবলী।
- فَحَاقَ (ফাহাকা): কর্মের অকাট্য পরিণতি চারপাশ থেকে পরিবেষ্টিত করা, গ্রাস করা বা বৃত্তের মতো অবরুদ্ধ করে ফেলা।
- অনুবাদ: “এবং (এটি নতুন কিছু নয়) আপনার পূর্বেও বহু রসূল বা ঐশী বার্তার সাথে (بِرُسُلٍ) উপহাস ও তাচ্ছিল্য করা হয়েছিল (اسْتُهْزِئَ); অতঃপর যারা সেগুলোকে নিয়ে উপহাস বা তামাশা করত, তারা যা নিয়ে উপহাস করত (يَسْتَهْزِئُونَ) সেই কর্মের কুফলই তাদেরকে চারপাশ থেকে গ্রাস করে ফেলেছিল (فَحَاقَ)।”
আয়াত ৪২ (Verse 21:42)
আরবি পাঠ: قُلْ مَن يَكْلَؤُكُم بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ مِنَ الرَّحْمَٰنِ ۗ بَلْ هُمْ عَن ذِكْرِ رَبِّهِم مُّعْرِضُونَ
- بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ (বিল-লাইলি ওয়ান-নাহার): রূপক অর্থে অজ্ঞতা-অন্ধকার ও জ্ঞান-আলোর উভয় পরিস্থিতিতেই।
- ذِكْرِ (জিকর): ঐশী আয়াতসমূহকে বোঝা, অনুধাবন করা, তার বাস্তবায়ন করা এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়া।
- مُعْرِضُونَ (মু’রিযুন): ফাইলের ১৪ নম্বর পৃষ্ঠার ব্যাখ্যা অনুযায়ী—সত্য সামনে উন্মোচিত থাকা সত্ত্বেও সেটিকে নিজের মনোযোগ বা অগ্রাধিকারের তালিকার বাইরে রেখে অবজ্ঞা করা।
- অনুবাদ: “আপনি প্রশ্ন করুন, ‘কে তোমাদেরকে অজ্ঞতা-অন্ধকার ও জ্ঞান-আলোর সকল অবস্থায় (بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ) পরম দয়াময় (আল্লাহর অমোঘ প্রাকৃতিক শাস্তি) থেকে রক্ষা করতে পারে?’ বরং তারা তো তাদের প্রতিপালকের ঐশী বিধান বা অনুধাবন-স্মারক (ذِكْرِ) থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখছে বা অবজ্ঞা করছে (مُعْرِضُونَ)।”
আয়াত ৪৩ (Verse 21:43)
আরবি পাঠ: أَمْ لَهُمْ آلِهَةٌ تَمْنَعُهُم مِّن دُونِنَا ۚ لَا يَسْتَطِيعُونَ نَصْرَ أَنفُسِهِمْ وَلَا هُم مِّنَّا يُصْحَبُونَ
- آلِهَةٌ (আলিহাতুন): মনগড়া আইন ও মানব-রচিত শাসন বা কর্তৃত্ব, যাদেরকে আল্লাহর আইনের সমকক্ষ বিবেচনা করা হয়।
- نَصْرَ (নাসরা): সুরক্ষা প্রদান, সাহায্য করা বা বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করা।
- অনুবাদ: “তবে কি আমাদের ব্যতিরেকে তাদের এমন কোনো মনগড়া আইন ও শাসক-কর্তৃত্ব (آلِهَةٌ) আছে, যা তাদেরকে বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে পারে? অথচ সেই শক্তিগুলো তো নিজেদের সত্ত্বাকেই কোনো সুরক্ষা বা সাহায্য করতে সক্ষম নয় (لَا يَكُفُّونَ নَصْرَ أَنفُسِهِمْ) এবং আমাদের পক্ষ থেকেও তাদেরকে কোনো সহমর্মিতা বা নিরাপত্তা দেওয়া হবে না।”
আয়াত ৪৪ (Verse 21:44)
আরবি পাঠ: بَلْ مَتَّعْنَا هَٰؤُلَاءِ وَآبَاءَهُمْ حَتَّىٰ طَالَ عَلَيْهِمُ الْعُمُرُ ۗ أَفَلَا يَرَوْنَ أَنَّا نَأْتِي الْأَرْضَ نَنقُصُهَا مِنْ أَطْرَافِهَا ۚ أَفَهُمُ الْغَالِبُونَ
- وَآبَاءَهُمْ (ওয়া আবা-আহুম): বংশপরম্পরায় পূর্বপুরুষ বা ফোরফাদারদের থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ, চিন্তা বা প্রথা।
نَأْتِي (না’তী): এর মূল ধাতু A-T-Y (أتي)। —এটি কোনো ব্যক্তির আগমন নয়, বরং এটি হলো “উৎস থেকে কোনো নিয়ম কার্যকর হওয়া, প্রকাশিত হওয়া বা অবধারিতভাবে ধাবিত হওয়া”। যখন এটি ‘ভূমির সংকোচন’ বা ক্ষমতার পতনকে নির্দেশ করে, তখন এর অর্থ হলো—“প্রাকৃতিক বিচার বা অমোঘ নিয়মের অমোঘ প্রভাব ধাবিত হচ্ছে”। - الْأَرْضَ (আল-আরদ্ব): বৈষয়িক জগৎ, জমি, দেশ বা মানব সমাজের ভিত্তিভূমি।
- مِنْ أَطْرَافِهَا (মিন আতরাফিহা): প্রান্তসমূহ থেকে, চারপাশ থেকে বা সীমানা সংকুচিত করার মাধ্যমে।
- অনুবাদ: “বরং আমরাই এদেরকে এবং এদের পূর্বপুরুষদেরকে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘস্থায়ী রসদ ও কাঠামোগত ভিত্তি প্রদান করেছিলাম,, এভাবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে; কিন্তু তারা কি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখে না যে—নিশ্চয়ই আমাদের অমোঘ নিয়মের প্রভাব সমাজ বা বৈষয়িক ভিত্তির ওপর এমনভাবে ধাবিত হচ্ছে (أَنَّا نَأْتِي الْأَرْضَ), যা এর চারপাশ বা প্রান্তসমূহ থেকে একে সংকুচিত করে আনছে (نَنقُصُهَا مِنْ أَطْرَافِهَا) তবুও কি তারা মনে করে যে তারাই বিজয়ী বা প্রভাবশালী (الْغَالِبُونَ)?”
আয়াত ৪৫ (Verse 21:45)
আরবি পাঠ: قُلْ إِنَّمَا أُنذِرُكُم بِالْوَحْيِ ۚ وَلَا يَسْمَعُ الصُّمُّ الدُّعَاءَ إِذَا مَا يُنذَرُونَ
- بِالْوَحْইِ (বিল-ওয়াহয়ি): আল্লাহর সুনির্দিষ্ট ঐশী বাণী বা প্রত্যাদেশ।
- الصُّمُّ (আস-সুম্মু): ফাইলের ১২ নম্বর পৃষ্ঠা অনুযায়ী—যারা নিজেদের চিন্তাশক্তি বা জ্ঞান গ্রহণ করার মানসিক ক্ষমতাকে অবরুদ্ধ বা বধির করে রেখেছে।
- অনুবাদ: ” ঘোষণা করুন, ‘আমি তো তোমাদেরকে কেবল ঐশী প্রত্যাদেশের (بِالْوَحْيِ) ভিত্তিতেই সতর্ক করছি।’ কিন্তু যারা সত্য গ্রহণের ক্ষমতাকে বধির করে রেখেছে (الصُّمُّ), তাদেরকে যখন সতর্ক করা হয় তখন তারা সেই সত্যের আহ্বান শোনে না বা অনুধাবন করতে পারে না।”
আয়াত ৪৬ (Verse 21:46)
আরবি পাঠ: وَلَئِن مَّسَّتْهُمْ نَفْحَةٌ مِّنْ عَذَابِ رَبِّكَ لَيَقُولُنَّ يَا وَيْلَنَا إِنَّا كُنَّا ظَالِمِينَ
- عَذَابِ (আজাবি): ভুল পথের অবহেলা বা কুফরের কারণে জীবনে নেমে আসা দুর্ভোগ, শাস্তি বা দুর্দশা।
- ظَالِمِينَ (জ্বালিমীন): যারা ঐশী আইন লঙ্ঘন করে নিজেদের ওপর ও সমাজের ওপর ভারসাম্যহীনতা চাপিয়ে দিয়েছে।
نَفْحَةٌ (নাফহাতুন): এর মূল অর্থ কোনো হালকা ‘ঝাপটা’ বা বাতাস নয়। এটি হলো কোনো সুপ্ত বা অবরুদ্ধ শক্তির “আকস্মিক ও তীব্র বহিঃপ্রকাশ বা তীব্র আঘাত” (A sudden outburst or intense impact)। যখন এটি শাস্তির (عَذَابِ) সাথে যুক্ত হয়, তখন এর অর্থ দাঁড়ায়—ভুল কর্মপন্থার অবধারিত কুফলের এমন এক “তীব্র বা আকস্মিক বিস্ফোরণ” যা মানুষকে স্তব্ধ করে দেয়। - এবং যদি তাদের প্রতিপালকের অবধারিত শাস্তির বা দুর্ভোগের কোনো তীব্র বিস্ফোরণ বা আকস্মিক আঘাত তাদেরকে স্পর্শ করে (وَلَئِن مَّسَّتْهُمْ نَفْحَةٌ مِّنْ عَذَابِ رَبِّكَ), তবে তারা চিৎকার করে বলবে, ‘হায় আমাদের ধ্বংস! নিশ্চয়ই আমরা সীমালঙ্ঘনকারী ও ভারসাম্য নষ্টকারী ছিলাম (ظَالِمِينَ)।’”
আয়াত ৪৭ (Verse 21:47)
আরবি পাঠ: وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ۖ وَإِن كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ۗ وَكَفَىٰ بِنَا حَاسِبِينَ
- الْمَوَازِينَ (আল-মাওয়াজিন): ভারসাম্য বা ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা / নিখুঁত পরিমাপক ব্যবস্থা।
- الْقِسْطَ (আল-কিসত্ব): ইকুয়ালিটি (Equality) বা সাধারণ সমতার চেয়েও উচ্চতর বিষয়, যা হলো ইকুইটি (Equity) বা যোগ্যতা ও নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করে নিখুঁত ইনসাফ করা।
- أَتَيْنَا (আতাইনা): উৎস থেকে সামনে আনা, হাজির করা বা প্রকাশ করা।
الْقِيَامَةِ (আল-কিয়ামাহ): এর মূল ধাতু Q-W-M (قوم)। এর প্রকৃত অর্থ হলো—কোনো ব্যবস্থার “উত্থান হওয়া, সোজা হয়ে দাঁড়ানো, বা সত্য ও ন্যায়ের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া” (Rising up / Standing firm / Systemic establishment)। - “এবং আমরা সত্য ও ন্যায়ের ওপর চূড়ান্ত উত্থান বা প্রতিষ্ঠার এই বিপ্লবের পর্যায়কালে (لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ) নিখুঁত সাম্য ও ইনসাফের পরিমাপক ব্যবস্থা স্থাপন করি (وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ), ফলে কোনো ব্যক্তি-চেতনার প্রতি সামান্যতম অন্যায় করা হবে না; যদি কোনো আমল সরিষার দানা পরিমাণও হয়, তবে তা আমরা তার উৎস থেকে সামনে নিয়ে আসি; এবং নিখুঁত হিসাব গ্রহণকারী হিসেবে আমাদের অমোঘ নিয়মের ব্যবস্থাপনাই যথেষ্ট।”
আয়াত ৪৮ (Verse 21:48)
وَلَقَدْ آتَيْنَا مُوسَىٰ وَهَارُونَ الْفُرْقَانَ وَضِيَاءً وَذِكْرًا لِّلْمُتَّقِينَ
-
- الْفُرْقَانَ (আল-ফুরকান): সত্য ও মিথ্যার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যকারী মানদণ্ড।
- ضِيَاءً (দিয়া-আন): তীব্র আলো বা উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা যা চারপাশের অন্ধকার দূর করে।
- وَذِكْرًا (ওয়া জিকরান): অনুধাবন, বাস্তবায়ন ও কিতাবের দিকনির্দেশনা।
- لِّلْمُتَّقِينَ (লিল-মুত্তাকীন): যারা আল্লাহর নিয়ম অমান্য করার ক্ষতি থেকে বাঁচতে সর্বদা সচেতন ও সতর্ক থাকে।
- অনুবাদ: “এবং আমরা অবশ্যই মুসা ও হারুনকে সত্য-মিথ্যার স্পষ্ট পার্থক্যকারী মানদণ্ড (الْفُرْقَانَ), একটি উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা (ضِيَاءً) এবং আইন সচেতন আত্মরক্ষাকারীদের জন্য এক অনুস্মরণীয় দিকনির্দেশনা (وَذِكْرًا لِّلْمُتَّقِينَ) প্রদান করেছিলাম।”
আয়াত ৪৯ (Verse 21:49)
الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُم بِالْغَيْبِ وَهُم مِّنَ السَّاعَةِ مُشْفِقُونَ
بِالْغَيْبِ (বিল-গাইবি): যা সরাসরি পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা দৃশ্যমান নয়, অর্থাৎ অদৃশ্যে থেকেও ঐশী নিয়মের প্রতি অবিচল আস্থা রাখা।
السَّاعَةِ (আস-সা’আতি): কর্মের হিসাবের সেই নির্দিষ্ট মুহূর্ত বা বিপ্লবের সময়কাল।
- অনুবাদ: “(মুত্তাকীন তারাই) যারা তাদের প্রতিপালকের নিয়মকে অদৃশ্যে বা পরিণতিসমূহ তাদের বর্তমান চাক্ষুষ অভিজ্ঞতার বাইরে বা অগোচরে থাকা সত্ত্বেও (بِالْغَيْبِ) সেটিকে গভীরভাবে সমীহ ও সচেতনতার সাথে বিবেচনা করে চলে (يَخْشَوْنَ رَبَّهُم) এবং তারা কর্মের হিসাবের সেই নির্দিষ্ট মুহূর্ত বা বিপ্লবের সময়কাল সম্পর্কে (السَّاعَةِ) সর্বদা সতর্ক ও শংকিত থাকে।”
আয়াত ৫০ (Verse 21:50)
আরবি পাঠ: وَهَٰذَا ذِكْرٌ مُّبَارَكٌ أَنزَلْنَاهُ ۚ أَفَأَنتُمْ لَهُ مُنكِرُونَ
- ذِكْرٌ مُّبَارَكٌ (জিকরুম মুবারাকুন): অত্যন্ত কল্যাণকর, চির-সমৃদ্ধ এবং দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ঐশী স্মারক বা জীবন বিধান।
- مُنكِرُونَ (মুনকিরুন): কোনো কিছুকে জেনে-বুঝে অস্বীকার করা বা প্রত্যাখ্যান করা।
- অনুবাদ: “এবং এই (কোরআন) হচ্ছে একটি অত্যন্ত বরকতময় ও চির-সমৃদ্ধ জীবন বিধান বা স্মারক (ذِكْرٌ مُّبَارَكٌ), যা আমরা অবতীর্ণ করেছি; তবুও কি তোমরা একে জেনে-বুঝে অস্বীকার বা প্রত্যাখ্যান করবে (مُنكِرُونَ)?”
আয়াত ৫১ (Verse 21:51)
আরবি পাঠ: وَلَقَدْ آتَيْنَا إِبْرَاهِيمَ رُشْدَهُ مِن قَبْلُ وَكُنَّا بِهِ عَالِمِينَ
- رُشْدَهُ (রুশদাহু): সত্যের সঠিক জ্ঞান, দূরদর্শিতা, বুদ্ধিমত্তা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
ইব্রাহীম (إِبْرَاهِيمَ): রূপক অর্থে, সমাজের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি, মানবিক কল্যাণ ও সংস্কারের এক সুউচ্চ ও পিতৃসুলভ শক্তির প্রতীক। - عَالِمِينَ (আ-লিমীন): ফাইলের ৮-৯ নম্বর পৃষ্ঠা অনুযায়ী—মহাবিশ্বের সবকিছু সম্পর্কে যিনি অবগত, জ্ঞানের পরম উৎস এবং বিশেষজ্ঞদেরও যিনি সম্যক পরিজ্ঞাত।
آتَيْنَا (আতায়না): এর মূল ধাতু A-T-Y (أتي)। আপনার ভোকাবুলারি ফাইলের ১৬ নম্বর পৃষ্ঠা অনুযায়ী—এটি কোনো স্থির বা নিষ্ক্রিয় বিষয় নয়। এর প্রকৃত অর্থ হলো—“উৎস থেকে কোনো বিশেষ যোগ্যতা, আইন বা শক্তি সরাসরি গতিশীলভাবে প্রদান করা, নিয়োজিত করা বা ধাবিত করানো” (To actively bestow or structurally provision from the source)। - আর আমরা অবশ্যই ইতিপূর্বে উদার মানবিক কল্যাণ ও প্রবৃদ্ধির শক্তিকে (ইব্রাহীম) তার নিজস্ব রুশদাহু (সঠিক পথে চলার যোগ্যতা, সত্য-মিথ্যার বিবেকবুদ্ধি ও মানসিক পরিপক্বতা) দান করেছিলাম; এবং আমরা তার (যোগ্যতা ও আন্তরিকতা) সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে অবগত ছিলাম। (عَالِمِينَ)।”
আয়াত ৫২ (Verse 21:52)
আরবি পাঠ: إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا هَٰذِهِ التَّمَاثِيلُ الَّتِي أَنتُمْ لَهَا عَاكِفُونَ
لِأَبِيهِ (লি-আবীহি): কেবল জন্মদাতা পিতা নয়, বরং বংশপরম্পরায় পূর্বপুরুষ, সমাজ বা প্রথার আদি উৎস।
- التَّمَاثِيلُ (আৎ-তামা-সীলু): রূপক অর্থে এমন কাল্পনিক ধারণা, নির্জীব প্রতীক বা অবাস্তব নিয়ম যা মানুষ নিজে কল্পনা করে গড়ে তোলে।
- عَاكِفُونَ (আ-কিফুন): কোনো কিছুর সাথে স্থায়ীভাবে সংযোগ রক্ষা করা, চরম ভক্তি ও অন্ধ আনুগত্যের সাথে কোনো প্রথার সাথে জড়িয়ে থাকা।
- যখন সে তার প্রাচীন সমাজপতি ও প্রথার আদি উৎসের (لِأَبِيهِ) এবং তার সম্প্রদায়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলে—’এইসব কাল্পনিক ধারণা ও নির্জীব ঐতিহ্যগুলো কী (التَّمَاثِيلُ), যাদের অন্ধ ভক্তিতে তোমরা স্থায়ীভাবে মগ্ন হয়ে আছ (عَاكِفُونَ)?
আয়াত ৫৩ (Verse 21:53)
আরবি পাঠ: قَالُوا وَجَدْنَا آبَاءَنَا لَهَا عَابِدِينَ
- آبَاءَنَا (আ-বা-আনা): উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত প্রথা বা পূর্বপুরুষদের ধারা।
- عَابِدِينَ (আ-বিদীন): এখানে অন্ধ অনুসরণ, হুকুম তামিল করা বা অবাস্তব নিয়ম ও কষ্টের মধ্য দিয়ে কোনো ব্যবস্থার দাসত্ব করা।
- অনুবাদ: “তারা উত্তর দিল, ‘আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে (آبَاءَنَا) এই মনগড়া নিয়ম ও প্রথার দাসত্ব বা অন্ধ অনুসরণ করতে (عَابِدِينَ) দেখেছি।’”
আয়াত ৫৪ (Verse 21:54)
আরবি পাঠ: قَالَ لَقَدْ كُنتُمْ أَنتُمْ وَآبَاءُكُمْ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ
- ضَلَالٍ مُّبِينٍ (দ্বালালিম মুবীন): একেবারে প্রকাশ্য সত্যচ্যুতি, ভুল পথ বা মূল ভিত্তি থেকে বিচ্যুত হওয়া।
- অনুবাদ: “সে (ইব্রাহিম) বলল, ‘নিশ্চয়ই তোমরা নিজেরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরাও (آبَاءُكُمْ) এক স্পষ্ট সত্যচ্যুতি ও বিভ্রান্তির (ضَلَالٍ مُّبِينٍ) মধ্যে নিমজ্জিত আছ।’”
আয়াত ৫৫ (Verse 21:55)
আরবি পাঠ: قَالُوا أَجِئْتَنَا بِالْحَقِّ أَمْ أَنتَ مِنَ اللَّاعِبِينَ
- بِالْحَقِّ (বিল-হাক্বি): অকাট্য বাস্তব সত্য, ন্যায়সংগত দাবি বা সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব।
- اللَّاعِبِينَ (আল-লা-ইবীন): যারা কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য ছাড়া সময় নষ্ট করে, দায়িত্বজ্ঞানহীন বিনোদনকারী।
- অনুবাদ: “তারা বলল, ‘তুমি কি আমাদের কাছে কোনো অকাট্য বাস্তব সত্য ও দায়িত্ব নিয়ে এসেছ (بِالْحَقِّ), নাকি তুমি কেবল পরিহাসকারী বা উদ্দেশ্যহীনদের (اللَّاعِبِينَ) অন্তর্ভুক্ত?’”
আয়াত ৫৬ (Verse 21:56)
আরবি পাঠ: قَالَ بَل رَّبُّكُمْ رَبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الَّذِي فَطَرَهُنَّ وَأَنَا عَلَىٰ ذَٰلِكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ
- রَبُّكُمْ (রাব্বুকুম): যিনি নিখিল বিশ্ব ও মানব সত্তার ক্রমবিকাশ ও পুষ্টির লালনকর্তা (Rabobiat)।
- فَطَرَهُنَّ (ফাতারাহুন্না): কোনো কিছুকে কোনো পূর্ব-নমুনা ছাড়া প্রথমবার অস্তিত্বে আনা বা একটি সুনির্দিষ্ট সুপ্ত প্রতিভা/প্রকৃতি দিয়ে তৈরি করা।
- الشَّاهِدِينَ (আশ-শাহেদ্বীন): যারা জ্ঞান, বুদ্ধি ও চাক্ষুষ প্রমাণের ভিত্তিতে সত্যের সাক্ষ্য দেয়।
- অনুবাদ: “সে বলল, ‘নয়, বরং তোমাদের লালনকর্তা (رَبُّكُمْ) হলেন মহাকাশসমূহ ও পৃথিবীর একমাত্র প্রতিপালক, যিনি কোনো পূর্ব-নমুনা ছাড়াই এদেরকে সুনির্দিষ্ট প্রকৃতি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন (فَطَرَهُنَّ); এবং আমি নিজেই এই পরম সত্যের পক্ষে সাক্ষী (الشَّاهِدِينَ)।’”
আয়াত ৫৭ (Verse 21:57)
আরবি পাঠ: وَتَاللَّهِ لَأَكِيدَنَّ أَصْنَامَكُمْ بَعْدَ أَن تُوَلُّوا مُدْبِرِينَ
- لَأَكِيدَنَّ (লা-আকীদন্না): কোনো ভুল বা ক্ষতিকর প্রথা ভেঙে দেওয়ার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক, মনস্তাত্ত্বিক বা বাস্তব পরিকল্পনা করা।
- أَصْنَامَكُمْ (আছনামাকুম): তোমাদের সেইসব প্রাণহীন ঐতিহ্য, অসার মতবাদ বা মূর্তি যা তোমাদের চিন্তাকে অবরুদ্ধ করে রাখে।
- مُدْبِرِينَ (মুদবিরীন): কোনো বিষয়ের উৎস, শক্তি বা উপায় থেকে মুখ ফিরিয়ে চলে যাওয়া।
- এবং আল্লাহর নিয়মকে সাক্ষী রেখে বলছি! তাদের নিজেদের মূল সত্য বা উৎস থেকে আদর্শিকভাবে সম্পূর্ণ মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর (بَعْدَ أَن تُوَلُّوا مُدْبِرِينَ), আমি তোমাদের এই প্রাণহীন ঐতিহ্য ও মতবাদগুলোর (أَصْنَامَكُمْ) অসারতা প্রমাণ করার জন্য অবশ্যই একটি বাস্তব কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োগ করব (لَأَكِيدَنَّ)”
আয়াত ৫৮ (Verse 21:58)
আরবি পাঠ: فَجَعَلَهُمْ جُذَاذًا إِلَّا كَبِيرًا لَّهُمْ لَعَلَّهُمْ إِلَيْهِ يَرْجِعُونَ
-
- جُذَاذًا (জুযাযান): টুকরো টুকরো করে ফেলা, খণ্ড-বিখণ্ড করা, বা আদর্শিকভাবে ভেঙে চুরমার করা।
كَبِيرًا لَّهُمْ: তাদের সেই মনগড়া ব্যবস্থার প্রধান স্তম্ভ, মূল আখ্যান বা কেন্দ্রীয় বর্ণনাক্রম। - يَرْجِعُونَ (ইয়ারজিঊন): কোনো সত্যের দিকে বা বিবেকের দিকে ফিরে আসা।
- جُذَاذًا (জুযাযান): টুকরো টুকরো করে ফেলা, খণ্ড-বিখণ্ড করা, বা আদর্শিকভাবে ভেঙে চুরমার করা।
- “অতঃপর সে (যুক্তিবাদী সংস্কারের ধারা) তাদের সেই অসার মতবাদগুলোকে তাত্ত্বিকভাবে খণ্ড-বিখণ্ড করে দিল (فَجَعَلَهُمْ جُذَاذًا); তবে তাদের মূল আখ্যান বা কেন্দ্রীয় প্রধান স্তম্ভটি (كَبِيرًا لَّهُمْ) ছাড়া (তাদের প্রধান কেন্দ্রীয় যুক্তিটিকেই তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রেখে দেওয়া হয়েছিল, যেন তারা নিজেদের বিবেকের কাছে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।), যেন তারা (নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে) সেটির অসারতা নিয়ে যুক্তি ও বিবেকের দিকে ফিরে আসে (لَعَلَّهُمْ إِلَيْهِ يَرْجِعُونَ)।”
আয়াত ৫৯ (Verse 21:59)
আরবি পাঠ: قَالُوا مَن فَعَلَ هَٰذَا بِآلِهَتِنَا إِنَّهُ لَمِنَ الظَّالِمِينَ
- بِآلِهَتِنَا (বি-আলিহাতিনা): আমাদের মনগড়া আইন, ক্ষমতা বা সমাজ কাঠামোর ধারক-বাহকদের সাথে।
- الظَّالِمِينَ (আয-জ্বালিমীন): ভারসাম্য নষ্টকারী, সীমালঙ্ঘনকারী বা বিপর্যয় সৃষ্টিকারী।
- অনুবাদ: “তারা প্রশ্ন তোলে, ‘আমাদের এই পরম আইন ও ক্ষমতা কাঠামোর সাথে (بِآلِهَتِنَا) এমন আচরণ যে করল? নিশ্চয়ই সে একজন চরম সীমালঙ্ঘনকারী ও ভারসাম্য নষ্টকারী (الظَّالِمِينَ)।’”
আয়াত ৬০ (Verse 21:60)
আরবি পাঠ: قَالُوا سَمِعْنَا فَتًى يَذْكُرُهُمْ يُقَالُ لَهُ إِبْرَاهِيمُ
- فَتًى (ফাতান): একজন সাহসী, প্রগতিশীল, উদ্যমী যুবক বা সংস্কারক।
- يَذْكُرُهُمْ (ইয়াজকুরুহুম): এদের ত্রুটি বা অসারতা নিয়ে আলোচনা করছিল বা বিশ্লেষণ করছিল।
يُقَالُ لَهُ (ইউক্বালু লাহু): “যার পরিচয় সুনির্দিষ্টভাবে সাব্যস্ত হয়” বা “যা এই নামে বা এই বৈশিষ্ট্যে সুপরিচিত লাভ করে” ইউক্বালু লাহু (يُقَالُ لَهُ): কেবল মুখে ডাকা বা নাম বলা নয়; বরং কোনো আদর্শ বা সত্তার প্রকৃত গুণগত পরিচয় সমাজে প্রতিষ্ঠিত বা সাব্যস্ত হওয়া। - ইব্রাহীম (إِبْرَاهِيمَ): রূপক অর্থে, সমাজের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি, মানবিক কল্যাণ ও সংস্কারের এক সুউচ্চ ও পিতৃসুলভ শক্তির প্রতীক।
- অনুবাদ: “তাদের কেউ কেউ বলে, আমরা এক নতুন ও উদীয়মান চেতনার পর্যায়কে (فَتًى) এদের অসারতা উন্মোচন করে আলোচনা করতে (يَذْكُرُهُمْ শুনেছিলাম, যা ইব্রাহীম (উদার মানবিক কল্যাণ ও প্রবৃদ্ধির সুউচ্চ আদর্শ) হিসেবেই সমাজে সুপরিচিত ও সাব্যস্ত।”
আয়াত ৬১ (Verse 21:61)
আরবি পাঠ: قَالُوا فَأْتُوا بِهِ عَلَىٰ أَعْيُنِ النَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَشْهَدُونَ
- أَعْيُنِ (আ’ইউন): মানুষের চোখ দিয়ে দেখা নয়; কোনো গোপন বিষয়কে প্রকাশ্য আলোতে নিয়ে আসা, সম্পূর্ণ জনসমক্ষে আনা বা উন্মুক্ত বাস্তবতার মুখোমুখি করা।
- يَشْهَدُونَ (ইয়াশহাদুন): يَشْهَدُونَ: প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো পর্যবেক্ষণ বা বাস্তব সত্যকে চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করা এবং সাক্ষ্য দেওয়া।
- অনুবাদ: “তারা বলল, ‘তাহলে তাকে মানুষের প্রকাশ্য জ্ঞানগোচরে ও উন্মুক্ত দৃষ্টির সামনে নিয়ে এসো (عَلَىٰ أَعْيُنِ النَّاسِ), যেন তারা (এর অসারতা বা সত্যতা) নিজেরা প্রত্যক্ষ ও মূল্যায়ন করতে পারে (يَشْهَدُونَ)।’
আয়াত ৬২ (Verse 21:62)
আরবি পাঠ: قَالُوا أَأَنتَ فَعَلْتَ هَٰذَا بِآلِهَتِنَا يَا إِبْرَاهِيمُ
- بِآلِهَتِنَا (বি-আলিহাতিনা): আমাদের মনগড়া আইন, মানুষের তৈরি ক্ষমতা কাঠামো, বা অন্ধ আনুগত্যের শাসনব্যবস্থা।.
فَعَلْتَ (ফা’আলতা): এর মূল ধাতু F-A-L (فعل)। কোরআনের পরিভাষায় ‘ফেল’ (Action/Policy) কেবল কোনো অন্ধ শারীরিক আচরণ বা কাজ নয়। এটি হলো—একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে “কোনো নীতি বা তাত্ত্বিক সংস্কার প্রক্রিয়া সচল ও কার্যকর করা” (To operationalize a deliberate policy or structural intervention)। - “তারা (জিজ্ঞাসাবাদে) প্রশ্ন করল, ‘হে ইব্রাহিম! তুমিই কি আমাদের এই পরম আইন ও ক্ষমতা কাঠামোর (بِآلِهَتِنَا) বিরুদ্ধে এই নীতিগত আঘাত বা সংস্কার প্রক্রিয়াটি কার্যকর করেছ (أَأَنتَ فَعَلْتَ هَٰذَا)?’”
আয়াত ৬৩ (Verse 21:63)
আরবি পাঠ: قَالَ بَلْ فَعَلَهُ كَبِيرُهُمْ هَٰذَا فَاسْأَلُوهُمْ إِن كَانُوا يَنطِقُونَ
- كَبِيرُهُمْ (কবীরুহুম): তাদের অন্ধ ব্যবস্থার সেই প্রধান শক্তিশালী ভিত্তি, কেন্দ্রীয় যুক্তি বা মূল আখ্যান
- يَنطِقُونَ (ইয়ান্তিকুন): কোনো যৌক্তিক কথা বলা, সত্যকে ধারণ করা বা বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার বৈজ্ঞানিক ও যৌক্তিক ক্ষমতা থাকা।
ফাসআলাহুম (فَاسْأَلُوهُمْ): বাহ্যিক কথা বলা নয়, বরং কোনো অসার ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও যৌক্তিকতা নিজে নিজে পরখ বা বিশ্লেষণ করে দেখা। - অনুবাদ: “সে (ইব্রাহিম) উত্তর দিল, ‘নয়, বরং তাদের এই কেন্দ্রীয় প্রধান যুক্তি বা মূল আখ্যানটিই (كَبِيرُهُمْ) এটি করেছে; সুতরাং তোমরা এদেরকেই জিজ্ঞাসা করো, যদি এদের কোনো অকাট্য যুক্তি প্রকাশ করার বা বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা থাকে (إِن كَانُوا يَنطِقُونَ)।’”
আয়াত ৬৪ (Verse 21:64)
আরবি পাঠ: فَرَجَعُوا إِلَىٰ أَنفُسِهِمْ فَقَالُوا إِنَّكُمْ أَنتُمُ الظَّالِمُونَ
- إِلَىٰ أَنفُسِهِمْ (ইলা আনফুসিহিম): কোনো মানুষের ভৌগোলিক প্রস্থান নয়; তাদের নিজেদের সুপ্ত চেতনা, বুদ্ধি বা মনস্তাত্ত্বিক বিবেকের গভীর তলদেশে ফিরে তাকানো।
- الظَّالِمُونَ (আয-জ্বালিমীন): Those who violate natural laws, commit injustice, or cause social and intellectual imbalance. “(যুক্তির মুখে স্তব্ধ হয়ে) তারা নিজেদের অহং বা ব্যক্তিত্বের অসারতা নিজেরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে বাধ্য হলো (فَرَجَعُوا إِلَىٰ أَنفُسِهِمْ) এবং (নিজেদের বিবেকের কাছে স্বীকার করে) বলল, ‘প্রকৃতপক্ষে তোমরাই হলে চরম সীমালঙ্ঘনকারী ও ভারসাম্য নষ্টকারী’ (الظَّالِمُونَ)।’”
ফারা-জাঊ: এর মূল ধাতু R-J-A (رجع)। এর অর্থ কোনো জায়গায় বা অতীতে ফিরে যাওয়া নয়; বরং কোনো অকাট্য প্রমাণের মুখে “নিজের মূল সত্ত্বা বা উৎসের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য হওয়া বা উপলব্ধি করা”।
“”(যুক্তির মুখে স্তব্ধ হয়ে) তারা নিজেদের অহং বা ব্যক্তিত্বের অসারতা নিজেরা গভীরভাবে উপলব্ধি করতে বাধ্য হলো (فَرَجَعُوا إِلَىٰ أَنفُسِهِمْ) এবং (নিজেদের বিবেকের কাছে স্বীকার করে) বলল, ‘প্রকৃতপক্ষে তোমরাই হলে চরম সীমালঙ্ঘনকারী ও ভারসাম্য নষ্টকারী’ (أَنتُمُ الظَّالِمُونَ)।’”
আয়াত ৬৫ (Verse 21:65)
আরবি পাঠ: ثُمَّ نُكِسُوا عَلَىٰ رُءُوسِهِمْ لَقَدْ عَلِمْتَ مَا هَٰذَاءِ يَنطِقُونَ
- نُكِسُوا عَلَىٰ رُءُوسِهِمْ (নুকিসু আলা রুঊসিহিম): মানুষের শারীরিক মাথা নিচু করা বা উল্টে যাওয়া নয়; ক্ষণিকের জন্য বিবেক জাগ্রত হওয়ার পর পুনরায় তাদের পূর্বের অন্ধ অহংকার, একগুঁয়ে মনমানসিকতা এবং অযৌক্তিক গোঁড়ামিতে নিমজ্জিত হওয়া।
- অনুবাদ: “কিন্তু পরবর্তীতে তারা পুনরায় তাদের পূর্বের অন্ধ অহংকার ও অনড় মনমানসিকতায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ল (ثُمَّ نُكِسُوا عَلَىٰ رُءُوسِهِمْ) এবং বলল, ‘তুমি তো ভালো করেই জানো যে, এই মনগড়া নিয়ম বা প্রতীকগুলোর কথা বলার বা যুক্তি দেওয়ার কোনো ক্ষমতা নেই (مَا هَٰذَاءِ يَنطِقُونَ)।’”
আয়াত ৬৬ (Verse 21:66)
আরবি পাঠ: قَالَ أَفَتَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكُمْ شَيْئًا وَلَا يَضُرُّكُمْ
أَفَتَعْبُدُونَ (আফাতা’বুদুন): নিছক পূজা নয়; আল্লাহর ওহীর নিয়ম ব্যতিরেকে অন্য কোনো মানব-রচিত ব্যবস্থার কঠিন দাসত্ব ও অন্ধ হুকুম তামিল করা।
يَنفَعُكُمْ / يَضُرُّكُمْ (ইয়ানফাউকুম / ইয়াদুররুকুম: দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত উপকার বা সামাজিক প্রবৃদ্ধি বনাম কোনো সংকট, ক্ষতি বা পতন ডেকে আনা।):
- অনুবাদ: “সে (ইব্রাহিম) বলল, ‘তবে কি তোমরা আল্লাহর অমোঘ বিধানের পরিবর্তে এমন মনগড়া ব্যবস্থার দাসত্ব ও অন্ধ অনুসরণ করছ (أَفَتَعْبُدُونَ), যা তোমাদের কোনো রকম বৈপ্লবিক প্রবৃদ্ধি বা উপকারও করতে পারে না (لَا يَنفَعُكُمْ), আর না পারে তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে (لَا يَضُرُّكُمْ)?’”
আয়াত ৬৭ (Verse 21:67)
আরবি পাঠ: أُفٍّ لَّكُمْ وَلِمَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ ۖ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
- تَعْقِلُونَ (তা’কিলুন): কোনো ঘটনা বা বিষয়ের কার্যকারণ (Cause and Effect) বিশ্লেষণ করার জন্য বুদ্ধিমত্তা, যুক্তি ও মস্তিষ্কের সঠিক ব্যবহার করা।
- অনুবাদ: “ধিক্কার তোমাদের ওপর এবং আল্লাহর আইনের বাইরে গিয়ে তোমরা যার দাসত্ব ও অন্ধ অনুসরণ করছ তার ওপর! তবুও কি তোমরা তোমাদের সাধারণ বুদ্ধি ও বিবেক খাটাবে না (أفَلَا تَعْقِلُونَ)?”
আয়াত ৬৮ (Verse 21:68)
আরবি পাঠ: قَالُوا حَرِّقُوهُ وَانصُرُوا آلِهَتَكُمْ إِن كُنتُمْ فَاعِلِينَ
- حَرِّقُوهُ (হাররিকুহু): কোনো মানুষকে শারীরিক আগুনে পোড়ানো নয়; সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে কাউকে কোণঠাসা করা, চরম বয়কট ও দ্বন্দ্বের আগুনে নিক্ষেপ করা বা তার প্রভাব সম্পূর্ণ ধ্বংস করা।
- وَانصُرُوا (ওয়ানসুরু): কোনো ক্ষয়িষ্ণু ব্যবস্থাকে রক্ষা করতে নিজেদের সমস্ত শক্তি ও প্রতিরক্ষা উপাদান দিয়ে মজবুত করা বা ব্যাক-আপ দেওয়া।
- অনুবাদ: “তারা (ক্রুদ্ধ হয়ে) বলল, ‘একে চরম সামাজিক বিপর্যয় ও শাস্তির আগুনে পুড়িয়ে দাও বা কোণঠাসা করো (حَرِّقُوهُ) এবং তোমাদের মনগড়া আইন ও ক্ষমতা কাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য বা সুরক্ষা প্রদান করো (وَانصُرُوا آلِهَتَكُمْ), যদি তোমরা সত্যি কিছু করতে চাও।’”
আয়াত ৬৯ (Verse 21:69)
আরবি পাঠ: قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ
- يَا نَارُ: বিরোধীদের তৈরি করা সেই তীব্র সামাজিক প্রতিহিংসা, চরম কোণঠাসা অবস্থা বা সংকট ও সংঘাতের জ্বলন্ত পরিবেশ।
بَرْدًا وَسَلَامًا: সম্পূর্ণ শান্ত, শীতল, নিরাপদ এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা যা বিরোধীদের তৈরি করা সামাজিক আগুনকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
অনুবাদ: “আমরা আদেশ করলাম, ‘হে (প্রতিহিংসা ও সংকটের) আগুন (يَا نَارُ)! তুমি ইব্রাহিমের জন্য একেবারেই শান্ত, শীতল ও নিরাপদ ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে যাও (بَرْدًا وَسَلَامًا)।’”
আয়াত ৭০ (Verse 21:70)
আরবি পাঠ: وَأَرَادُوا بِهِ كَيْدًا فَجَعَلْنَاهُمُ الْأَخْسَرِينَ
كَيْدًا: কোনো যৌক্তিক আন্দোলনকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য গোপন চক্রান্ত, মনস্তাত্ত্বিক কূটকৌশল বা গভীর ষড়যন্ত্র।
الْأَخْسَرِينَ: নিজেদের সমস্ত সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পুঁজি হারিয়ে চরম দেউলিয়া, ব্যর্থ এবং চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া।
- অনুবাদ: “তারা তার বিরুদ্ধে একটি গোপন ষড়যন্ত্র বা চক্রান্ত করতে চেয়েছিল (كَيْدًا); কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা তাদের নিজেদেরকেই চূড়ান্ত ব্যর্থ ও চরম ক্ষতিগ্রস্তদের (الْأَخْسَرِينَ) অন্তর্ভুক্ত করে দিলাম।”
আয়াত ৭১ (Verse 21:71)
আরবি পাঠ: وَنَجَّيْنَاهُ وَلُوطًا إِلَى الْأَرْضِ الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا لِلْعَالَمِينَ
- بَارَكْنَا (বারাকনা): প্রবৃদ্ধি, কল্যাণ ও টেকসই প্রাচুর্য দান করা।
- لِلْعَالَمِينَ (লিল-আ-লামীন): —সমগ্র মহাবিশ্ব, সমস্ত মানবসমাজ এবং যারা সত্যের জ্ঞান রাখে (Experts/Knowers) তাদের সবার জন্য।
- অনুবাদ: আর আমি তাকে (ইব্রাহীমকে) এবং লূতকে (সত্যের প্রতি গভীর অনুরাগী ও একনিষ্ঠ চেতনাকে) সেই ক্ষতিকর পরিস্থিতি থেকে বের করে এনে এমন এক নতুন সামাজিক ভিত্তিতে (আরয) জীবনের পথ দেখালাম, যেখানে আমি সমগ্র মহাবিশ্ব, সমস্ত শাসনব্যবস্থা ও সকল জ্ঞান অন্বেষণকারী বিশেষজ্ঞদের (আলামীন) জন্য প্রবৃদ্ধি ও কল্যাণ (বারাকাত) রেখেছি //// আর আমি তাকে (ইব্রাহীমকে) এবং তার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকা সেই সামাজিক মোহ, আসক্তি বা অনুসারী বৃত্তকে (লূত) সেই ক্ষতিকর পরিস্থিতি থেকে বের করে এনে এমন এক নতুন সামাজিক ভিত্তিতে (আরয) জীবনের পথ দেখালাম
- “Lut” (لوط) শব্দের মূল ধাতুর অর্থ (Root Meaning)
- আরবি অভিধান এবং মূল শব্দকোষের তাত্ত্বিক ধারা অনুযায়ী, লূত (L—W—T) শব্দের মূল ধাতুর অর্থ হলো “যা লেপ্টে থাকে”, “যা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে” অথবা “কোনো তীব্র সামাজিক আসক্তি বা মোহ”। প্রথাগত অনুবাদে একে কেবল একজন ব্যক্তির নাম বলা হলেও, তাত্ত্বিক অনুবাদে এটি মানুষের মনের বা সমাজের এমন এক নেতিবাচক মানসিকতাকে নির্দেশ করে যা কোনো অন্ধ প্রথা, কুসংস্কার বা ক্ষতিকর রীতিনীতির সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে থাকে।
- “AAZARA” (আজার) শব্দের ব্যাখ্যাটি লক্ষ্য করুন। সেখানে বলা হয়েছে যে, আজার ইব্রাহীমের বাবার ভৌত নাম নয়; বরং এর অর্থ “উৎস বা পূর্বপুরুষদের অন্ধ অনুকরণ/সমর্থন”। ঠিক একইভাবে, “Lut” শব্দটিও কেবল একটি নাম নয়, এটি মূলত ইব্রাহীমের সাথে থাকা সেই সমাজ বা শক্তির প্রতীক যা পূর্ববর্তী ব্যবস্থার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকা সত্ত্বেও ইব্রাহীমের সংস্কারমুখী আদর্শের দিকে ধাবিত হয়েছিল।
- এককথায়: প্রচলিত অনুবাদের “লূত” শব্দটিকে সরাসরি ব্যক্তি-নাম হিসেবে রেখে দিলে কোরআনের মূল তাত্ত্বিক গভীরতা বা ইউনিভার্সাল মেসেজটি ঢাকা পড়ে যায়। তাই লেক্সিকন অনুযায়ী একে “আষ্টেপৃষ্ঠে লেগে থাকা সামাজিক আসক্তি বা মোহগ্রস্ত অনুসারী দল” হিসেবে অনুবাদ করাই সম্পূর্ণ সঠিক ও ধারণাগতভাবে নিখুঁত
আয়াত ৭২ (Verse 21:72)
আরবি পাঠ: وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ نَافِلَةً ۖ وَكُلًّا جَعَلْنَا صَالِحِينَ
- نَافِلَةً (নাফিলাতান): অতিরিক্ত উপহার, বর্ধিত অবদান বা স্বাভাবিক প্রাপ্তির চেয়েও বেশি কিছু।
- صَالِحِينَ (সালিহীন): যারা সমাজের ত্রুটি সংশোধন করে, ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে এবং সংস্কারমূলক কাজ (Is’lah) করে।
- অনুবাদ: “এবং আমরা তাকে সমৃদ্ধ করলাম ইসহাকের মাধ্যমে এবং অতিরিক্ত বা বর্ধিত অবদানস্বরূপ (نَافِلَةً) ইয়াকুবকে দিলাম; এবং তাদের প্রত্যেককেই আমরা সমাজ সংস্কারক ও ভারসাম্য রক্ষাকারী (صَالِحِينَ) হিসেবে নিযুক্ত বা মনোনীত করলাম جَعَلْنَا (জা’আলনা): প্রথাগত “গড়ে তোলা” বা “বানানো” নয়; বরং একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা মিশনের জন্য মনোনীত করা, নিযুক্ত করা বা দায়িত্বভার অর্পণ করা
আর আমি তাকে এমন এক উত্তরসূরি বা অনুসারী শক্তি দিয়ে আশীর্বাদপুষ্ট বা ধন্য করলাম যা অবিরাম হাসির উৎস ও আনন্দের কারণ (ইসহাক) এবং অতিরিক্ত পুরস্কার স্বরূপ এমন শক্তিও যুক্ত করলাম যা পূর্ববর্তী সংস্কারের ধারাবাহিকতা বা পদাঙ্ক অনুসরণকারী (ইয়াকুব); আর তাদের প্রত্যেককেই আমি সমাজ সংশোধনকারী ও ভারসাম্য রক্ষাকারী (সালেহীন) হিসেবে নিযুক্ত বা মনোনীত করলাম (জা’আলনা
১. وَوَهَبْنَا (ওয়া-ওয়াহাবনা): প্রথাগত কোনো বাহ্যিক বস্তু দান করা নয়; বরং কোনো পবিত্র গুণ, সামর্থ্য বা আদর্শিক যোগ্যতায় সত্তাকে ধন্য বা সমৃদ্ধ করা ।
২. إِسْحَاقَ (ইসহাক): এটি কেবল ব্যক্তির নাম নয়; আরবি ধাতুগত অর্থ (S-H-K) অনুযায়ী, যা প্রতিকূলতার মাঝেও “আনন্দ, হাস্যোজ্জ্বল পরিস্থিতি বা পরম স্বস্তি” বয়ে আনে।
৩. وَيَعْقُوبَ (ইয়াকুব): ধাতুগত অর্থ (A-Q-B / Aa’qebat) অনুযায়ী, যা “পরবর্তী ধারা, পদাঙ্ক অনুসরণকারী বা ধারাবাহিক সফল পরিণতি” নিশ্চিত করে 。
৪. جَعَلْنَا (জা’আলনা): প্রথাগত “বানানো” নয়; বরং একটি সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা ঐশ্বরিক মিশন বাস্তবায়নের জন্য মনোনীত করা বা দায়িত্বভার অর্পণ করা
আয়াত ৭৩ (Verse 21:73)
আরবি পাঠ: وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَإِقَامَ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءَ الزَّكَاةِ ۖ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ
- أَئِمَّةً (আইম্মাতান): পথপ্রদর্শক, নেতা বা এমন আদর্শ ব্যক্তিত্ব যারা সামনে থেকে সমাজকে নেতৃত্ব দেয়।
- فِعْلَ الْخَيْرَاتِ (ফি’লাল খাইরাত): কল্যাণকর, প্রগতিশীল এবং মানুষের জন্য উপকারী কার্যাদি সম্পন্ন করা।
- وَإِقَامَ الصَّلَاةِ (ওয়া ইকামাস সালাত): সমাজ উন্নয়নমূলক কর্তব্য ও ঐশী বিধানকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত করা। পরম কর্তব্যে অবিচল থাকা এবং ঐশ্বরিক দায়িত্বসমূহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করা।
- وَإِيتَاءَ الزَّكَاةِ (ওয়া ঈতা-আয জাকাত): উৎস থেকে মানসিক-সামাজিক বিকাশ ও শুদ্ধি ব্যবস্থার জন্য নিজের সম্পদ ও শক্তি উৎসর্গ করা। আত্মশুদ্ধি এবং সমাজকে মজবুত করার জন্য নিজের সম্পদ, দক্ষতা ও সময় উৎসর্গ করা।
عَابِدِينَ (আবেদীন): ঐশ্বরিক নিয়মকানুনের আনুগত্য করা, যার প্রাথমিক পর্যায় কষ্টসাধ্য হলেও শেষ পরিণতিতে ব্যক্তি ও সমাজের স্থায়ী আরাম ও পুষ্টি নিশ্চিত হয়।
“এবং আমরা তাদেরকে এমন নেতা বা আদর্শ রূপক (أَئِمَّةً) বানিয়েছিলাম যারা আমাদের বিধানের আলোকেই সঠিক পথের দিশা দিত; এবং আমরা তাদের প্রতি কল্যাণকর কাজ করতে (فِعْلَ الْخَيْرَاتِ), ঐশী কর্তব্য স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করতে (وَإِقَامَ الصَّلَاةِ) এবং আত্মিক ও সামাজিক শুদ্ধি ব্যবস্থা চালু রাখার (وَإِيتَاءَ الزَّكَاةِ) সুনির্দিষ্ট ঐশী নির্দেশনা পাঠিয়েছিলাম; এবং তারা কেবল আমাদের আইনের প্রতিই অনুগত ও প্রচেষ্টাকারী (عَابِدِينَ) ছিল।”
আর আমি তাদেরকে এমন আদর্শিক অগ্রপথিক বা সমাজ-পরিচালক (ইমাম) হিসেবে মনোনীত ও নিযুক্ত করলাম, যারা আমার সুনির্দিষ্ট আইন ও প্রাকৃতিক নিয়ম (আমর) অনুসারে মানুষের জন্য সঠিক জীবনের পথ উন্মোচন করত; এবং আমি তাদের মধ্যে এই সুক্ষ্ম দিকনির্দেশনা (ওহী) সঞ্চারিত করলাম যেন তারা মানুষের জন্য উৎকৃষ্ট ও কল্যাণকর কাজ করে, তাদের উপর অর্পিত মহান দায়িত্বসমূহকে সমাজে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখে (সালাত) এবং নিজেদের মেধা, সময় ও সম্পদকে মানবীয় সম্ভাবনা বিকাশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় উৎসর্গ করে (যাকাত)। আর তারা সর্বতোভাবে আমার আইন ও বিধিমালার প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পিত ও কর্মঠ (আবেদীন) ছিল।
আয়াত ৭৪ (Verse 21:74)
আরবি পাঠ: وَلُوطًا آتَيْنَاهُ حُكْمًا وَعِلْمًا وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْقَرْيَةِ الَّتِي كَانَت تَّعْمَلُ الْخَبَائِثَ ۗ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمَ سَوْءٍ فَاسِقِينَ
حُكْمًا وَعِلْمًا (হুকমাও ওয়া ইলমা): সঠিক বিচার বুদ্ধি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং গভীর জ্ঞান।
لوطًا (লূত): ভৌত নাম নয়; বরং যা পূর্ববর্তী অন্ধ প্রথার সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে লেপ্টে থাকে (Root: L-W-T)।
الْخَبَائِثَ (আল-খাবা-ইসা): অত্যন্ত নোংরা, ভারসাম্যহীন, অনৈতিক এবং সমাজ ধ্বংসকারী ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড।فَاسِقِينَ (ফাসিকীন): যারা ঐশী আইনের গণ্ডি বা সুনির্দিষ্ট সীমা লঙ্ঘন করে বাইরে চলে যায়।
“এবং লুতকে আমরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আইন প্রণয়নের ক্ষমতা (হুকুম) ও গভীর জ্ঞান (حُكْمًا وَعِلْمًا) প্রদান করেছিলাম এবং তাকে সেই জনবসতি বা সামাজিক বলয়ের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বের করে এনেছিলাম, যারা অত্যন্ত নোংরা আচরণে লিপ্ত ছিল الْخَبَائِثَ। প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল চরম অবাধ্য ও সীমা লঙ্ঘনকারী এক নিকৃষ্ট জাতি (ফাসিকীন)। (الْخَبَائِثَ) লিপ্ত ছিল; (قَوْمَ سَوْءٍ فَاسِقِينَ)।”
***আর সেই একনিষ্ঠ অনুরাগী চেতনাকে (লূত) আমি সিদ্ধান্ত ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতা (হুকুম) এবং সঠিক তথ্য-জ্ঞান (ইলম) দ্বারা সমৃদ্ধ করলাম; এবং তাকে সেই ক্ষতিকর পরিবেশ বা নোংরা মানসিকতার জনপদ থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে বের করে আনলাম, যা সর্বদাই ধ্বংসাত্মক ও দূষিত কর্মে লিপ্ত ছিল। প্রকৃতপক্ষে তারা ছিল চরম অবাধ্য, সীমা লঙ্ঘনকারী এক সমাজ (ফাসিকীন)।
আয়াত ৭৫ (Verse 21:75)
আরবি পাঠ: وَأَدْخَلْنَاهُ فِي رَحْمَتِنَا ۖ إِنَّهُ مِنَ الصَّالِحِينَ
- رَحْمَتِنَا (রাহমাতিনা): আমাদের নিরাপত্তা বলয়, যত্ন, পুষ্টি এবং ঐশী রহমত।
الصَّالِحِينَ (সালেহীন): যারা নিজেদের সমাজ ও জীবনকে বিকৃতি থেকে মুক্ত করে সংশোধন (ইসলাহ) এবং সঠিক ভারসাম্যে পরিচালনা করে।
“এবং আমরা তাকে আমাদের বিশেষ নিরাপত্তা বলয় ও রহমতের (فِي رَحْمَتِنَا) অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম; নিশ্চয়ই সে ছিল সমাজ সংস্কারকদের (الصَالِحِينَ) অন্যতম।”
আর আমি সেই সত্যের অনুসারী আদর্শিক বলয়কে আমার বিশেষ সার্বিক সুরক্ষা, প্রবৃদ্ধি ও পরম অনুকম্পার (রহমত) অন্তর্ভুক্ত করলাম; কারণ সে বা তারা ছিল সমাজ ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারসাম্য স্থাপনকারী ও সংশোধনকারীদের (সালেহীন) অন্তর্ভুক্ত। - رَحْمَتِنَا (রহমত): কেবল মানসিক দয়া নয়; বরং এমন এক ঐশ্বরিক নিরাপত্তা ও বৃদ্ধির পরিবেশ যা ব্যক্তির যোগ্যতা বিকাশে ঢাল হিসেবে কাজ করে।
আয়াত ৭৬ (Verse 21:76)
আরবি পাঠ: وَنُوحًا إِذْ نَادَىٰ مِن قَبْلُ فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَنَجَّيْنَاهُ وَأَهْلَهُ مِنَ الْكَرْبِ الْعَظِيمِ
- وَأَهْلَهُ (ওয়া আহলাহু): কেবল রক্তের সম্পর্কের পরিবার নয়, বরং তার সাথে থাকা আদর্শিক সহযোগী, ও যারা সত্যের দায়িত্বভার বহন করছিল।
- الْكَرْبِ الْعَظِيمِ (আল-কারবিল আজীম): এক তীব্র সংকট, নিষ্পেষণ বা অত্যন্ত ভয়ংকর সামাজিক অবক্ষয়ের মহাসংকট।
نُوحًا (নূহ): ভৌত নাম নয়; আরবি ধাতুগত অর্থ (N-W-H / নওয়াহ) এবং শব্দকোষের দর্শন অনুযায়ী, যা “সুদীর্ঘ ক্রন্দন, সমাজ সচেতনতার তীব্র আর্তনাদ বা ক্লান্তহীন সংগ্রাম”-কে নির্দেশ করে।
فَاسْتَجَبْنَا (ফাস্টাজাবনা): কোনো নিষ্ক্রিয় ‘প্রার্থনায় সাড়া দেওয়া’ নয়; বরং আল্লাহর আইনি ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের সক্রিয় সাড়া বা কর্মের বিপরীতে সেই ঐশ্বরিক সিস্টেমের মাধ্যমে “ফলাফল অবধারিত হওয়া বা কর্মটি সম্পূর্ণরূপে ফলপ্রসূ হওয়া”। - أَهْلَهُ (আহলুহু): কেবল রক্তসম্পর্কীয় পরিবার নয়; , “এমন ব্যক্তি বা আদর্শিক সমাজ যাদের যত্ন নেওয়া, লালন-পালন ও সুরক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব” নেতার ওপর অর্পিত।
- الْكَرْبِ الْعَظِيمِ (আল-কারবিল আজীম): দমবন্ধ করা চরম সামাজিক অবক্ষয় বা মহাসংকট।
- অনুবাদ: “ এবং স্মরণ করুন নূহের কথা; যখন সে এর পূর্বে তার প্রতিপালককে আহ্বান করেছিল। তখন আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম, অতঃপর তাকে এবং তার সামগ্রিক দায়িত্বে থাকা অনুসারী ও আপনজনদের (আহল) সেই মহা সংকটপূর্ণ অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে বের করে এনেছিলাম (مِنَ الْكَرْبِ الْعَظِيمِ)।”
******আর স্মরণ করুন সেই শান্তিময় সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে চলা সুদীর্ঘ ক্লান্তিহীন সচেতনতার ডাক ও তীব্র সংগ্রামকে (নূহ); যখন সে বা তারা এর পূর্বে আল্লাহর লালন ও বিকাশকারী বিধিমালার সম্মুখে নিজের উদ্দেশ্য ও বাস্তব কর্মপদ্ধতিকে প্রকটিত বা উপস্থাপন করেছিল (নাদা)। ফলশ্রুতিতে তার সেই সক্রিয় সমাজ-সংস্কারমূলক কর্মের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমার ঐশ্বরিক নিয়ম কাজ করে তার সেই কর্মকে কার্যকর বা ফলপ্রসূ করল (ফাস্টাজাবনা); অতঃপর তাকে এবং তার সামগ্রিক দায়িত্বে থাকা অনুসারী সমাজকে (আহল) সেই দমবন্ধ করা মহা সংকট ও তীব্র সামাজিক বিপর্যয়কর পরিস্থিতি থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে বের করে আনল
আয়াত ৭৭ (Verse 21:77)
আরবি পাঠ: وَنَصَرْنَاهُ مِنَ الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا ۚ إِنَّهُمْ كَانُوا قَوْمَ سَوْءٍ فَأَغْرَقْنَاهُمْ أَجْمَعِينَ
- وَنَصَرْنَاهُ (ওয়া নাসারনাহু): তাকে আমরা পূর্ণ সুরক্ষা দিয়েছিলাম এবং তার শক্তিকে সুদৃঢ় করেছিলাম। কেবল বিজয় নয়; বরং সত্যের পক্ষে বাধা অতিক্রম করার জন্য ঐশ্বরিক শক্তি ও সংহতি প্রদান করা।
- كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا (কাযযাবু বি-আযাতিনা): আমাদের অকাট্য প্রাকৃতিক ও ঐশী নিদর্শনগুলোকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা বা তাচ্ছিল্য করা। সত্যকে জানার পরেও তাকে নিয়ে উপহাস করা, মিথ্যা প্রতিপন্ন করা বা এড়িয়ে যাওয়া।
- فَأَغْرَقْنَاهُمْ أَجْمَعِينَ (ফায়া আগরকনাহুম আজমাঈন): প্রথাগত অলৌকিক মহাপ্লাবনের পানিতে চুবিয়ে মারা নয়; বরং আল্লাহর সামাজিক ও প্রাকৃতিক নিয়ম (Law of Cause and Effect) অনুসারে, অবাধ্যতার চরম সীমায় পৌঁছে যাওয়া একটি সমাজকে “তাদের নিজেদের তৈরি করা অন্যায়েরই অবধারিত ধ্বংসাত্মক পরিণতিতে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত, বিলীন বা বিলুপ্ত করে দেওয়া”
- অনুবাদ: “এবং যারা আমাদের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও আইনসমূহকে অস্বীকার ও তাচ্ছিল্য করেছিল (كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا), সেই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমরা তাকে পূর্ণ সুরক্ষা ও সাহায্য দিয়েছিলাম (وَنَصَرْنَاهُ); নিশ্চয়ই তারা ছিল এক চরম ক্ষতিকর জাতি, তাই আমরা তাদের সবাইকে (তাদের নিজেদের অবক্ষয়ের স্রোতে) নিমজ্জিত করে ধ্বংস করে দিয়েছিলাম (فَأَغْرَقْنَاهُمْ أَجْمَعِينَ)।”
***আর আমি সেই সুদীর্ঘ সচেতনতার ডাক, ক্লান্তিহীন সংগ্রাম ও সংস্কারমুখী সমাজকে (নূহ) শক্তিশালী ও তার অনুকূলে কৌশলগত সংহতি প্রদান (নাসারনা) করেছিলাম— সেই সামাজিক শক্তির বিরুদ্ধে, যারা আমার স্পষ্ট সৃষ্টিতাত্ত্বিক নির্দেশনাবলি ও সত্য বিধানকে অস্বীকার ও উপহাস (কাযযাবু) করেছিল। নিশ্চয়ই তারা ছিল চরম ক্ষতিকর, বিকৃত ও অন্যায়কারী এক নিকৃষ্ট সমাজ, ফলশ্রুতিতে আমি তাদের সবাইকে তাদের নিজেদের তৈরি করা অন্যায়ের অনিবার্য ও ধ্বংসাত্মক পরিণতিতে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত বা বিলীন (আগরকনাহুম) করে দিলাম
আয়াত ৭৮ (Verse 21:78)
আরবি পাঠ: وَدَاوُودَ وَسُلَيْمَانَ إِذْ يَحْكُمَانِ فِي الْحَرْثِ إِذْ نَفَشَتْ فِيهِ غَنَمُ الْقَوْمِ وَكُنَّا لِحُكْمِهِمْ شَاهِدِينَ
- يَحْكُمَانِ (ইয়াহকুমানি): কোনো বিবাদ বা সমস্যার আইনি ও ন্যায়সংগত সমাধান বা রায় দেওয়া।
- الْحَرْثِ (আল-হারছি): রূপক অর্থে সমাজ বা মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল, চাষাবাদ বা জাতীয় সম্পদ।
- غَنَمُ (গানামু): সাধারণত ছাগল/ভেড়া অনুবাদ হলেও, ধারণাগতভাবে এটি এমন কোনো অনিয়ন্ত্রিত জনগোষ্ঠী বা ক্ষতিকর শক্তিকে বোঝায় যা অন্যের শ্রমের ফসল নষ্ট করে।
إِذْ نَفَشَتْ فِيهِ غَنَمُ الْقَوْمِ (ইয নফশাত ফীহি গানামুল ক্বাওম): প্রথাগত “যেখানে রাতের বেলা অন্য এক জাতির গবাদিপশু ঢুকেছিল” নয়; বরং “এমন এক সামাজিক পরিস্থিতিতে বা সন্ধিক্ষণে, যখন অন্য এক জাতির নিয়ন্ত্রণহীন, লাগামহীন ও বিশৃঙ্খল জনগোষ্ঠী সেই কাঠামোয় ঢুকে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছিল”। - دَاوُودَ (দাউদ): ভৌত নাম নয়; আরবি ধাতুগত অর্থ (D-W-D) অনুযায়ী, যা “পরম ভালোবাসা, হৃদ্যতা বা ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ শক্তি”-কে নির্দেশ করে।
سُلَيْمَانَ (সুলায়মান): ভৌত নাম নয়; আরবি ধাতুগত অর্থ (S-L-M / সালাম) অনুযায়ী, যা “সম্পূর্ণ শান্তি, নিরাপত্তা, অক্ষত অবস্থা বা সুসংহত শাসনব্যবস্থা”-র প্রতীক।
- অনুবাদ: “এবং দাউদ ও সুলাইমানের কথা স্মরণ করো, যখন তারা সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসল বা জাতীয় সম্পদ নিয়ে (فِي الْحَرْثِ) একটি আইনি বিচার করছিল—যেখানে একটি অনিয়ন্ত্রিত ও বিশৃঙ্খল জনগোষ্ঠী বা শক্তি (غَنَمُ الْقَوْمِ) রাতের আঁধারে ঢুকে ফসল নষ্ট করে দিয়েছিল; এবং আমরা তাদের সেই আইনি সমাধানের ওপর পূর্ণ নজরদারী ও সাক্ষী ছিলাম (شَاهِدِينَ)।”
****আর স্মরণ করুন সেই পারস্পরিক ভালোবাসা ও হৃদ্যতার বন্ধনে প্রতিষ্ঠিত সমাজ-ব্যবস্থাকে (দাউদ) এবং তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে ওঠা শান্তি, security ও সুসংহত শাসনকে (সুলায়মান); যখন তারা এক প্রগতিশীল ও উৎপাদনশীল সামাজিক কাঠামোর (হারছ) দ্বন্দ্ব নিয়ে বিচার বা সুনির্দিষ্ট আইনের আলোকে বিরোধ মীমাংসা (ইয়াহকুমানি) করছিল— এমন এক সামাজিক পরিস্থিতিতে বা সন্ধিক্ষণে, যখন অন্য এক জাতির নিয়ন্ত্রণহীন, লাগামহীন ও বিশৃঙ্খল জনগোষ্ঠী (গানাম) তার ভেতরে ঢুকে ব্যাপক সামাজিক অবক্ষয় বা বিশৃঙ্খলা (নফশাত) তৈরি করেছিল। আর আমি তাদের সেই আইনি মীমাংসা ও বিচার প্রক্রিয়ার সরাসরি পর্যবেক্ষণকারী বা সাক্ষী (শাহেদ্দীন) ছিলাম।
আয়াত ৭৯ (Verse 21:79)
আরবি পাঠ: فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ ۚ وَكُلًّا آتَيْنَا حُكْمًا وَعِلْمًا ۚ وَسَخَّرْنَا مَعَ دَاوُودَ الْجِبَالَ يُسَبِّحْنَ وَالطَّيْرَ ۚ وَكُنَّا فَاعِلِينَ
ফফহম্মনাহা (فَفَهَّمْنَاهَا): এটি কোনো নিষ্ক্রিয় মানসিক বোঝাপড়া বা প্রথাগত “বুঝিয়ে দেওয়া” নয়। এর প্রকৃত তাত্ত্বিক অর্থ হলো— আল্লাহর সুনির্দিষ্ট নিয়ম এবং মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিবৃত্তিক প্রচেষ্টার মিথস্ক্রিয়ায় কোনো জটিল সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় সমস্যার “গভীর অনুধাবনযোগ্য সমাধান সূত্রকে সম্পূর্ণ কার্যকর, ফলপ্রসূ, সুনির্দিষ্ট বা বাস্তবায়িত করা”।
সুলায়মান (سُلَيْمَانَ): পূর্বের আয়াতের ধারাবাহিকতায়, এটি মূলত “সমাজে সম্পূর্ণ শান্তি, নিরাপত্তা, অক্ষত অবস্থা বা সুসংহত শাসনব্যবস্থা”-র প্রতীক।
فَفَهَّمْنَاهَا سُلَيْمَانَ (ফফহম্মনাহা সুলায়মানা): প্রথাগত “সুলায়মানকে বুঝিয়ে দিলাম” নয়; বরং “সেই শান্তি, নিরাপত্তা ও সুসংহত শাসনব্যবস্থার কাঠামোতে সেই সংকটের গভীর অনুধাবনযোগ্য ও প্রায়োগিক সমাধান সূত্রকে সম্পূর্ণ কার্যকর বা ফলপ্রসূ করলাম”
يُسَبِّحْنَ (ইউসাব্বিহনা): ফাইলের অবিরাম গতিশীল থাকা, আল্লাহর প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে থেকে কড়া দায়িত্ব পালন করা।
الْجِبَالَ (আল-জিবাল): রূপক অর্থে সমাজের শক্তিশালী ও অটল ব্যক্তি বা বড় বড় প্রশাসনিক ভিত্তি বা শক্ত বাধা।।
وَالطَّيْرَ (ওয়াত-তাইরা): উচ্চতর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চেতনা বা এমন দূরগামী মাধ্যম যা মাটির বা বৈষয়িক গণ্ডির বাইরে গিয়ে কাজ করে। উচ্চমার্গীয় দৃষ্টিভঙ্গি, স্বাধীন চিন্তা বা দূরদর্শী দায়িত্বশীল কোনো শক্তি যা সমাজের উচ্চে অবস্থান করে।
অনুবাদ: “অতঃপর আমরা সুলাইমানকে সেই সমস্যার গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি সুরাহাটি বুঝিয়ে দিয়েছিলাম; এবং তাদের উভয়কেই আমরা সঠিক বিচার বুদ্ধি ও জ্ঞান (حُكْمًا وَعِلْمًا) দিয়েছিলাম; এবং আমরা দাউদের অধীনে সুদৃঢ় প্রশাসনিক ভিত্তিগুলোকে (الْجِبَالَ) নিয়মের অনুবর্তী করে দিয়েছিলাম—যারা ঐশী বিধান বাস্তবায়নে অবিরাম গতিশীল থাকত (يُسَبِّحْنَ) এবং উচ্চতর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন চেতনা বা মাধ্যমগুলোকেও (وَالطَّيْرَ); এবং আমরাই এসবের মূল রূপকার ছিলাম।”
****ফলশ্রুতিতে সেই শান্তি, নিরাপত্তা ও সুসংহত শাসনব্যবস্থার (সুলায়মান) কাঠামোতে সেই সংকটের গভীর অনুধাবনযোগ্য ও প্রায়োগিক সমাধান সূত্রকে আমি সম্পূর্ণ কার্যকর ও ফলপ্রসূ করলাম (ফফহম্মনাহা); তবে তাদের উভয় অবয়ব বা কাঠামোকেই আমি শাসনক্ষমতা-প্রজ্ঞা (হুকুম) এবং সঠিক বাস্তব জ্ঞান (ইলম) দান করেছি। আর আমি সেই ভালোবাসা ও হৃদ্যতার বন্ধনে আবদ্ধ শক্তির (দাউদ) অনুকূলে পাহাড়সদৃশ সমাজ-নেতৃবৃন্দ বা অত্যন্ত দৃঢ় বাধা-প্রতিবন্ধকতাগুলোকে (জিবাল) এবং উচ্চমার্গীয় দায়িত্বশীল স্বাধীন চিন্তার শক্তিসমূহকে (ত্বাইর) নিয়োজিত বা সামঞ্জস্যপূর্ণ করেছিলাম, যা সত্যের বিধিমালা প্রতিষ্ঠার জন্য অবিরাম কক্ষপথে সচল ও সক্রিয় সংগ্রাম (তাসবীহ) করত; আর আমিই এসব কিছু সম্পাদনকারী।
আয়াত ৮০ (Verse 21:80)
আরবি পাঠ: وَعَلَّمْنَاهُ صَنْعَةَ لَبُوسٍ لَّكُمْ لِتُحْصِنَكُم مِّن بَأْسِكُمْ ۖ فَهَلْ أَنتُمْ شَاكِرُونَ
صَنْعَةَ لَبُوسٍ (সান’আতা লাবুসিন): সুরক্ষা বর্ম বা আত্মরক্ষামূলক পোশাক তৈরির শিল্প; মেটাফোরিক্যালি—সমাজে ফাসাদ বা দ্বন্দ্বের সময় নিজেদের রক্ষা করার সুরক্ষামূলক কৌশল ও নিয়মতান্ত্রিক কাঠামো।
لِتُحْصِنَكُم (লিতুহসিনাকুম): নিজেদের নিরাপদ দুর্গে সুরক্ষিত রাখা বা ক্ষতিকর শক্তির আক্রমণ প্রতিহত করা। এর অর্থ বিবাহিত নারী বা স্বামী রক্ষা করা নয়; বরং এমন দুর্ভেদ্য নৈতিক বর্ম, প্রাচীর বা নিরাপদ বেষ্টনীতে আবদ্ধ করা, যা কোনো অন্যায় বা পারস্পরিক বিপর্যয়কে ভেতরে ঢুকতে দেয় না।
بَأْسِكُمْ (বাসিকুম): মানুষের ভেতরের পারস্পরিক তীব্র সংঘাত, বিপর্যয়, অবাধ্যতা বা যুদ্ধংদেহী মনোভাব।
وَعَلَّمْنَاهُ (ওয়া আল্লামনাহু): প্রথাগত “শিক্ষা দিয়েছিলাম” নয়; বরং “তার উচ্চতর বৈজ্ঞানিক প্রায়োগিক জ্ঞানকে ফলপ্রসূ ও কার্যকর করলাম”।
شَاكِرُونَ (শাকিরুন): আল্লাহর দেওয়া সম্পদ বা বুদ্ধিমত্তাকে সঠিক উপায়ে কল্যাণের কাজে ব্যবহার করা (কৃতজ্ঞ হওয়া)।
***এবং আমি তাকে তোমাদের উপকারের জন্য এমন এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক ও আচরণগত বর্ম বা সুরক্ষাকবচ তৈরির শিল্প এবং তার উচ্চতর বৈজ্ঞানিক প্রায়োগিক জ্ঞানকে ফলপ্রসূ ও কার্যকর করলাম (আল্লামনাহু), যা তোমাদের পারস্পরিক সংঘাত, তীব্র অহমিকা ও বিপর্যয় (বাস্) থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত, নিরাপদ ও দুর্ভেদ্য বেষ্টনীতে আবদ্ধ (তুহসিনাকুম) রাখে। অতএব, তোমরা কি এই সুরক্ষিত নিয়মের প্রতি সজ্ঞানে কৃতজ্ঞ বা স্বীকৃতি প্রকাশকারী (শাকিরুন) হবে?
আয়াত ৮১ (Verse 21:81)
আরবি পাঠ: وَلِسُلَيْمَانَ الرِّيحَ عَاصِفَةً تَجْرِي بِأَمْرِهِ إِلَى الْأَرْضِ الَّتِي بَارَكْنَا فِيهَا ۚ وَكُنَّا بِكُلِّ شَيْءٍ عَالِمِينَ
الرِّيحَ (আর্-রীহা): রূপক অর্থে কোনো রাষ্ট্র বা আন্দোলনের তীব্র সামাজিক বা রাজনৈতিক গতিবেগ, প্রভাব, বা দ্রুতগামী জনশক্তি। প্রথাগত আবহাওয়া বা ভৌত বাতাস নয়; বরং সমাজে অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়া তথ্যপ্রবাহ, যোগাযোগের মাধ্যম, গণসংযোগ বা কোনো আদর্শিক গতিশীল চালিকা শক্তি।
بِأَمْرِهِ (বি-আমরিহি): তাঁর আদেশে নয়; বরং তাঁর দ্বারা বাস্তবায়িত সুনির্দিষ্ট ঐশ্বরিক আইন, বিধিমালা বা আইনি এক্তিয়ারের ভিত্তিতে।
عَاصِفَةً (আ-সিফাতান): অত্যন্ত শক্তিশালী, প্রবল, বা দ্রুতগতিসম্পন্ন রূপ।
إِلَى الْأَرْضِ (ইলাল আরয): প্রথাগত জড় মাটি বা ভৌত কোনো দেশ নয়; বরং মানুষের বাস্তব জীবন, সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রীয় ভিত্তি।
بَارَكْنَا (বারাকনা): প্রবৃদ্ধি, কল্যাণ ও টেকসই প্রাচুর্য দান করা।
- অনুবাদ: “এবং আমরা সুলাইমানের অধীনস্থ করেছিলাম প্রবল ও অত্যন্ত শক্তিশালী সামাজিক গতিবেগ বা দ্রুতগামী জনশক্তিকে (الرِّيحَ عَاصِفَةً); যা তার আদেশেই সেই ভূখণ্ডের দিকে প্রবাহিত হতো, যাকে আমরা বিশ্ববাসীর জন্য প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধিময় (بَارَكْنَا) করে রেখেছি; এবং আমরা প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত।”
আর আমি সেই শান্তি, নিরাপত্তা ও সুসংহত শাসনব্যবস্থার (সুলায়মান) অধীন বা অনুকূলে করে দিয়েছি অত্যন্ত দ্রুতগামী চালিকা শক্তি, তথ্যপ্রবাহ বা যোগাযোগ মাধ্যমকে (রীহ), যা ছিল অত্যন্ত প্রবল (আসিফাতান) এবং যা তার দেওয়া সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা (আমর) অনুসারে সেই সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর (আরয) অভিমুখে ছুটে চলত, যেখানে আমি মানবজাতির প্রবৃদ্ধি ও কল্যাণ (বারাকাত) রেখেছিলাম; আর আমি প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে পূর্ণ অবগত বা পরম জ্ঞানসম্পন্ন।
আয়াত ৮২ (Verse 21:82)
আরবি পাঠ: وَمِنَ الشَّيَاطِينِ مَن يَغُوصُونَ لَهُ وَيَعْمَلُونَ عَمَلًا دُونَ ذَٰلِكَ ۖ وَكُنَّا لَهُمْ حَافِظِينَ
- الشَّيَاطِينِ (আশ-শায়াত্বীন): সমাজ ও আইনের বিদ্রোহী, চক্রান্তকারী, বা এমন একগুঁয়ে উগ্র মানসিকতার লোক যাদের সাধারণত নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন। কোনো কাল্পনিক অদৃশ্য জিন-ভূত নয়; বরং সমাজে বিদ্যমান অত্যন্ত অবাধ্য, চরমপন্থী, স্বার্থপর ও চক্রান্তকারী মানুষ বা শক্তির সমষ্টি, যারা মূল ধারাকে অমান্য করতে চায়।
- يَغُوصُونَ (ইয়াগূসূন): গভীর অনুসন্ধান চালানো, কোনো ব্যবস্থার গভীরে প্রবেশ করে রহস্য উন্মোচন করা বা কঠিন শ্রমসাধ্য কাজ করা (ডুব দেওয়া)। প্রথাগত পানিতে ডুব দেওয়া নয়; বরং কোনো জটিল বিষয়ের গভীরে যাওয়া, তাত্ত্বিক রহস্য উন্মোচন করা অথবা কোনো কঠিন অনুসন্ধানী কাজে লিপ্ত হওয়া।
- অনুবাদ: “এবং সেই অবাধ্য ও বিদ্রোহী মানসিকতার লোকদের (الشَّيَاطِينِ) মধ্য থেকেও কিছু লোককে তার অধীনস্থ করেছিলাম, যারা তার নির্দেশে গভীর অনুসন্ধান বা শ্রমসাধ্য কাজ করত (يَغُوصُونَ) এবং এছাড়া অন্য আরও অনেক কাজ সম্পন্ন করত; এবং আমরাই তাদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারী রাখতাম।”
আর অবাধ্য, চরমপন্থী ও চক্রান্তকারী মানসিকতার শক্তিসমূহের (শয়তানদের) মধ্য থেকে কিছু এমন উপাদান বা শক্তি ছিল যা সেই শাসনব্যবস্থার সেবায় নিয়োজিত থেকে বিভিন্ন গভীরতম জ্ঞান, তত্ত্ব ও অজানা রহস্যের গভীরে ডুব (ইয়াগুসূন) দিত এবং এ ছাড়া সমাজে অন্যান্য বহুবিধ কঠিন ও জটিল গঠনমূলক কাজ সম্পন্ন করত; আর আমিই তাদেরকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে, নজরে ও সুরক্ষায় রাখতাম।
আয়াত ৮৩ (Verse 21:83)
আরবি পাঠ: وَأَيُّوبَ إِذْ نَادَىٰ رَبَّهُ أَنِّي مَسَّنِيَ الضُّرُّ وَأَنتَ أَرْحَمُ الرَّاحِمِينَ
- ادَىٰ رَبَّهُ (না-দা রব্বাহু): তার প্রতিপালকের ক্রমবিকাশমান নিয়মের কাছে তীব্র আহ্বান জানানো।
نَادَىٰ (নাদা): কোনো অলৌকিক বা নিষ্ক্রিয় মুখে ডাকা বা কাতর প্রার্থনা নয়; বরং নিজের অবস্থা, উদ্দেশ্য বা লক্ষ্যকে আল্লাহর বিধিমালার সামনে বাস্তব কর্মের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করা, প্রকটিত করা বা ঘোষণা করা।
الضُّرُّ (আয-যুররু): তীব্র ক্ষতি, বিপর্যয়, সংকট, বা দীর্ঘস্থায়ী কোনো তীব্র কষ্ট। প্রতিপক্ষের আক্রমণ বা চরম প্রতিকূলতার ফলে সৃষ্ট তীব্র মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক ক্ষতি বা সংকুচিত অবস্থা
أَيُّوبَ (আইয়ূব): আরবি ধাতুগত অর্থ (A-W-B / আওবা) এবং শব্দকোষের দর্শন অনুযায়ী, যা “যিনি বারবার আল্লাহর দিকে ফিরে আসেন, চরম প্রতিকূলতার মাঝেও সমাজ সংস্কারের মূল দায়িত্বে দৃঢ়ভাবে ফিরে আসা অবিচল মানসিকতা”-কে নির্দেশ করে। - অনুবাদ: “এবং আইয়ুবের কথা স্মরণ করো, যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান জানিয়ে বলেছিল, ‘নিশ্চয়ই তীব্র ক্ষতি ও বিপর্যয় (الضُّرُّ) আমাকে গ্রাস করেছে; অথচ আপনিই তো সকল দয়াবানের চেয়ে শ্রেষ্ঠ দয়াময়।’”
আর স্মরণ করুন সেই চরম ধৈর্যশীল ও সমাজ সংস্কারের মূল দায়িত্বে দৃঢ়ভাবে ফিরে আসা অবিচল মানসিকতাকে (আইয়ূব); যখন সে তার প্রতিপালকের লালন ও বিকাশকারী বিধিমালার (রব্ব) সম্মুখে নিজের বাস্তব কর্মের মাধ্যমে এই সুনির্দিষ্ট সত্য উত্থাপন বা প্রকটিত করল (নাদা) যে— “নিশ্চয়ই চরম কষ্ট, প্রতিপক্ষের আঘাত ও তীব্র সামাজিক সংকুচিত অবস্থা (যুর্র) আমাকে স্পর্শ করেছে; আর আপনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু, পরম অনুকম্পাকারী ও সমস্ত লালনকারী শক্তির প্রকৃত আশ্রয় (আরহামুর রাহিমীন)।
আয়াত ৮৪ (Verse 21:84)
আরবি পাঠ: فَاسْتَجَبْنَا لَهُ فَكَشَفْنَا مَا بِهِ مِن ضُرٍّ ۖ وَآتَيْنَاهُ أَهْلَهُ وَمِثْلَهُم مَّعَهُمْ رَحْمَةً مِّنْ عِندِنَا وَذِكْرَىٰ لِلْعَابِدِينَ
- ফَكَشَفْنَا (ফাকাশাফনা): কোনো আবরণ বা সংকটের অবসান ঘটিয়ে তা দূর করা বা উন্মোচন করা।
- أَهْلَهُ (আহলাহু): can mean family, but also dedicated caretaker/ideological team/support system.
কোনো নিষ্ক্রিয় ‘দোয়ায় সাড়া দেওয়া’ নয়; বরং আল্লাহর আইনি ব্যবস্থার প্রতি মানুষের সক্রিয় সাড়া বা কর্মের বিপরীতে সেই ঐশ্বরিক সিস্টেমের মাধ্যমে ফলাফল কার্যকর, ফলপ্রসূ বা বাস্তবায়িত হওয়া। - لِلْعَابِدِينَ (লিল-আ-বিদীন): যারা আল্লাহর বিধান অনুসরণের কঠিন শ্রম ও সংগ্রামে নিয়োজিত।
- অনুবাদ: “অতঃপর আমরা তার আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তার যে বিপর্যয় ও তীব্র ক্ষতি (ضُرٍّ) ছিল তা দূর করে দিলাম (فَكَشَفْنَا); এবং তাকে তার সেই আদর্শিক দায়িত্বশীল ও সহযোগী দল (أَهْلَهُ) পুনরায় ফিরিয়ে দিলাম এবং তাদের সাথে সমপরিমাণ আরও যুক্ত করলাম—আমাদের পক্ষ থেকে বিশেষ রহমত এবং আমাদের নিয়মের অধীনে কঠোর সংগ্রামকারীদের জন্য (لِلْعَابِدِينَ) এক অনুস্মরণীয় শিক্ষা ও স্মারক হিসেবে।”
***ফলশ্রুতিতে তার সেই বিচ্যুতিহীন ফিরে আসার প্রচেষ্টার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমার প্রাকৃতিক ও সামাজিক নিয়ম কাজ করে তার সেই কর্মকে কার্যকর বা ফলপ্রসূ করল (ফাস্তাজাবনা) এবং তার যে চরম কষ্ট ও সংকুচিত অবস্থা (যুর্র) ছিল তা সম্পূর্ণরূপে উন্মোচন ও দূর করে দিল। আর আমি তাকে তার দায়িত্বাধীন অনুসারী সমাজকে (আহল) পুনরায় ফিরিয়ে এনে যুক্ত করলাম এবং নিজের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুগ্রহ (রহমত) হিসেবে তাদেরকে সমপরিমাণ আরও যোগ্য শক্তিতে সমৃদ্ধ বা ধন্য করলাম; যাতে আমার নিয়মাবলীর প্রতি অনুগত সমর্পিত বান্দারা (আবেদীন) এখান থেকে সঠিক শিক্ষা ও বাস্তব দিকনির্দেশনা (যিকরা) লাভ করতে পারে।
আয়াত ৮৫ (Verse 21:85)
আরবি পাঠ: وَإِسْمَاعِيلَ وَإِدْرِيسَ وَذَا الْكِفْلِ ۖ كُلٌّ مِّنَ الصَّابِرِينَ
- الصَّابِرِينَ (আস-সাবিরীন): ফাইলের ১৩ নম্বর পৃষ্ঠা অনুযায়ী—কোনো সত্য বা লক্ষ্য অর্জনে অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল থাকা, প্রতিকূলতার মুখেও নিজ কর্তব্যে অটল থাকা।
إِسْمَاعِيلَ (ইসমাইল): ভৌত নাম নয়; আরবি ধাতুগত অর্থ (Sh-M-A / সামা এবং ইলাহ) এবং শব্দকোষের দর্শন অনুযায়ী, যা “আল্লাহর বাণীকে মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তার প্রতি পূর্ণ অনুগত হওয়া”-র প্রতীক।
إِدْرِيسَ (ইদরীস): ভৌত নাম নয়; আরবি ধাতুগত অর্থ (D-R-S / দারাসা) এবং শব্দকোষের দর্শন অনুযায়ী, যা “ঐশ্বরিক জ্ঞান নিয়ে নিবিড়ভাবে গবেষণা করা, শিক্ষা দেওয়া এবং তত্ত্বের গভীরে যাওয়া”-র মানসিকতা।
وَذَا الْكِفْلِ (যুল-কিফল): ভৌত নাম নয়; আরবি অর্থ (K-F-L / কিফল) অনুযায়ী, যার অর্থ “দ্বিগুণ অংশ বা এমন কোনো নির্ভরযোগ্য জিম্মাদার/অভিভাবক যে পুরো সমাজকে নিজের সুরক্ষার বলয়ে আগলে রাখে”।
الصَّابِرِينَ (আস-সাবিরীন): যারা আল্লাহর দেওয়া সুনির্দিষ্ট বিধানের ওপর কোনো প্রকার বিচ্যুতি ছাড়া দৃঢ়ভাবে ও অবিচলভাবে টিকে থাকে।
- অনুবাদ: “এবং ইসমাইল, ইদরিস ও যুল-কিফলের কথা স্মরণ করো; তারা প্রত্যেকেই ছিল চরম প্রতিকূলতার মুখেও নিজ কর্তব্যে অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল (مِّنَ الصَّابِرِينَ)।”
***আর স্মরণ করুন সেই মানসিকতা বা সমাজকে যা ঐশ্বরিক নিয়ম ও সত্যবাণী শোনার পর পরম বাধ্যতা দেখায় (ইসমাইল), সেই শক্তিকে যা আল্লাহর দেওয়া জ্ঞানকে গভীরভাবে অধ্যয়ন, বিশ্লেষণ ও সমাজ-শিক্ষায় আত্মনিয়োগ করে (ইদরীস) এবং সেই নেতৃত্ব বা সামাজিক কাঠামোকে যা মানবতার কল্যাণে দ্বিগুণ দায়বদ্ধতা ও সুরক্ষার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় (যুল-কিফল); তারা প্রত্যেকেই ছিল চরম সত্য ও ঐশ্বরিক বিধানের পথে বিচ্যুতিহীন, দৃঢ়পদ ও নিরলস পরিশ্রমী (সাবিরীন)।
আয়াত ৮৬ (Verse 21:86)
আরবি পাঠ: وَأَدْخَلْنَاهُمْ فِي رَحْمَتِنَا ۖ إِنَّهُم مِّنَ الصَّالِحِينَ
رَحْمَتِنَا (রহমত): কেবল ভৌত দয়া বা আবেগ নয়; বরং এমন এক ঐশ্বরিক নিরাপত্তা ও প্রবৃদ্ধির পরিবেশ যা ব্যক্তির কর্মের শক্তিকে বাড়িয়ে দেয়।
الصَّالِحِينَ (সালেহীন): যারা নিজেদের সমাজ ও জীবনকে বিকৃতি থেকে মুক্ত করে সংশোধন (ইসলাহ) এবং সঠিক ভারসাম্যে পরিচালনা করে। যারা বিশৃঙ্খলা দূর করে সমাজে ইতিবাচক রূপান্তর আনেন।
- অনুবাদ: “এবং আমরা তাদেরকে আমাদের বিশেষ নিরাপত্তা বলয় ও রহমতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলাম; নিশ্চয়ই তারা ছিল প্রকৃত সমাজ সংস্কারক ও ভারসাম্য রক্ষাকারীদের (الصَّالِحِينَ) অন্তর্ভুক্ত।”
***আর আমি তাদেরকে আমার পরম করুণা, প্রবৃদ্ধি ও সার্বিক সুরক্ষার (রহমত) অবয়বে সম্পূর্ণরূপে অন্তর্ভুক্ত করে নিলাম; প্রকৃতপক্ষে তারা সবাই ছিল সমাজ ও জীবন সংস্কারক ভারসাম্যপূর্ণ মানুষদের (সালেহীন) অন্তর্ভুক্ত।
আয়াত ৮৭ (Verse 21:87)
আরবি পাঠ: وَذَا النُّونِ إِذ ذَّهَبَ مُغَاضِبًا فَظَنَّ أَن لَّن نَّقْدِرَ عَلَيْهِ فَنَادَىٰ فِي الظُّلُمَاتِ أَن لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
ذَا النُّونِ (যা নুন): কোনো “মাছের মালিক” বা ব্যক্তি ইউনূস নন; আরবি ‘নুন’ শব্দের ধাতুগত অর্থ এবং তাত্ত্বিক দর্শন অনুযায়ী, যা “গভীর প্রজ্ঞা অর্জন করা, জ্ঞানকে নিজের মাঝে মৎস্যের মতো আত্মস্থ করা এবং সমাজকে ধরে রাখার মতো একটি মজবুত ভিত্তির অধিকারী মানসিকতা”।
مُغَاضِبًا (মুগাদিবান): প্রথাগত অযৌক্তিক রাগ নয়; বরং সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের অবাধ্যতার কারণে তৈরি হওয়া “তীব্র মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ বা আত্মমর্যাদাবোধ”।
لَنْ نَقْدِرَ (লান নাক্বদিরা): ক্ষমতা না থাকা নয়, আল্লাহর নিয়মতান্ত্রিক বিধিমালার আলোকে “কোনো কিছুর পরিমাপ করা, সংকীর্ণতা তৈরি করা বা সুনির্দিষ্ট দায়বদ্ধতার ফয়সালা করা”।
الظُّلُمَاتِ (আয-জুলুমাত): অন্ধকার বা মাছের পেট নয়; বরং সমাজে ছড়িয়ে থাকা “চরম অজ্ঞতা, কুসংস্কার, নৈতিক অবক্ষয় এবং কুফরির অন্ধকার বলয়”।
الظَّالِمِينَ (জালিমীন): শব্দকোষের ৪ নম্বর পৃষ্ঠার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, “যারা আল্লাহর দেওয়া ভারসাম্যপূর্ণ সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা সীমানা লঙ্ঘন করে নিজের বা সমাজের ক্ষতি ডেকে আনে”।
إِلَٰهَ (ইলাহা): চূড়ান্ত আইনপ্রণেতা, হুকুমত বা কর্তৃত্বের মালিক।
سُبْحَانَكَ (সুবহানাকা): আপনি সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে মুক্ত এবং আপনার নিয়ম নিখুঁত ও গতিশীল।
الظَّالِمِينَ (আয-জ্বালিমীন): যারা নিজের ওপর বা ভারসাম্যপূর্ণ নিয়মের ওপর অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্যায় বা সীমালঙ্ঘন করে।
- অনুবাদ: “এবং যুন-নূনের (মাছের সহচর/ইউনুস) কথা স্মরণ করো, যখন সে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে (তার সমাজ ছেড়ে) চলে গিয়েছিল এবং ভেবেছিল যে আমরা তার ওপর কোনো সংকটের গণ্ডি টেনে দেব না; অতঃপর সে চরম হতাশা ও সংকটের অন্ধকারের মধ্য থেকে (فِي الظُّلُمَاتِ) তীব্র আহ্বান জানিয়ে বলল, ‘আপনি ছাড়া কোনো চূড়ান্ত বিধানদাতা বা হুকুমতের মালিক নেই (لَّا إِلَٰهَ إِلَّا أَنتَ); আপনি সমস্ত ত্রুটি থেকে মুক্ত (سُبْحَانَكَ)! নিশ্চয়ই আমি নিজের ওপরই ভারসাম্যহীনতা চাপিয়ে সীমালঙ্ঘনকারীদের (الظَّالِمِينَ) অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলাম।’”
***আর স্মরণ করুন সেই মানসিকতা বা শক্তিকে যা সমাজ সংস্কারে দৃঢ়ভাবে টিকে থাকার জন্য গভীর প্রজ্ঞা, মৎস্যসদৃশ আত্মস্থ করার ক্ষমতা এবং নিজস্ব ভিত্তির অধিকারী (যা নুন); যখন সে প্রতিপক্ষের অন্যায়ের কারণে তীব্র মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ বা ক্ষোভ (মুগাদিবান) নিয়ে চলে গিয়েছিল, এবং ধারণা করেছিল যে আমি তার এই কর্মপদ্ধতির ওপর কোনো পরিমাপ, জবাবদিহিতা বা সংকীর্ণতা (নাক্বদিরা) আরোপ করব না। অতঃপর যখন সে চারপাশের অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির তীব্র সামাজিক অন্ধকারের (জুলুমাত) মুখোমুখি হয়ে নিজের বাস্তব কর্মের মাধ্যমে এই পরম সত্য প্রকটিত বা উপস্থাপন করল (নাদা) যে— “আপনি ব্যতীত অনুসরণযোগ্য কোনো আইন বা সার্বভৌম বিধানদাতা (ইলাহ) নেই; আপনার সমস্ত নিয়মাবলি ত্রুটিহীন, ভারসাম্যপূর্ণ ও পরম পবিত্র (সুবহানাকা), আর আমিই নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্বে অবহেলা বা ভারসাম্যহীনতা তৈরি করে অন্যায়কারীদের (জালিমীন) অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলাম।”
আয়াত ৮৮ (Verse 21:88)
আরবি পাঠ: فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَنَجَّيْنَاهُ مِنَ الْغَمِّ ۚ وَكَذَٰلِكَ نُنجِي الْمُؤْمِنِينَ
- فَاسْتَجَبْنَا (ফাস্টাজাবনা): কোনো নিষ্ক্রিয় ‘প্রার্থনায় সাড়া দেওয়া’ নয়; বরং আল্লাহর আইনি ও প্রাকৃতিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের সক্রিয় সাড়া বা কর্মের বিপরীতে সেই ঐশ্বরিক সিস্টেমের মাধ্যমে “ফলাফল অবধারিত হওয়া বা কর্মটি সম্পূর্ণরূপে ফলপ্রসূ হওয়া”।
وَنَجَّيْنَاهُ (ওয়া নাজ্জাইনাহু): প্রথাগত অলৌকিক বা নিষ্ক্রিয় “উদ্ধার” নয়; জ্ঞান ও প্রজ্ঞার সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে “ক্ষতিকর অবস্থা বা বিপর্যয় থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে বের করে আনা (Extracted/Exited)”।
الْغَمِّ (আল-গাম্ম): বাহ্যিক কোনো বিপদ নয়; বরং সত্য প্রতিষ্ঠার পথে সাময়িক ব্যর্থতা বা প্রতিবন্ধকতার কারণে তৈরি হওয়া “তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বিষাদ, দমবন্ধ করা হতাশা বা আত্মিক জট”।الْمُؤْمِنِينَ (মুমিনীন): আমান’ ও ‘ঈমান’ অধ্যায়ের মূল বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, “যারা নিজেদের আকল ও বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সত্যের ওপর গভীর প্রত্যয় স্থাপন করে এবং সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্রিয় থাকে”। - অনুবাদ: “অতঃপর আমরা তার আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাকে সেই চরম মানসিক অবরুদ্ধতা ও হতাশা (مِنَ الْغَمِّ) থেকে মুক্ত করলাম; আর এভাবেই আমরা পরম প্রত্যয় ও বিশ্বাস স্থাপনকারীদের (الْمُؤْمِنِينَ) উদ্ধার করে থাকি।”
***ফলশ্রুতিতে তার সেই নিজের ভুল অনুধাবন করে ফিরে আসার সক্রিয় কর্মের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমার ঐশ্বরিক নিয়ম কাজ করে তার সেই কর্মকে কার্যকর বা ফলপ্রসূ করল (ফাস্টাজাবনা), এবং তাকে সেই তীব্র মানসিক বিষাদ, দমবন্ধ করা হতাশা ও সংকুচিত পরিস্থিতি (গাম্ম) থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে বের করে আনল; আর এই একই নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমি সেইসব মানুষদের নিষ্কৃতি দিয়ে বের করে আনি এবং জীবনের পথ দেখাই যারা আমার দেওয়া বিধানের ওপর গভীর মানসিক প্রত্যয় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে (মুমিনীন)।
আয়াত ৮৯ (Verse 21:89)
আরবি পাঠ: وَزَكَرِيَّا إِذْ نَادَىٰ رَبَّهُ رَبِّ لَا تَذَرْنِي فَرْدًا وَأَنتَ خَيْرُ الْوَارِثِينَ
زَكَرِيَّا (যাকারিয়া): ভৌত কোনো ব্যক্তির নাম নয়; আরবি ধাতুগত অর্থ (Z-K-R / যিকর) যা “আল্লাহর আইনকে সদা স্মরণ রাখা, সমাজকে জাগ্রত রাখা এবং সংস্কারের বিশুদ্ধ জিম্মাদারি পালনকারী মানসিকতা”।
نَাদَىٰ (নাদা): কোনো অলৌকিক প্রার্থনা বা মুখে ডাকা নয়; বরং নিজের অবস্থা বা উদ্দেশ্যকে আল্লাহর বিধিমালার সামনে বাস্তব কর্মের মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে উপস্থাপন করা বা প্রকটিত করা।
فَرْدًا (ফারদান): প্রথাগত ‘সন্তানহীন’ নয়; বরং কোনো বড় উদ্দেশ্য বা সংস্কারের কাজে “একাকী, নিঃসঙ্গ বা কোনো যোগ্য সহযোগী বা অনুসারী দল না থাকা”।
খাইরুল ওয়ারিথীন (خَيْرُ الْوَارِثِينَ): “যিনি সৃষ্টির সমস্ত কিছুর অবসান বা পরিবর্তনের পরেও চূড়ান্ত ধারক, স্থলাভিষিক্ত বা সর্বোত্তম উত্তরাধিকারী হিসেবে অবিনশ্বর থাকেন”।
- অনুবাদ: “এবং জাকারিয়ার কথা স্মরণ করো, যখন সে তার প্রতিপালককে আহ্বান করে বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এই সংস্কার আন্দোলনে একাকী বা উত্তরাধিকারহীন অবস্থায় রেখে দেবেন না (لَا تَذَرْنِي فَرْدًا); যদিও আপনিই তো সর্বোত্তম চিরস্থায়ী উত্তরাধিকারী (خَيْرُ الْوَارِثِينَ)।’”
**আর স্মরণ করুন সেই মানসিকতা বা সংস্কারমুখী শক্তিকে যা আল্লাহর আইনকে সদা স্মরণ রাখে, বিশুদ্ধ রাখে এবং সমাজকে জাগ্রত করার জিম্মাদারি পালন করে (যাকারিয়া); যখন সে তার প্রতিপালকের লালন ও বিকাশকারী বিধিমালার (রব্ব) সম্মুখে নিজের বাস্তব কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য উত্থাপন করল (নাদা) যে— “হে আমার প্রতিপালক! আমাকে সমাজে একাকী, নিঃসঙ্গ বা অনুসারীহীন (ফারদান) অবস্থায় ছেড়ে রাখবেন না, যদিও আপনিই হলেন সর্বোত্তম স্থলাভিষিক্ত বা প্রকৃত উত্তরাধিকারী (খাইরুল ওয়ারিথীন)।”
আয়াত ৯০ (Verse 21:90)
আরবি পাঠ: فَاسْتَجَبْنَا لَهُ وَوَهَبْنَا لَهُ يَحْيَىٰ وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ ۚ إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا ۖ وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ
- زَوْجَهُ (যাওজাহু): তার বৈবাহিক সঙ্গী; ধারণাগতভাবে—তার সংস্কার কাজের যোগ্য পরিপূরক বা সহযোগী অংশীদার।
- يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ (ইউসারীঊনা ফিল খাইরাত): সমাজ ও মানুষের প্রগতিশীল কল্যাণমূলক কাজে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে প্রতিযোগিতা করা।
- خَاشِعِينَ (খাশীঈন): পরম শ্রদ্ধা, বিনম্রতা ও আনুগত্যের সাথে আল্লাহর আইনের সামনে মাথা নত করা।
فَاسْتَجَبْنَا (ফাস্টাজাবনা): কোনো নিষ্ক্রিয় ‘প্রার্থনায় সাড়া দেওয়া’ নয়; বরং আল্লাহর নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের সক্রিয় সাড়া বা কর্মের বিপরীতে সেই ঐশ্বরিক সিস্টেমের মাধ্যমে “কোনো সামাজিক বা প্রাকৃতিক নিয়ম কাজ করে কর্মটি সম্পূর্ণরূপে ফলপ্রসূ ও কার্যকর করা” (p. 12)।
وَوَهَبْنَا (ওয়া-ওয়াহাবনা): প্রথাগত কোনো বাহ্যিক বস্তু বা সন্তান দান করা নয়; বরং কোনো পবিত্র গুণ, সামর্থ্য বা আদর্শিক যোগ্যতায় সত্তাকে ধন্য বা আশীর্বাদপুষ্ট করা।
يَحْيَىٰ (ইয়াহইয়া): ভৌত নাম নয়; আরবি ধাতুগত অর্থ (H-Y-Y / হাইয়্যা) অনুযায়ী, যা “জীবন্ত শক্তি, মৃতপ্রায় সমাজকে জাগ্রত করার ক্ষমতা, বুদ্ধিবৃত্তিক পুনরুজ্জীবন বা সদা সজীব মানসিকতা”।
وَأَصْلَحْنَا لَهُ زَوْجَهُ (ওয়া আসলহনা লাহু যাওজাহু): প্রথাগত ‘স্ত্রীর বন্ধ্যাত্ব দূর করা’ নয়; বরং তার লক্ষ্য অর্জনে পাশে থাকা “সহযোগী, জোড় বা পরিপূরক শক্তিকে বিকৃতি থেকে মুক্ত করে সম্পূর্ণ সংশোধন, যোগ্য ও উর্বর” করে তোলা।
- অনুবাদ: “অতঃপর আমরা তার আহ্বানে সাড়া দিলাম এবং তাকে উপহার হিসেবে ‘ইয়াহইয়া’ দান করলাম এবং তার আন্দোলনের যোগ্য সহযোগী অংশীদারকে (زَوْجَهُ) তার জন্য উপযুক্ত বা ত্রুটিমুক্ত করলাম; নিশ্চয়ই তারা প্রগতিশীল কল্যাণকর কাজে তীব্র গতিতে এগিয়ে যেত (يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ) এবং আশা ও ভয়ের সাথে আমাদের বিধানকে আহ্বান করত; এবং তারা আমাদের আইনের প্রতি সম্পূর্ণ বিনম্র ও অনুগত ছিল (خَاشِعِينَ)।”
**ফলশ্রুতিতে তার সেই সক্রিয় সংস্কারমূলক কর্মের সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমার ঐশ্বরিক নিয়ম কাজ করে তার সেই কর্মকে কার্যকর বা ফলপ্রসূ করল (ফাস্টাজাবনা), এবং আমি তাকে এমন এক নতুন জীবনীশক্তি, গতিশীলতা ও বৈপ্লবিক অনুসারী দল দিয়ে আশীর্বাদপুষ্ট বা ধন্য করলাম যা মৃতপ্রায় সমাজকে পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম (ইয়াহইয়া); এবং তার সাথে যুক্ত সহযোগী বা পরিপূরক শক্তিকে (যাওজাহু) সংশোধন করে ভারসাম্যপূর্ণ ও উর্বর (আসলহনা) করে দিলাম। নিশ্চয়ই তারা সবাই কল্যাণকর ও উৎকৃষ্ট কাজের দিকে তীব্র গতিতে প্রতিযোগিতা করত, এবং তীব্র আগ্রহ-আकाঙ্ক্ষা (রাগান) এবং জবাবদিহিতার ভয় ও সতর্কতা (রাহাবান) নিয়ে আমাদের বিধানের অনুবর্তী হতো; আর তারা ছিল আমাদের সিস্টেম বা নিয়মের সামনে পরম অনুগত ও বিনম্র (খাশিয়ীন)
আয়াত ৯১ (Verse 21:91)
আরবি পাঠ: وَالَّتِي أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا فَنَفَخْنَا فِيهَا مِن رُّوحِنَا وَجَعَلْنَاهَا وَابْنَهَا آيَةً لِّلْعَالَمِينَ
- أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا (আহসানাত ফারজাহা): নিজেকে বা নিজের কাজের ক্ষেত্রকে এমন দুর্ভেদ্য নৈতিক বর্ম, প্রাচীর বা নিরাপদ বেষ্টনীতে আবদ্ধ করা, যা কোনো অন্যায় বা বিকৃতিকে ভেতরে ঢুকতে দেয় না
فَرْجَهَا (ফাজাহা): গোপন অঙ্গ বা লজ্জাস্থান নয়; বরং মানুষের চরিত্রের বা কর্মের উন্মুক্ত প্রবেশদ্বার, নিজস্ব কর্মক্ষেত্র বা সততার সীমানা, যা কোনো কলুষতা থেকে সুরক্ষিত রাখা আবশ্যক।
فَنَفَخْنَا فِيهَا مِنْ رُوحِنَا (ফানাফাখনা ফীহা মিন রূহিনা): প্রথাগত ‘গর্ভে ফুঁ দেওয়া’ নয়; বরং কোনো সুরক্ষিত ও নিষ্কলুষ কাঠামোর ভেতরে আল্লাহর ওহী, ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা ও জীবনমুখী খাঁটি বৈপ্লবিক চেতনার তীব্র সঞ্চার ঘটানো বা কিতাবের হিদায়াত দ্বারা অনুপ্রাণিত করা।
وَابْنَهَا (ওয়া ইবনাহা): ভৌত কোনো পুত্র সন্তান বা ঈসা নন বরং পূর্ববর্তী সুরক্ষার ফসল হিসেবে উৎপাদিত বা উৎসারিত পরবর্তী যোগ্য প্রজন্ম, অনুসারী শক্তি বা সেই বৈপ্লবিক চেতনার বাস্তব বৈজ্ঞানিক সামাজিক ফলাফল - رُّوحِنَا (রূহীনী): আল্লাহর জ্ঞান, ওহী বা ঐশী চেতনা যা মানুষকে উজ্জীবিত করে।
- অনুবাদ: “এবং সেই নারীর (মারইয়াম) কথা স্মরণ করো, যে নিজের চরিত্রের পবিত্রতা ও সত্ত্বার সীমানাকে দুর্গের মতো সুসংরক্ষিত রেখেছিল (أَحْصَنَتْ فَرْجَهَا); অতঃপর আমরা তার মধ্যে আমাদের ঐশী চেতনা বা ওহীর আলো দ্বারা এক অনন্য রূপান্তর ঘটিয়েছিলাম (فَنَفَخْنَا فِيهَا مِن رُّوحِنَا) এবং তাকে ও তার সন্তানকে বিশ্ববাসী ও জ্ঞানবানদের সবার জন্য এক অকাট্য বাস্তব নিদর্শন (آيَةً لِّلْعَالَمِينَ) বানিয়েছিলাম।”
***আর স্মরণ করুন সেই চিন্তা, নিষ্ঠা বা সামাজিক শক্তিকে যা নিজের নৈতিকতা, সততা, চরিত্র ও সুনির্দিষ্ট কর্ম-সীমানাকে অত্যন্ত দুর্ভেদ্য প্রাচীরে সম্পূর্ণরূপে সুরক্ষিত বা অবরুদ্ধ রেখেছিল (আহসানাত ফাজাহা); অতঃপর আমি তার ভেতরে আমার ওহী, ঐশ্বরিক জ্ঞান ও জীবনমুখী চেতনার (রুহিনা) সঞ্চার ঘটিয়ে তাকে এক বৈপ্লবিক ও সজীব শক্তিতে রূপান্তর (নাফাখনা) করলাম, এবং তাকে ও তার থেকে উৎসারিত সেই নতুন আদর্শিক ফলাফল, কর্মের ফসল বা যোগ্য প্রজন্মকে (ইবনাহা) সমগ্র মহাবিশ্ব, সমস্ত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা এবং সকল জ্ঞান অন্বেষণকারী বিশেষজ্ঞদের (আলামীন) জন্য একটি প্রামাণ্য সামাজিক নিদর্শন ও সুস্পষ্ট পথনির্দেশ (আয়াতান) হিসেবে মনোনীত ও নিযুক্ত করলাম (জা’আলনাহা)
আয়াত ৯২ (Verse 21:92)
আরবি পাঠ: إِنَّ هَٰذِهِ أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَأَنَا رَبُّكُمْ فَاعْبُدُونِ
- أُمَّتُكُمْ (উম্মাতুকুম): প্রথাগত ‘ধর্মীয় জাতি বা সম্প্রদায়’ নয়; এটি মানুষের “বুনিয়াদি আদর্শিক ভিত্তি, মৌলিক জিম্মাদারি, জীবনধারা বা সাংগঠনিক বুনিয়াদ” যার ওপর সমাজ ও দ্বীন প্রতিষ্ঠিত থাকে
فاعْبُدُونِ (ফাবুদুন): প্রথাগত ‘পূজা-অর্চনা বা নিষ্ক্রিয় উপাসনা’ নয় এর অর্থ আল্লাহর সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালার প্রতি নিজের পুরো সত্ত্বা নিয়ে সমর্পিত হওয়া এবং বাস্তব সংগ্রামের মাধ্যমে আল্লাহর হুকুমের সক্রিয় আনুগত্য ও বাস্তবায়ন করা, যার প্রথম পর্যায় কষ্টসাধ্য হলেও শেষ পরিণতিতে ব্যক্তি ও সমাজের স্থায়ী আরাম, শক্তি ও পুষ্টি নিশ্চিত হয়
- অনুবাদ: “নিশ্চয়ই এটিই হচ্ছে তোমাদের মূল ভিত্তিভূমি এবং একক সুসংহত আদর্শিক বা বুনিয়াদী পথ (أُمَّتُكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً), আর আমিই তোমাদের একমাত্র প্রতিপালক ও বিকাশকারী (رَبُّكُمْ); অতএব তোমরা কেবল আমারই নিয়ম ও বিধানের প্রতি সম্পূর্ণ শ্রম ও নিষ্ঠার সাথে অনুগত হও (فَاعْبُدُونِ)।”
***নিশ্চয়ই এই যে তোমাদের সামগ্রিক জীবনধারা, বুনিয়াদি আদর্শিক ভিত্তি, সাংগঠনিক কাঠামো বা বৈশ্বিক ঐতিহ্য (উম্মাতুকুম)— তা মূলত একই ঐশ্বরিক সূত্রে গাঁথা একক, সুসংহত ও অবিভাজ্য একটি চিরন্তন জীবন-ব্যবস্থা (উম্মাতান ওয়াহিদাতান) (p. 27); আর আমিই তোমাদের একমাত্র লালন, বিকাশ, পুষ্টি ও সুরক্ষাকারী সার্বভৌম বিধিমালা (রব্ব) (pp. 9, 18), সুতরাং তোমরা কোনো অন্যায্য শক্তির দাসত্ব না করে কেবল আমারই দেওয়া আইন ও বিধিনিষেধের প্রতি সম্পূর্ণরূপে সমর্পিত হও এবং তার সক্রিয় আনুগত্য কর (ফাবুদুন)
আয়াত ৯৩ (Verse 21:93)
আরবি পাঠ: وَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُمْ بَيْنَهُمْ ۖ كُلٌّ إِلَيْنَا رَاجِعُونَ
- وَتَقَطَّعُوا (ওয়া তাক্বাত্তাউ): প্রথাগত সম্পর্ক ছিন্ন করা নয়; বরং দ্বীনের মূল অবিভাজ্য একক কাঠামোর মৌলিকত্ব নষ্ট করে তাকে খণ্ড-বিখণ্ড করা বা সুবিধাবাদী দল-উপদলে বিভক্ত করা।
أَمْرَهُمْ (আমরাহুম): এটি আল্লাহর সুনির্দিষ্ট আইনি নির্দেশ, মূল উদ্দেশ্য, সমাজ-কাঠামোর বুনিয়াদ বা সামগ্রিক ঐশ্বরিক শাসনব্যবস্থা।
رَاجِعُونَ (রাজীঊন): ফিরে যাওয়া নয়; বরং সমস্ত কর্ম, প্রচেষ্টা ও বিচ্যুতির অবধারিত দায়বদ্ধতা ও চূড়ান্ত ফলাফল ভোগের জন্য ঐশ্বরিক বিচার ব্যবস্থার আওতাভুক্ত হওয়া।
- অনুবাদ: “কিন্তু তারা (মানুষেরা) নিজেদের মধ্যকার এই মূল ঐশী দায়িত্ব ও একক আদর্শিক ভিত্তিকে খণ্ড-বিখণ্ড করে উপদলে বিভক্ত করে ফেলেছে (وَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُمْ); অথচ পরিশেষে তাদের প্রত্যেককেই আমাদের বিচার ব্যবস্থার দিকেই ফিরে আসতে হবে।”
***কিন্তু মানুষ তাদের সেই সামগ্রিক দ্বীন, বুনিয়াদি জীবনের মূল নির্দেশ ও আদর্শিক সংহতিকে (আমর) নিজেদের কায়েমী স্বার্থে ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন দল-উপদল বা মানব-রচিত ভিন্ন ভিন্ন বিধানে (তাক্বাত্তাউ) বিভক্ত করে ফেলেছে; অথচ তাদের প্রতিটি বিভক্ত দল, চিন্তাধারা ও মতাদর্শকে অবধারিতভাবে আমারই দেওয়া প্রাকৃতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচারের নিয়মের দিকেই ফিরে আসতে হবে এবং তার চূড়ান্ত ফলাফল ভোগ করতে হবে (রাজীঊন)।
আয়াত ৯৪ (Verse 21:94)
আরবি পাঠ: فَمَن يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَا كُفْرَانَ لِسَعْيِهِ وَإِنَّا لَهُ كَاتِبُونَ
مُؤْمِنٌ (মুমিন): প্রথাগত অন্ধ বিশ্বাসী নয়; বরং যে ব্যক্তি আকল ও বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সত্যের ওপর গভীর প্রত্যয় স্থাপন করে এবং সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে সক্রিয় থাকে।
الصَّالِحَاتِ (আস-সালেহাত): ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়; এর অর্থ সমাজ ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিকৃতি বা শূন্যতা দূর করে সঠিক ভারসাম্য তৈরি ও সংস্কারমূলক কাজ সম্পাদন করা।
فَلَا كُفْرَانَ (ফালা কুফরান): প্রথাগত কোনো অকৃতজ্ঞতা নয়; এর অর্থ কোনো ভালো কর্মের ফলাফলকে আড়াল করা, ঢেকে ফেলা, অস্বীকার করা বা ধামাচাপা দিয়ে বিনষ্ট করা।
- অনুবাদ: “অতএব, যে কেউ পরম প্রত্যয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়ে (وَهُوَ مُؤْمِنٌ) সমাজ সংস্কার ও সংশোধনমূলক কার্যাদি করবে (مِنَ الصَّالِحَاتِ), তার সেই আন্তরিক প্রচেষ্টাকে কখনই অবমূল্যায়ন বা অস্বীকার করা হবে না (فَلَا كُفْرَانَ لِسَعْيِهِ) এবং আমরা অবশ্যই তার এই অবদানকে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ করে রাখছি।”
***অতঃপর যে ব্যক্তি বা সমাজ গভীর মানসিক প্রত্যয়, বুদ্ধিবৃত্তিক সচেতনতা ও জীবনের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত রেখে (মুমিন) জীবন ও সমাজ সংস্কারের সেই ভারসাম্যপূর্ণ কর্মসমূহ (সালেহাত) সম্পাদন করবে, তার সেই নিয়মতান্ত্রিক কর্ম, গতিশীলতা ও সক্রিয় প্রচেষ্টাকে (সাইয়্যিহি) কখনো অস্বীকার, গোপন বা বিনষ্ট (কুফরান) করা হবে না; এবং নিশ্চয়ই তার সেই সমস্ত কর্মের ইতিবাচক ফলাফলকে সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ ও অবধারিত (কাতিবুন) করে রাখি।
আয়াত ৯৫ (Verse 21:95)
আরবি পাঠ: وَحَرَامٌ عَلَىٰ قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا أَنَّهُمْ لَا يَرْجِعُونَ
حَرَامٌ (হারামুন): বরং আল্লাহর সামাজিক ও প্রাকৃতিক নিয়ম (Law of Cause and Effect) অনুসারে কোনো প্রক্রিয়া ঘটা আইনি বা পদ্ধতিগতভাবে অসম্ভব, অবধারিত বা সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে যাওয়া
قَرْيَةٍ أَهْلَكْنَاهَا (ক্বারইয়াতিন আহলাকনাহা): কোনো ভৌগোলিক গ্রাম বা শহরকে অলৌকিক উপায়ে ধসিয়ে দেওয়া নয়; বরং কোনো সমাজ বা মানবগোষ্ঠী যখন আল্লাহর দেওয়া নৈতিক ও আইনি সীমানা ভেঙে নিজের ধ্বংস নিজেই ডেকে আনে, তখন সেই বিকৃত সমাজ-ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটা।
অনুবাদ: “এবং যে সমাজ বা সভ্যতাকে আমরা (তাদের নিজেদের অবক্ষয় ও দুর্নীতির কারণে) ধ্বংস করে দিয়েছি (أَهْلَكْنَاهَا), তাদের জন্য এটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ ও অসম্ভব (وَحَرَامٌ) যে তারা পুনরায় (পূর্বের শক্তিশালী অবস্থানে) ফিরে আসতে পারবে।”
***আর এটি আমার অপরিবর্তনীয় সামাজিক ও প্রাকৃতিক নিয়ম দ্বারা সম্পূর্ণ অবধারিত ও অসম্ভব (হারামুন) করা হয়েছে যে— কোনো অবক্ষয়গ্রস্ত জনপদ বা সামাজিক বিকৃতিকে যখন তার নিজের অন্যায়ের কারণে ধ্বংস বা বিলুপ্ত (আহলাকনাহা) করে, তখন তারা আর কখনো তাদের সেই পূর্ববর্তী শক্তিশালী, সংশোধনমুখী বা কার্যকর আদর্শিক অবস্থায় ফিরে আসতে (লা ইয়ারজিঊন) পারে না।
আয়াত ৯৬ (Verse 21:96)
আরবি পাঠ: حَتَّىٰ إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُم مِّن كُلِّ حَدَبٍ يَنصِلُونَ
-
- يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ (ইয়াজূজু ওয়া মাজূজু): রূপক অর্থে এমন এক বিশৃঙ্খল, ধ্বংসাত্মক, উগ্র সামাজিক শক্তি বা উগ্র মানসিকতা যা সমাজে দ্রুত ফেতনা, বিভেদ ও আগুন ছড়ায়। (ধাতুগত অর্থ A-J-J বা জ্বলন্ত আগুন/উগ্রতা অনুযায়ী) সমাজে বিদ্যমান চরম উগ্রতা, পারস্পরিক জ্বলন্ত সংঘাত, আগ্রাসী মনোভাব এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী স্বার্থান্বেষী শক্তির সমষ্টি
- حَدَبٍ (হাদাবিন): প্রতিটি উচ্চভূমি, প্রভাবশালী অবস্থান, বা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। মানুষের তৈরি সমাজ কাঠামোর উচ্চ অবস্থান, নেতৃস্থানীয় পর্যায়, প্রভাবশালী সামাজিক স্তর বা ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু
- يَنصِلُونَ (ইয়ানসিলূন): দ্রুত গতিতে ধাবিত হওয়া, চারপাশ থেকে চড়াও হওয়া বা সমাজে কোনো শক্তির বংশ পরম্পরায় আধিপত্য বিস্তার করা, তীব্র গতিতে প্রভাব বিস্তার করা বা সাধারণ জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়ে জেঁকে বসা
- অনুবাদ: “যতক্ষণ না পর্যন্ত ইয়াজুজ ও মাজুজের (বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসাত্মক শক্তির উগ্রতা) বাঁধ ভেঙে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে (فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ); এবং তারা সমাজের প্রতিটি প্রভাবশালী ক্ষমতার উৎস ও উচ্চভূমি থেকে (مِّن كُلِّ حَدَبٍ) দ্রুত গতিতে ঝাঁপিয়ে পড়বে (يَنصِلُونَ)।”
আয়াত ৯৭ (Verse 21:97)
আরবি পাঠ: وَاقْتَرَبَ الْوَعْدُ الْحَقُّ فَإِذَا هِيَ شَاخِصَةٌ أَبْصَارُ الَّذِينَ كَفَرُوا يَا وَيْلَنَا قَدْ كُنَّا فِي غَفْلَةٍ مِّنْ هَٰذَا بَلْ كُنَّا ظَالِمِينَ
- الْوَعْدُ الْحَقُّ (আল-ওয়াদুল হাক্ব): কর্মের অকাট্য পরিণতি বা হিসাব-নিকাশের চিরন্তন বাস্তব সত্য মুহূর্ত। আল্লাহর অমোঘ সামাজিক ও প্রাকৃতিক নিয়ম (Law of Cause and Effect) অনুসারে মানুষের কৃতকর্মের কারণে অবধারিতভাবে ধেয়ে আসা চূড়ান্ত সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিণতি বা বিপর্যয়।
شَاخِصَةٌ أَبْصَارُ (শাখিসাতুন আবসারু): চোখ কপালে ওঠা বা ভৌত দৃষ্টি স্থির হওয়া নয়; বরং সমাজের মানুষের সামগ্রিক চেতনা, বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি, দূরদর্শিতা ও বিচারবুদ্ধি স্তম্ভিত, অচল বা অবশ হয়ে যাওয়া।
فِي غَفْلَةٍ (ফী গাফলাতিন): প্রথাগত সাধারণ অবহেলা নয়; বরং সত্য চোখের সামনে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কদাচার ও অন্ধ অনুসরণের কারণে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক চরম অসচেতনতা বা অজ্ঞানতার অবয়ব।
كَفَرُوا (কাফারু): সত্যকে ঢেকে রাখা বা জেনে-বুঝে অস্বীকার করা। - ظَالِمِينَ (জ্বালিমীন): যারা ঐশী আইন লঙ্ঘন করে নিজেদের ওপর ও সমাজ ব্যবস্থার ওপর ভারসাম্যহীনতা চাপিয়ে দিয়েছিল।
- অনুবাদ: “এবং যখন সেই অকাট্য কর্মফলের অবধারিত মুহূর্তটি অতি নিকটে চলে আসবে (وَاقْتَرَبَ الْوَعْدُ الْحَقُّ), তখন যারা সত্যকে গোপন ও অস্বীকার করেছিল (الَّذِينَ كَفَرُوا), তাদের দৃষ্টি আকস্মিকভাবে স্তব্ধ ও স্থির হয়ে যাবে; তারা বলবে, ‘হায় আমাদের দুর্ভাগ্য! আমরা তো এই বাস্তব সত্যের ব্যাপারে চরম অসচেতনতায় নিমজ্জিত ছিলাম, বরং আমরা নিজেরাই ছিলাম প্রকৃত সীমালঙ্ঘনকারী ও ভারসাম্য নষ্টকারী (بَلْ كُنَّا ظَالِمِينَ)।’”
***এবং যখন সেই সত্য ও অবধারিত পরিণতির অমোঘ সামাজিক নিয়ম বা প্রতিশ্রুত বিপর্যয় (আল-ওয়াদুল হাক্কু) অতি নিকটে চলে আসে, তখন হঠাৎ করেই সত্যকে উপহাস, অস্বীকার ও গোপনকারী অবক্ষয়গ্রস্তদের (কাফালু) সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, চেতনা ও দূরদর্শিতা চরম বিস্ময় ও আতঙ্কে স্থির বা স্তম্ভিত (শাখিসাতুন) হয়ে যায়; তারা নিজেদের কৃতকর্মের ভয়াবহতা দেখে আর্তনাদ করে বলবে— “হায়, চরম ধ্বংস আমাদের জন্য! আমরা তো এই পরম সত্য, অমোঘ সামাজিক বিধান ও দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন, অসচেতন ও অজ্ঞ ছিলাম (গাফলাতিন), বরং আমরা নিজেরাই ছিলাম আল্লাহর দেওয়া ভারসাম্যপূর্ণ সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা সীমানা লঙ্ঘনকারী অন্যায়কারী (জালিমীন)।”
আয়াত ৯৮ (Verse 21:98)
আরবি পাঠ: إِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ أَنتُمْ لَهَا وَارِدُونَ
تَعْبُدُونَ (তা’বুদূন): আল্লাহর বিধান ব্যতিরেকে অন্য যেসব মানব-রচিত নিয়ম বা শক্তির তোমরা অন্ধ অনুকরণ বা দাসত্ব করছ। ঐশ্বরিক আইনের বাইরে গিয়ে অন্য কোনো মানুষের তৈরি আইন, বিকৃত সামাজিক প্রথা বা ব্যক্তি-মতবাদের প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পিত হওয়া এবং তার অন্ধ আনুগত্য বা দাসত্ব করা।
حَصَبُ (হাস্বাবু): জ্বালানি, কংকর, বা খড়কুটো যা ধ্বংসের আগুনকে আরও তীব্র করে তোলে।
حَصَبُ جَهَنَّمَ (হাসাবু জাহান্নাম): নরকের পাথর বা কোনো অলৌকিক আগুন নয়; বরং সমাজে মানুষের তৈরি বিকৃত ও অন্যায্য ব্যবস্থার ফলশ্রুতিতে যে তীব্র সামাজিক অশান্তি, দাঙ্গা, যুদ্ধ, শোষণ ও ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি হয়, “তোমরা এবং তোমাদের সেই অন্ধ আনুগত্যের বিকৃত মতবাদগুলোই হবে সেই ধ্বংসাত্মক সামাজিক আগুনের মূল জ্বালানি, কাঠখড় বা উপাদান”।
وَارِدُونَ (ওয়ারিদুন): অবধারিতভাবে বা নিজের কর্মের নিয়মতান্ত্রিক ফলাফল হিসেবে কোনো সুনির্দিষ্ট গন্তব্যে, ঘাটে বা চূড়ান্ত পরিণতির মুখোমুখি গিয়ে পৌঁছানো।
অনুবাদ: “নিশ্চয়ই তোমরা এবং আল্লাহর কিতাবের বাইরে গিয়ে তোমরা যেসব মনগড়া নিয়ম ও শক্তির দাসত্ব ও অন্ধ অনুসরণ করছিলে (وَمَا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ), তা সবই হবে দুর্ভোগের চূড়ান্ত রূপ বা জাহান্নামের জ্বালানি (حَصَبُ جَهَنَّمَ); তোমরা সবাই তার মধ্যে অবধারিতভাবে প্রবেশ করবে।”
***নিশ্চয়ই তোমরা এবং আল্লাহর সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধির বাইরে (মিন দুনিল্লাহ) গিয়ে তোমরা যেসব মনগড়া মতবাদ, ব্যক্তি, কদাচার ও বিকৃত সামাজিক ব্যবস্থার অন্ধ অনুসরণ, দাসত্ব ও আনুগত্য করছ (তাবুদুন), তা সবই হলো জাহান্নামের তীব্র জ্বলন্ত সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞ, সংঘাত ও চরম মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণার জ্বালানি বা মূল উপাদান (হাসাবু জাহান্নাম); তোমরা সবাই অবধারিতভাবে নিজেদের কৃতকর্মের নিয়মতান্ত্রিক ফলাফল হিসেবে সেই ধ্বংসাত্মক সামাজিক আগুনের গন্তব্যের দিকেই অগ্রসর হচ্ছ বা তাতে প্রবেশ করছ (ওয়ারিদুন)।
আয়াত ৯৯ (Verse 21:99)
আরবি পাঠ: لَوْ كَانَ هَٰؤُلَاءِ آلِهَةً مَّا وَرَدُوهَا ۖ وَكُلٌّ فِيهَا خَالِدُونَ
- آلِهَةً (আলিহাতান): তোমাদের সেইসব মনগড়া আইন ও শক্তি-কর্তৃত্ব যা তোমরা চূড়ান্ত হুকুমতকারী বা আশ্রয়দাতা মনে করতে। মানুষের সমাজ জীবনে আল্লাহর আইনের সমকক্ষ হিসেবে গৃহীত অন্য যেকোনো মানুষের মনগড়া শাসনব্যবস্থা, বিকৃত আইন বা সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সত্তা ও কর্তৃপক্ষ
مَا وَرَدُوهَا (মা ওয়ারাদুহা): মানুষের তৈরি ভুল মতবাদ বা আইনের অনুসারী হওয়ার কারণে অবধারিতভাবে ধ্বংসের ঘাটে বা চূড়ান্ত মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয়ের মুখে এসে পতিত হওয়া - خَالِدُونَ (খালিদুন): চিরকাল সেই একই নিকৃষ্ট অবস্থায় স্থবির বা অপরিবর্তনীয় হয়ে পড়ে থাকা। “কোনো ভালো বা মন্দ কর্মের নিয়মতান্ত্রিক ফলাফল হিসেবে তৈরি হওয়া সেই বিশেষ অবস্থায় দীর্ঘ সময় বা স্থায়ীভাবে অবস্থান করা ও সচল থাকা”
- অনুবাদ: “যদি এগুলো সত্যিই কোনো অকাট্য আশ্রয় বা পরম হুকুমতের মালিক (آلِهَةً) হতো, তবে তারা কখনই এই ধ্বংসাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হতো না; অথচ এখন তাদের প্রত্যেককেই এই চরম দুর্ভোগের নিকৃষ্ট অবস্থায় চিরকাল স্থবির হয়ে পড়ে থাকতে হবে (وَكُلٌّ فِيهَا خَالِدُونَ)।”
***যদি ওইসব মনগড়া মতবাদ, ব্যক্তি, কদাচার বা কল্পিত জাগতিক শক্তিগুলো প্রকৃত অনুসরণযোগ্য আইন বা সার্বভৌম বিধানদাতা (আলিহাতান) হতো, তবে তারা কখনোই তোমাদেরকে এই তীব্র সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞ, সংঘাত ও চরম মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণার গন্তব্যে (জাহান্নামে) নিয়ে আসত না (মা ওয়ারাদুহা); অথচ এখন অনুসারী ও অনুসৃত প্রত্যেকেই সেই ধ্বংসাত্মক ও বিকৃত সামাজিক পরিণতির মাঝেই স্থায়ীভাবে অবস্থান ও সক্রিয় (খালিদুন) থাকবে।
আয়াত ১০০ (Verse 21:100)
আরবি পাঠ: لَهُمْ فِيهَا زَفِيرٌ وَهُمْ فِيهَا لَا يَسْمَعُونَ
- زَفِيرٌ (জাফীরুন): বুকফাটা আর্তনাদ, তীব্র অনুশোচনার দীর্ঘশ্বাস, বা যন্ত্রণার চরম বহিঃপ্রকাশ।সমাজে মানুষের তৈরি বিকৃত শোষণমূলক ব্যবস্থার ফলশ্রুতিতে মানুষের মনের ভেতর পুঞ্জীভূত হওয়া তীব্র মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত, হতাশার দীর্ঘশ্বাস, ক্ষোভ ও গভীর মানসিক অস্থিরতা
لَا يَسْمَعُونَ (লা ইয়াসমাঊন): মানুষের চরম অন্ধ অনুসরণ ও গোঁড়ামির কারণে সত্যকে শোনার, বোঝার, যাচাই করার এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও যৌক্তিকভাবে তা গ্রহণ করার মানসিক দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়া
অনুবাদ: “সেখানে তাদের জন্য থাকবে কেবল তীব্র অনুশোচনার দীর্ঘশ্বাস ও আর্তনাদ (زَفِيرٌ) এবং (চরম বিশৃঙ্খলার কারণে) সেখানে তারা কোনো যৌক্তিক বা কল্যাণকর কথা শুনতে বা অনুধাবন করতে পারবে না।”
***সেই চরম সামাজিক অশান্তি ও নৈতিক অবক্ষয়ের নরকতুল্য অবস্থার মধ্যে তাদের জন্য থাকবে কেবলই তীব্র দীর্ঘশ্বাস, হাহাকার, পারস্পরিক ক্ষোভ ও তীব্র মনস্তাত্ত্বিক যন্ত্রণা (যাফীরুন); এবং সেখানে সত্য, হেদায়েত বা কোনো সংশোধনের বাণী শোনার, বোঝার বা নিজের আকল ব্যবহার করে তা অনুধাবন করার মতো কোনো মানসিক সক্ষমতা ও সুযোগ (লা ইয়াসমাঊন) তাদের থাকবে না।
আয়াত ১০১ (Verse 21:101)
আরবি পাঠ: إِنَّ الَّذِينَ سَبَقَتْ لَهُم مِّنَّا الْحُسْنَىٰ أُولَٰئِكَ عَنْهَا مُبْعَدُونَ
-
- الْحُسْنَىٰ (আল-হুসনা): পরম ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ, সুন্দরতম প্রতিদান বা ‘আদাল’ (সমতা) এর চেয়েও এক ধাপ উন্নত চমৎকার কল্যাণকর অবস্থা। সমাজ ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিকৃতি বা অভাব পূরণ করে সর্বোত্তম ভারসাম্য তৈরি করা, মানুষের অধিকারের চেয়েও বেশি দেওয়া এবং পরম আত্মিক বা আচরণগত সৌন্দর্য ধারণ করা
- مُبْعَدُونَ (মুব’আদূন): অনেক দূরে রাখা, সম্পূর্ণ নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করানো। আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক ও সামাজিক নিয়ম (Law of Cause and Effect) অনুসারে, যারা সংস্কারের পথে চলে, তারা মানুষের তৈরি বিকৃত ব্যবস্থার কারণে সৃষ্টি হওয়া মানসিক পতন, অস্থিরতা ও সর্বগ্রাসী সামাজিক সংঘাতের আগুন থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত ও দূরে থাকে
অনুবাদ: “তবে যাদের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে পূর্ব থেকেই সুন্দরতম প্রতিদান ও পরম কল্যাণের সিদ্ধান্ত নিশ্চিত হয়ে গেছে (سَبَقَتْ لَهُم مِّنَّا الْحُسْنَىٰ), তাদেরকে এই ধ্বংসাত্মক সামাজিক দুর্ভোগ ও অশান্তি থেকে অনেক দূরে (নিরাপদে) রাখা হবে (أُولَٰئِكَ عَنْهَا مُبْعَدُونَ)।”
*** - নিশ্চয়ই যারা নিজেদের আকল, বুদ্ধিমত্তা ও কর্মের মাধ্যমে আমার দেওয়া বিধানের আলোকে সর্বোত্তম আচরণ, সুষম ভারসাম্য, সমাজ সংস্কার ও পরম আত্মিক সৌন্দর্য (আল-হুসনা) অর্জনে অগ্রগামিতা (সাবাক্বাত) লাভ করেছে— তারা এই তীব্র সামাজিক ধ্বংসযজ্ঞ, সংঘাত ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় থেকে সম্পূর্ণ দূরে ও নিরাপদ দূরত্বে (মুবআদুন) থাকবে
আয়াত ১০২ (Verse 21:102)
আরবি পাঠ: لَا يَسْمَعُونَ حَسِيسَهَا ۖ وَهُمْ فِي مَا اشْتَهَتْ أَنفُسُهُمْ خَالِدُونَ
- حَسِيسَهَا (হাসীসাহা): সেই ধ্বংসের সামান্যতম শব্দ, মৃদু আওয়াজ, বা ভীতিপ্রদ কোনো আঁচ।
- فِي مَا اشْتَهَتْ أَنفُسُهُمْ (ফী মাশতাহাত আনফুসুহুম): তাদের মন বা ব্যক্তিত্ব যা কিছু কল্যাণকর তীব্রভাবে আকাঙ্ক্ষা করত। মানুষের উন্নত সত্তা বা ‘নফসে মুতমাইন্নাহ’ সমাজ ও নিজের বিকাশের জন্য যেসব সত্য, সুন্দর ও প্রগতিশীল বিষয় বা জ্ঞানতাত্ত্বিক উপাদান আকাঙ্ক্ষা করে
خَالِدُونَ (খালিদুন): “কোনো ভালো কর্মের নিয়মতান্ত্রিক ফলাফল হিসেবে তৈরি হওয়া সেই বিশেষ সুষম, শান্তিপূর্ণ ও স্বর্গীয় অবস্থায় দীর্ঘ সময় বা স্থায়ীভাবে অবস্থান করা এবং নিজের সৃজনশীলতা নিয়ে সচল থাকা” ।
- অনুবাদ: “তারা সেই ধ্বংসাত্মক যন্ত্রণার সামান্যতম ভীতিপ্রদ আঁচ বা শব্দও শুনতে পাবে না (لَا يَسْمَعُونَ حَسِيسَهَا); এবং তাদের সুপ্ত চেতনা ও ব্যক্তিত্ব যা কিছু প্রগতিশীল বা উন্নত অবস্থা আকাঙ্ক্ষা করত (فِي مَا اشْتَهَتْ أَنفُսُهُمْ), তারা চিরকাল সেই কাঙ্ক্ষিত স্বর্গীয় শান্তিতেই সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে (خَالِدُونَ)।”
***তারা সেই ধ্বংসাত্মক সামাজিক আগুনের সামান্যতম ফিসফিসানি, মৃদু প্রভাব বা কোনো নেতিবাচক সংঘাতের শব্দও (হাসীসাহা) অনুভব বা শ্রবণ করবে না; এবং তাদের নিজেদের সত্তা, বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা ও মনস্তত্ত্ব যা কিছু উত্তম, প্রগতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ বিষয় আকাঙ্ক্ষা (ইশতাহাত আনফুসুহুম) করবে, তার মাঝেই তারা চিরকাল স্থায়ীভাবে অবস্থান ও ক্রমাগত সক্রিয় (খালিদুন) থাকবে
আয়াত ১০৩ (Verse 21:103)
আরবি পাঠ: لَا يَحْزُنُهُمُ الْفَزَعُ الْأَكْبَرُ وَتَتَلَقَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ هَٰذَا يَوْمُكُمُ الَّذِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ
الْفَزَعُ الْأَكْبَرُ (আল-ফাজা’উল আকবার): সবচেয়ে বড় ভয়, মহা আতঙ্ক বা সমাজ ও রাষ্ট্রের চূড়ান্ত ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ের সময়কাল। (আল-ফাযাউল আকবার): প্রথাগত বিচারদিনের শিঙার ফুঁ বা কাল্পনিক ভৌত আতঙ্ক নয়; বরং মানুষের তৈরি অন্যায্য ও শোষক ব্যবস্থার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছানোর ফলে সমাজে যে মহাবিপর্যয়, চরম সংঘাত, মনস্তাত্ত্বিক পতন ও সর্বগ্রাসী সংকট তৈরি হয়।
الْمَلَائِكَةُ (আল-মালাইকাহ): মহাবিশ্বের প্রাকৃতিক শক্তি এবং ঐশী বিধানের অমোঘ নিয়মতান্ত্রিক শক্তিসমূহ যা সিস্টেমকে টিকিয়ে রাখে।
تَتَلَقَّاهُمُ الْمَلَائِكَةُ (তাতাল্লাক্বাহুমুল মালাইকাতু): মহাবিশ্বের সমস্ত প্রাকৃতিক চালিকা শক্তি, আল্লাহর সামাজিক আইন এবং ঐশ্বরিক সিস্টেমের ধারক-বাহক উপাদানসমূহ সত্যের অনুসারীদের অনুকূলে কাজ করা এবং তাদের সুরক্ষায় সংহতি প্রকাশ করা।
- অনুবাদ: “সেই মহা আতঙ্ক বা সামাজিক চূড়ান্ত বিপর্যয়ও (الْفَزَعُ الْأَكْبَرُ) তাদেরকে বিন্দুমাত্র দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করবে না; এবং ঐশী প্রাকৃতিক নিয়মের শক্তিসমূহ (الْمَلَائِكَةُ) তাদেরকে এই বলে স্বাগত জানাবে—’এটিই হচ্ছে তোমাদের সেই সাফল্যের দিন, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেওয়া হয়েছিল।’”
***সমাজের সেই মহাসংকট, চরম নৈতিক অবক্ষয় ও মানুষের তৈরি বিকৃত ব্যবস্থার চূড়ান্ত কোণঠাসা ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতি (আল-ফাযাউল আকবার) তাদের বিন্দুমাত্র বিষাদগ্রস্ত, সংকুচিত বা মানসিক হতাশায় আক্রান্ত (লা ইয়াহযুনুহুম) করবে না; বরং মহাজাগতিক ও প্রাকৃতিক নিয়মের সমস্ত চালিকা শক্তি ও আল্লাহর আইনের ধারকগণ (আল-মালাইকাতু) তাদের পরম সম্মানে স্বাগত জানিয়ে বলবে— “এটিই তোমাদের সেই কাঙ্ক্ষিত সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তরের দিন ও পর্যায়, যা তোমাদের নিয়মতান্ত্রিক সংস্কারমূলক কর্মের হিসাব অনুসারে অবধারিত (তুআদুন) করা হয়েছিল।”
আয়াত ১০৪ (Verse 21:104)
আরবি পাঠ: يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيِّ السِّجِلِّ لِلْكُتُبِ ۚ كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيدُهُ ۚ وَعْدًا عَلَيْنَا ۚ إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ
السَّمَاءَ (আস-সামা-আ): উচ্চতর রাজনৈতিক বা সামাজিক ক্ষমতা কাঠামো, আকাশ বা উচ্চ দিগন্ত।
انَطْوِي السَّمَاءَ (নাত্বউই আস-সামাআ): নীল আকাশকে কাপড়ের মতো ভাঁজ করা নয়; বরং সমাজে প্রতিষ্ঠিত কোনো উচ্চ ক্ষমতা-কাঠামো, চিন্তার আকাশ, বৈজ্ঞানিক ও আদর্শিক দিগন্তকে পুরনো অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে একটি নতুন সিস্টেমের অধীনে সংকুচিত বা একীভূত করা।
السِّجِلِّ (আস-সিজিল): কোনো রেকর্ড বুক, লিখিত দলিল, বা নথিপত্র।
كَمَا بَدَأْنَا… نُعِيدُهُ (কামা বাদা’না… নুঈদুহু): কোনো ধ্বংসলীলার পর ভৌত শরীর পুনরায় জ্যান্ত করা নয়; বরং আল্লাহর অমোঘ সৃষ্টিতাত্ত্বিক ও সামাজিক আইন (Law of Cause and Effect) অনুসারে, অবক্ষয়ের চূড়ান্ত প্রান্তে পৌঁছানো সমাজ বা শক্তিকে গুটিয়ে নিয়ে একেবারে প্রাথমিক বুনিয়াদ থেকে এক নতুন জীবনের সূচনা করা, নতুন সমাজকাঠামো বা যুগের সফল রূপান্তর ঘটানো।
অনুবাদ: “যেদিন আমরা এই উচ্চতর ক্ষমতা বা সমাজ কাঠামোকে (السَّمَاءَ) গুটিয়ে নেব, যেভাবে কিতাব বা দলিলের নথিপত্র গুটিয়ে রাখা হয় (كَطَيِّ السِّجِلِّ); যেভাবে আমরা প্রথম সৃষ্টির বা প্রথম বিপ্লবের সূচনা করেছিলাম, ঠিক সেভাবেই আমরা নতুন একটি চক্রের পুনর্বহাল করব (نُّعِيدُهُ); এটি আমাদের ওপর একটি অকাট্য প্রতিশ্রুতি এবং আমরা তা অবশ্যই বাস্তবায়ন করব।”
***এমন এক সামাজিক ও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সন্ধিক্ষণে— যখন আমি মহাজাগতিক উচ্চতা, প্রতিষ্ঠিত আদর্শিক উচ্চ আকাশ বা প্রচলিত চিন্তার আকাশকে (আস-সামাআ) সুনির্দিষ্ট আইন ও নথিপত্রের খাতা গুটিয়ে ফেলার মতো সম্পূর্ণ সংকুচিত বা একত্রিত (নাত্বউই) করব; যেভাবে আমি সৃষ্টির প্রথম পর্যায় বা কোনো আদর্শিক আন্দোলনের শুরুর বুনিয়াদ (আউয়ালা খালক্বিন) শুরু করেছিলাম, ঠিক একইভাবে আমি তার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে নতুন রূপান্তর বা নবজীবন (নুঈদুহু) দান করব; এটি আমার ওপর এক অমোঘ প্রতিশ্রুত নিয়মতান্ত্রিক বিধান, আর নিশ্চয়ই আমি তা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ও সম্পাদনকারী।
আয়াত ১০৫ (Verse 21:105)
আরবি পাঠ: وَلَقَدْ كَتَبْنَا فِي الزَّبُورِ مِن بَعْدِ الذِّكْرِ أَنَّ الْأَرْضَ يَرِثُهَا عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ
کَتَبْنَا (কাতাবনা): কেবল সাধারণ খাতায় লেখা নয়; বরং আল্লাহর সামাজিক ও মহাজাগতিক নিয়মে কোনো বিধিমালাকে “আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক, অবধারিত ও অপরিবর্তনীয়” করে দেওয়া।
فِي الزَّبُورِ (ফিজ-জাবুর): পূর্ববর্তী ঐশী টুকরো কিতাবসমূহ বা প্রাকৃতিক আইনের স্থায়ী লিখন। মূল কিতাবের ব্যাখ্যা বা “প্রজ্ঞাপূর্ণ খণ্ড কিতাবসমূহ, সামাজিক আইন এবং প্রামাণ্য দলিলের সমষ্টি
الذِّكْرِ (আয-জিকর): মূল ওহী, উপদেশ বা মৌলিক বৈজ্ঞানিক ও ঐশী স্মারক।
يَرِثُهَا (ইয়ারিছুহা): কোনো কিছুর স্থায়ী উত্তরাধিকার বা চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ লাভ করা।
عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ (ইবাদিয়াছ ছালিহুন): আমার সেইসব বান্দা বা কর্মীরা যারা ঐশী আইনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে এবং সমাজে ভারসাম্য ও সংস্কারের কাজ করে।
- অনুবাদ: “এবং আমরা ওহীর মৌলিক স্মারকের (الذِّكْرِ) পর পূর্ববর্তী ঐশী আইনের লিখনেও (فِي الزَّبُورِ) এটি স্পষ্টভাবে লিখে দিয়েছি যে—এই পৃথিবীর বা সমাজ ব্যবস্থার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ বা উত্তরাধিকার লাভ করবে (يَرِثُهَا) কেবল আমারই সমাজ সংস্কারক ও ভারসাম্য রক্ষাকারী পরিশ্রমী কর্মীরাই (عِبَادِيَ الصَّالِحُونَ)।”
***আর আমি আমার পূর্ববর্তী মূল বিধিমালা, পূর্বপ্রমাণিত সত্য ও মহাজাগতিক উপদেশগ্রন্থের (আয-যিকর) পর সমস্ত প্রামাণ্য সামাজিক ঐশ্বরিক আইন, সুনির্দিষ্ট খণ্ড বা প্রজ্ঞার কিতাবসমূহে (আয-যাবুর) এটি সুনির্দিষ্টভাবে লিপিবদ্ধ ও অবধারিত (কাতাবনা) করেছি যে— এই বাস্তব সমাজ, জীবনব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় ভিত্তি বা পৃথিবীর প্রকৃত শাসন-ক্ষমতার (আল-আরয) চূড়ান্ত উত্তরাধিকার বা স্থলাভিষিক্ত (ইয়ারিছুহা) হবে কেবল আমারই বিধিমালার প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পিত, কর্মঠ এবং সমাজ ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বিকৃতি দূর করে সঠিক ভারসাম্য পরিচালনাকারী বান্দাগণ (ইবাদিয়াছ ছালিহুন)।
আয়াত ১০৬ (Verse 21:106)
আরবি পাঠ: إِنَّ فِي هَٰذَا لَبَلَاغًا لِّقَوْمٍ عَابِدِينَ
- لَبَلَاغًا (লাবালাগান): একটি চূড়ান্ত বার্তা, গন্তব্যে পৌঁছানোর নিখুঁত উপায় বা পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা। মানুষের সমাজ-সংস্কারের চরম আকাঙ্ক্ষাকে চূড়ান্ত গন্তব্যে সফলভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য অত্যন্ত নিখুঁত ও কার্যকর মাধ্যম।
- عَابِدِينَ (আ-বিদীন): যারা অন্ধ দাসত্ব করে না, বরং ঐশী আইনের বাস্তবায়নের জন্য কঠিন প্রচেষ্টা ও সংগ্রামের পথ বেছে নেয়। সেই সক্রিয় মানুষ বা সমাজ যারা আল্লাহর সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক ও সামাজিক নিয়মের অধীনে নিজেদের খাটিয়ে, পরিশ্রম ও সাময়িক কষ্ট সহ্য করে সমাজকে পুষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী আরামের গন্তব্যে নিয়ে যায়”।
- অনুবাদ: “নিশ্চয়ই এই কিতাবের বার্তার মধ্যে এমন এক সম্প্রদায়ের জন্য চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর পর্যাপ্ত পথ রয়েছে (لَبَلَاغًا), যারা ঐশী আইনের অধীনে সমাজ গড়তে কঠোর সংগ্রাম ও প্রচেষ্টা চালিয়ে যায় (لِّقَوْمٍ عَابِدِينَ)।”
***নিশ্চয়ই এই নিখুঁত ধারণাগত সমাজ-বিনির্মাণের বর্ণনায় ও ঐশ্বরিক শাসনব্যবস্থার কাঠামোতে সেই জাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ বার্তা, গন্তব্যে পৌঁছানোর সফল মাধ্যম ও পরম কার্যকারিতা (লাবালাগান) রয়েছে— যারা আল্লাহর দেওয়া নিয়মকানুনের প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পিত, সক্রিয়ভাবে অনুগত ও কঠোর পরিশ্রমী (ক্বাওমিন আবেদীন)।
আয়াত ১০৭ (Verse 21:107)
আরবি পাঠ: وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ
- رَحْمَةً (রাহমাতান): সার্বিক যত্ন, পুষ্টি, নিরাপত্তা বলয় এবং বিকাশকারী সুযোগ-সুবিধা। এমন এক ঐশ্বরিক নিরাপত্তা, লালন ও প্রবৃদ্ধির পরিবেশ যা মানুষের সুপ্ত মানবিক সম্ভাবনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতাকে সর্বোত্তম উপায়ে বিকশিত করতে ঢাল হিসেবে কাজ করে
- لِلْعَالَمِينَ (লিল-আ-লামীন): সমগ্র মহাবিশ্ব, সমস্ত মানবসমাজ এবং যারা সত্যের জ্ঞান রাখে (Experts/Knowers) তাদের সবার জন্য। সমগ্র মহাবিশ্ব, সমস্ত সামাজিক-আইনি এক্তিয়ার বা রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থার বলয় এবং বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন গবেষক, বিজ্ঞানী বা সত্য অন্বেষণকারী বিশেষজ্ঞদের সমষ্টি
- অনুবাদ: “এবং (হে রসূল!) আমরা আপনাকে সমস্ত মানবসমাজ ও জ্ঞানবানদের সবার জন্য সার্বিক প্রবৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও করুণার বলয় (رَحْمَةً لِّلْعَالَمِينَ) হিসেবেই প্রেরণ করেছি।”
***আর (হে সত্যের বাণী, প্রগতিশীল সমাজ ও হেদায়েতের রূপরেখা!) আমি তোমাকে সমগ্র মহাবিশ্ব, সমস্ত সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা এবং সকল জ্ঞান অন্বেষণকারী বিশেষজ্ঞদের (আলামীন) জন্য কেবলই এক সর্বজনীন প্রবৃদ্ধি, বিকাশ, সুরক্ষা ও পরম অনুকম্পার অবয়ব (রহমত) হিসেবেই প্রেরণ ও প্রসারিত করেছি
আয়াত ১০৮ (Verse 21:108)
আরবি পাঠ: قُلْ إِنَّمَا يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّسْلِمُونَ
إِلَٰهُكُمْ / إِلَٰهٌ (ইলাহুকুম / ইলাহুন): তোমাদের চূড়ান্ত আইনপ্রণেতা, শাসক, এবং যার হুকুম ও আদেশ সমাজ পরিচালনায় অন্ধভাবে মেনে চলা হয়। মানুষের বাস্তব ও সমষ্টিগত জীবনে আল্লাহর আইনের সমকক্ষ বর্জিত এমন একক অনুসরণযোগ্য শাসনব্যবস্থা, মৌলিক আইন ও অখণ্ড সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পরম কর্তৃপক্ষ যার কোনো সমকক্ষ বা বিকল্প তৈরি করা যায় না
قُلْ (কুল) → তুমি ঘোষণা করো / স্পষ্ট বলোإِنَّمَا (ইন্নামা) → কেবল মাত্র / নিশ্চয়ইيُوحَىٰ (ইউহা) → ওহী বা ঐশ্বরিক নির্দেশনা পাঠানো হয়إِلَيَّ (ইলাইয়া) → আমার প্রতি / আমার কাছেأَنَّمَا (আন্নামা) → যে / সুনিশ্চিতভাবেإِلَٰهُكُمْ (ইলাহুকুম) → তোমাদের একমাত্র আইনদাতা / আনুগত্যের মূল কেন্দ্রإِلَٰهٌ (ইলাহুন) → এমন এক সর্বময় সত্তা বা বিধান যার আইন মানা আবশ্যকوَاحِدٌ (ওয়াহিদুন) → একক / অনন্য (যা আহাদ-এর সমার্থক বা একত্ববোধক)فَهَلْ (ফাহাল) → তবে কি / অতএব কি তোমরাأَنتُم (আনতুম) → তোমরা নিজেরাمُّسْلِمُونَ (মুসলিমুন) → পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী / আল্লাহর আইনের ভিত্তিতে শান্তি ও নিরাপত্তা স্থাপনকারী
مُّسْلِمُونَ (মুসলিমুন): যারা ঐশী আইনের সামনে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করে। যারা সত্য উন্মোচিত হওয়ার পর নিজেদের ক্ষতিকর গোঁড়ামি ও কুসংস্কার বর্জন করে ঐশ্বরিক নিয়মের কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে এবং সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও সুসংহত ভারসাম্য রক্ষা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়
- অনুবাদ: “আপনি ঘোষণা করুন, ‘আমার প্রতি কেবল এই ওহী বা ঐশী নির্দেশনা পাঠানো হয় যে—তোমাদের চূড়ান্ত আইনপ্রণেতা ও শাসক মূলত একক সত্তা (إِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ); অতএব তোমরা কি (সেই একক আইনের সামনে) সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে (مُّসْلِمُونَ)?’”
***তুমি তোমার বাস্তব কর্ম, নীতি ও চরম ঘোষণার মাধ্যমে প্রকটিত কর যে— “আমার প্রতি মূলত এই সূক্ষ্ম, সত্য ও জীবনমুখী দিকনির্দেশনাই সঞ্চারিত (ইউহা) করা হচ্ছে যে, তোমাদের একমাত্র অনুসরণযোগ্য আইন, মৌলিক সামাজিক বিধান ও সার্বভৌম কর্তৃপক্ষ হলেন একক ও অবিভাজ্য সার্বভৌম সত্তা (ইলাহুন্ ওয়াহিদ); অতএব তোমরা কি এই পরম সত্যের সামনে নিজেদের কৃত্রিম অহমিকা বর্জন করে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী ও শান্তিকামী (মুসলিমুন) হবে?”
আয়াত ১০৯ (Verse 21:109)
আরবি পাঠ: فَإِن تَوَلَّوْا فَقُلْ آذَنتُكُمْ عَلَىٰ سَوَاءٍ ۖ وَإِنْ أَدْرِي أَقَرِيبٌ أَم بَعِيدٌ مَّا تُوعَدُونَ
تَوَلَّوْا (তাওয়াল্লাও): সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া, পিঠ প্রদর্শন করা বা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া।
আধান্তুকুম (آذَنتُكُمْ): আমি তোমাদের প্রকাশ্য ও স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছি, সতর্ক বা ইশতেহার জারি করেছি। প্রতিপক্ষের মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক বলয়কে স্পর্শ করে সত্যের অমোঘ সামাজিক আইন ও দায়বদ্ধতার বিষয়টিকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রকটিত, উন্মুক্ত ও সমানভাবে জারি করা
عَلَىٰ سَوَاءٍ (আলা সাওয়া-ইন): কোনো প্রকার গোপনীয়তা, পক্ষপাতিত্ব বা বৈষম্য ছাড়া সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের জন্য সমান সুযোগ ও সমান্তরালভাবে উন্মুক্ত ক্ষেত্র তৈরি করা।সম্পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে, অর্থাৎ কোনো লুকোছাপা ছাড়া উন্মুক্ত ও সমানভাবে।
فَإِن (ফা ইন্) → অতঃপর যদিتَوَلَّوْا (তাওয়াল্লাও) → তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় / দায়িত্ব এড়িয়ে চলেفَقُلْ (ফাকুল) → তবে তুমি বলো / ঘোষণা করোآذَنتُكُمْ (আযান্তুকুম) → আমি তোমাদেরকে জানিয়েছি / সতর্ক করেছিعَلَىٰ (আলা) → উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন বুনিয়াদের ওপর / নীতিগতভাবে(ফাইল অনুযায়ী: ‘Ala’ কেবল preposition নয়, এর অর্থ prestige, superiority বা dignity-ও বোঝায়)سَوَاءٍ (সাওয়া-ইন) → সমানভাবে / সমতার ভিত্তিতে (কোনো রকম ভেদাভেদ না রেখে)وَإِنْ (ওয়া ইন্) → এবং আমি নিশ্চিতভাবে জানি নাأَدْرِي (আদরি) → আমি অবগত আছি / গণনা বা অনুমান করতে পারি (ফাইল অনুযায়ী: ‘Adra/Addra’ মানে পরিণতি বা গণনা সম্পর্কিত অনুমান)أَقَرِيبٌ (আকারীবুন) → তা কি অতি নিকটবর্তীأَم (আম) → নাকি / অথবাبَعِيدٌ (বাঈদুন) → সুদূরপরাহত / দীর্ঘ সময় সাপেক্ষمَّا (মা) → যা / যে বিষয়টিتُوعَدُونَ (তুয়াদুন) → তোমাদেরকে প্রতিশ্রুতি বা হিসাবের মুখোমুখি করার কথা বলা হচ্ছে.
مَا تُوعَدُونَ (মা তুআদুন): আল্লাহর অমোঘ সামাজিক ও প্রাকৃতিক নিয়ম (Law of Cause and Effect) অনুসারে মানুষের কৃতকর্মের কারণে অবধারিতভাবে ধেয়ে আসা সুনির্দিষ্ট সামাজিক পরিণতি, ভাঙন বা বিপর্যয়।
- অনুবাদ: “অতঃপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় বা দায়িত্ব এড়িয়ে যায় (تَوَلَّوْا), তবে আপনি বলুন, ‘আমি তোমাদের সবাইকে সম্পূর্ণ সমতার ভিত্তিতে এবং স্পষ্টভাবে ওহীর বার্তা জানিয়ে দিয়েছি (آذَنتُكُمْ عَلَىٰ سَوَاءٍ); আর আমি জানি না যে তোমাদের যে কর্মফলের বা পরিণতির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, তা কি খুব নিকটবর্তী নাকি দূরবর্তী?’”
***অতঃপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় বা এই প্রগতিশীল সমাজ-সংস্কারের ধারাকে এড়িয়ে চলে, তবে তুমি তোমার বাস্তব আচরণের মাধ্যমে স্পষ্টভাবে ঘোষণা কর— “আমি তোমাদের সবাইকে সমানভাবে, উন্মুক্তভাবে ও কোনো ভেদাভেদ ছাড়াই এই পরম সত্যের মনস্তাত্ত্বিক ঘোষণা ও সতর্কবার্তা স্পষ্ট করে পৌঁছে দিয়েছি (আযান্তুকুম); আর আমি এটি নিজের মনগড়া গণনায় বা সংকীর্ণ জ্ঞানে নির্ধারণ করি না যে, তোমাদের এই অবাধ্যতা ও নেতিবাচক কর্মের ফলশ্রুতিতে যে অবধারিত সামাজিক পরিণতি বা প্রতিশ্রুত বিপর্যয় (মা তুআদুন) আসবে— তা কি অতি নিকটে নাকি সুদূর ভবিষ্যতে।
আয়াত ১১০ (Verse 21:110)
আরবি পাঠ: إِنَّهُ يَعْلَمُ الْجَهْرَ مِنَ الْقَوْلِ وَيَعْلَمُ مَا تَكْتُمُونَ
الْجَهْرَ (আল-জাহরা):সমাজে প্রচলিত প্রকাশ্য সামাজিক আদর্শ, রাজনৈতিক বয়ান, প্রাতিষ্ঠানিক রীতিনীতি এবং মানুষের বাহ্যিক আচরণগত প্রকাশ। প্রকাশ্য কথাবার্তা, উচ্চকণ্ঠে বলা নীতি বা জনসমক্ষে প্রদর্শিত আচরণ।
لِ (আল-কাওলি) → মানুষের বক্তব্য, আচরণ বা কর্ম-নীতিوَيَعْلَمُ (ওয়া ইয়া’লামু) → এবং তিনি অবগত আছেনمَا (মা) → যা কিছু / যে কর্মপদ্ধতি
تَكْتُمُونَ (তাকতুমুন): কেবল মনে মনে গোপন রাখা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া কিতাব ও হেদায়েতকে নিজের জীবনে প্রয়োগ না করা, সত্যকে জেনেও তা ধামাচাপা দেওয়া, অন্ধ অনুসরণের কারণে নিজের আকলকে অবরুদ্ধ রাখা অথবা ঐশ্বরিক আইনকে নিজস্ব স্বার্থে বিকৃত ও ফ্যাব্রিকেশন করা।
- অনুবাদ: “নিশ্চয়ই তিনি (আল্লাহর নিয়ম) তোমাদের প্রকাশ্য কথাবার্তা ও নীতি সম্পর্কেও অবগত (يَعْلَمُ الْجَهْرَ مِنَ الْقَوْلِ) এবং তোমরা তোমাদের ভেতরে বা গোপনে যা কিছু লুকিয়ে রাখো বা আড়াল করো (تَكْتُمُونَ), তাও তিনি সম্যক জানেন।”
নিশ্চয়ই তিনি বা তাঁর তৈরি করা মহাজাগতিক ও সামাজিক নিয়ম মানুষের প্রকাশ্য আচরণ, সমাজ-প্রভাবিত বক্তব্য ও বাহ্যিক কর্মকাণ্ড (আল-জাহরা মিনাল ক্বাওল) সম্পর্কেও যেমন পূর্ণ অবগত, ঠিক তেমনি তোমরা কায়েমী স্বার্থ বা অন্ধ অনুসরণের কারণে মনের ভেতরে বা গোপনে সত্যের যে অংশটুকুকে আড়াল করার অপচেষ্টা কর, অনুধাবন করতে চাও না কিংবা বিকৃত বা ফ্যাব্রিকেট করতে চাও (মা তাকতুমন)— সে সম্পর্কেও পরম জ্ঞানসম্পন্ন।
আয়াত ১১১ (Verse 21:111)
আরবি পাঠ: وَإِنْ أَدْرِي لَعَلَّهُ فِتْنَةٌ لَّكُمْ وَمَتَاعٌ إِلَىٰ حِينٍ
- فِتْنَةٌ (ফিতনাতুন): মানুষের আসল রূপ বা যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা বা মনস্তাত্ত্বিক কষ্টিপাথর। মানুষের কায়েমি স্বার্থ ও অন্ধ অনুসরণের ফলে সমাজে সৃষ্ট চরম মনস্তাত্ত্বিক জট, মতাদর্শিক বিশৃঙ্খলা, দাঙ্গা, সংঘাত বা এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করার কষ্টিপাথর হিসেবে কাজ করে।
- وَمَتَاعٌ إِلَىٰ حِينٍ (ওয়ামাতাউন ইলা হীন): প্রথাগত চিরস্থায়ী ভোগবিলাস নয়; বরং আল্লাহর তৈরি প্রাকৃতিক ও সামাজিক নিয়মের অধীনে ধ্বংসাত্মক পরিণতি কার্যকর হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত একটি সুনির্দিষ্ট ও সাময়িক সময়ের জন্য জীবনধারণের বাহ্যিক উপায়-উপকরণ বা সুযোগ লাভ করা
وَإِنْ (ওয়া ইন্) → এবং আমি তা অনুধাবন বা গণনা করতে পারি নাأَدْرِي (আদরি) → আমার জানা নেই / আমার অনুমানে নেইلَعَلَّهُ (লাআল্লাহু) → সম্ভবত এটি / এটি হতে পারেفِتْنَةٌ (ফিতনাতুন) → তোমাদের জন্য পরীক্ষা বা আত্মশুদ্ধির কষ্টিপাথরلَّكُمْ (লাকুম) → তোমাদের নিজেদের স্বার্থে বা কল্যাণে / তোমাদের জন্যوَمَتَاعٌ (ওয়া মাতাউন) → এক সাময়িক সুবিধা, জীবন ধারণের উপকরণ বা সচ্ছলতাإِلَىٰ (ইলা) → পর্যন্তحِينٍ (হীনিন) → একটি সুনির্দিষ্ট কাল বা নির্ধারিত সময়সীমা পর্যন্ত।
অনুবাদ: “এবং আমি জানি না, (এই অকাট্য পরিণতি বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়া) হয়তো তোমাদের জন্য এক বড় পরীক্ষা ও কষ্টিপাথর (فِتْنَةٌ لَّكُمْ), এবং একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সাময়িক বৈষয়িক সুযোগ ভোগ করার অবকাশ মাত্র (وَمَتَاعٌ إِلَىٰ حِينٍ)।”
***আর আমি এটি নিজের মনগড়া ধারণায় অনুমান বা গণনা করি না; বরং (চূড়ান্ত পরিণতি আসার আগে এই যে সময় বা অবকাশ দেওয়া) সম্ভবত এটি তোমাদের নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তিক যোগ্যতা, সততা ও আকলের কার্যকারিতা যাচাইয়ের এক সামাজিক পরীক্ষা বা মনস্তাত্ত্বিক বিশৃঙ্খলা (ফিতনাতুন) এবং একটি সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পার্থিব জীবনের সাময়িক উপায়-উপকরণ ভোগ করার সুযোগ মাত্র
আয়াত ১১২ (Verse 21:112)
আরবি পাঠ: قَالَ رَبِّ احْكُم بِالْحَقِّ ۗ وَرَبُّنَا الرَّحْمَٰنُ الْمُسْتَعَانُ عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ
- WQT কি-ওয়ার্ড:
- احْكُم بِالْحَقِّ (উহকুম বিল-হাক্বি): পরম বাস্তব সত্য ও নিখুঁত ইনসাফের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফয়সালা বা আইনি রায় কার্যকর করা।
- الْمُسْتَعَانُ (আল-মুস্তায়ানু): যার তৈরি করা সিস্টেম বা নিয়মের কাছে একমাত্র সাহায্য, শক্তি বা আইনি আশ্রয় চাওয়া হয়। আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক বিধিমালা ও বৈজ্ঞানিক সত্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তব ও পদ্ধতিগত উপায়ে শক্তির উৎস অনুসন্ধান করা, সংহতি স্থাপন করা বা দুর্ভেদ্য আশ্রয় লাভ করা
قَالَ (কালা) → রাসুল বা বার্তাবাহক বললেনرَبِّ (রাব্বি) → হে আমার পালনকর্তা ও বিকাশকারী সত্তা!احْكُم (উহকুম) → আপনি চূড়ান্ত ফায়সালা বা আইন জারি করুনبِالْحَقِّ (বিল-হাক্কি) → পরম সত্য ও ন্যায়বিচারের সত্য অধিকারের ভিত্তিতেوَرَبُّنَا (ওয়া রাব্বুনা) → এবং আমাদের মূল বিকাশকারী বা পালনকর্তা হলেনالرَّحْمَٰنُ (আর-রাহমানু) → পরম দয়াময়, অফুরন্ত কল্যাণ ও জীবন ধারণের সুরক্ষাদাতাالْمُسْتَعَانُ (আল-মুস্তায়ানু) → একমাত্র সাহায্য, সহযোগিতা ও আশ্রয় নেওয়ার স্থল(ফাইল অনুযায়ী: ‘Awanun/Ta’awun’ মানে পারস্পরিক সাহায্য ও সুদৃঢ় সমর্থন)عَلَىٰ (আলা) → আমাদের ওপর অর্পিত যাবতীয় মর্যাদার সুরক্ষায়مَا (মা) → যা কিছু / যে মনগড়া ব্যাখ্যাتَصِفُونَ (তাসিফুন) → তোমরা আরোপ করছ বা অসত্যভাবে বর্ণনা করছ. - تَصِفُونَ (তাছিফুন): তোমরা কিতাবের বাইরে গিয়ে যেসব মনগড়া ব্যাখ্যা, কুৎসা বা কাল্পনিক কথা সাজিয়ে বলছো। ঈশ্বরের নামে মানুষের তৈরি মনগড়া মিথ্যা গুণাবলি আরোপ করা, ধর্মীয় অন্ধ প্রথার ফ্যাব্রিকেশন করা বা সত্যকে বিকৃত উপায়ে উপস্থাপন করা
- অনুবাদ: “(চূড়ান্ত পর্যায়ে) প্রার্থনা করল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি পরম বাস্তব সত্য ও ইনসাফের ভিত্তিতে চূড়ান্ত ফয়সালা কার্যকর করুন (رَبِّ احْকُم بِالْحَقِّ); এবং আমাদের প্রতিপালক হলেন পরম দয়াময়, আর তোমরা ওহীর বাইরে গিয়ে যেসব মনগড়া কাল্পনিক কথা সাজিয়ে বলছো (عَلَىٰ مَا تَصِفُونَ), তার বিরুদ্ধে একমাত্র তাঁরই তৈরি করা নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে সাহায্য ও আইনি আশ্রয় চাওয়া হচ্ছে (الْمُسْتَعَانُ)।’”
সেই সত্যের বাণী ও সামগ্রিক জিম্মাদারি তার পরম বাস্তব প্রচার ও ঘোষণার মাধ্যমে প্রকটিত বা সুনির্দিষ্ট করল— “হে আমার প্রতিপালক! আপনি পরম সত্য, ন্যায়, সামঞ্জস্য ও আপনার অমোঘ বিধিমালার ভিত্তিতে আমাদের চূড়ান্ত ফয়সালা বা আইন সম্পূর্ণরূপে কার্যকর ও বাস্তবায়িত করুন (উহকুম বিল-হাক্ক)। আর আমাদের প্রতিপ্রতিপালক হলেন পরম দয়াময়, বিকাশ, পুষ্টি ও সর্বজনীন প্রবৃদ্ধির একমাত্র আধার (আর-রাহমান), যার সুনির্দিষ্ট বিধিমালার বাস্তব সাহায্য, সংহতি ও আশ্রয়ই (আল-মুস্তায়ানু) একমাত্র কাম্য— তোমরা আল্লাহর নামে যেসব মনগড়া, প্রথাবদ্ধ বিকৃত অবয়ব, গুণাবলি বা মিথ্যা মতবাদের কোলাজ তৈরি ও ফ্যাব্রিকেশন করছ (মা তাছিফুন), তার বিরুদ্ধে
[1] . Sovereignty has been defined as “the power to be all things without accountability”. Robert Lansing “Notes on Sovereignty”, p. 3 (Quoted by Jacques Maritain in Man and the State, p. 51)
[2] Meteors are small celestial bodies of the solar system that break away from their path due to gravitational pull. They come down as a shower of stones. When they come down, the earth’s atmosphere grinds them down to dust. Sometimes these stones are big and do not grind down completely; and small pieces fall on earth. However, this happens rarely. If the atmosphere did not do that, the stone rain would make life on earth very difficult. The atmosphere acts like a ‘safe roof’.
[3] Another import of this can be that the priests might have said, “We know that it is a doing of your party but we want to ascertain whether you yourself have done it or any other member of your group.” In answer to which Abraham could have said, “No not anybody else, but the biggest of them standing right before you has personally done it.” But to us the manner of response brought forth in the context is closer to Abraham’s mature approach mentioned in 21:51.
[4] If these verses are considered to pertain to life after death, then they have reference to the total annihilation of this physical universe, after which another era of new creation would begin. In that case this particular verse points to a great event when, after this ‘doom’, re-creation of a new universe shall start, like it had done the first time.