প্রশ্ন ১: কুরআনের আয়াতে কি আদমকে “তীন” (teen) থেকে তৈরি করার কথা বলা হয়েছে?
উত্তর: হ্যাঁ, আদমকে “তীন” (আরবি: طين) থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, যার অর্থ হলো কাদা বা কাদামাটি।
প্রথম মানব সৃষ্টির বিবরণ দিয়ে কুরআনের বেশ কয়েকটি আয়াতে এই শব্দটি এসেছে। যেহেতু আরবি শব্দ ‘তীন’-এর বানান ত্বো (ط), ইয়া (ي) এবং নূন (ن) দিয়ে গঠিত, তাই ইংরেজিতে এটি লেখার সময় (Teen) দেখায় এবং উচ্চারণটি ইংরেজি শব্দ “Teen” (কিশোর)-এর মতো শোনায়। এই কারণে ইংরেজি পাঠকদের মধ্যে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়।
কুরআনে “তীন” শব্দের উল্লেখ থাকা মূল আয়াতসমূহ:
কুরআনের বিভিন্ন সূরায় আদমকে কাদামাটি থেকে সৃষ্টির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে:
- সূরা আল-মু’মিনুন (২৩:১২): “নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কাদামাটির (তীন) উপাদান থেকে।”
- সূরা সাদ (৩৮:৭১): “স্মরণ করো, যখন তোমার পালনকর্তা ফেরেশতাদের বলেছিলেন, ‘আমি কাদামাটি (তীন) থেকে একজন মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।'”
- সূরা আস-সাজদাহ (৩২:৭): “…এবং তিনি মানুষের সৃষ্টি সূচনা করেছিলেন কাদামাটি (তীন) থেকে।”
কুরআনে বর্ণিত কাদামাটির বিভিন্ন স্তরসমূহ:
আদমকে যে উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়েছে, তা বোঝাতে কুরআনে কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ইসলামিক স্কলার বা পন্ডিতগণ এগুলোকে একই উপাদানের বিভিন্ন রূপ বা স্তর হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন:
- তুরাব (ধুলা/মাটি): প্রাথমিক উপাদান যা পৃথিবী থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল।
- তীন (কাদামাটি): ধুলার সাথে পানি মেশানোর পর তৈরি হওয়া আঠালো কাদা।
- হামায়িন মাসনুন (পরিবর্তিত কালো কাদা): যে কাদামাটিকে একটি নির্দিষ্ট রূপ দেওয়ার জন্য কিছু সময় রেখে দেওয়া হয়েছিল।
- সালসাল (পোড়ামাটি/শুকনো কাদা): শুকিয়ে যাওয়া শক্ত কাদা, যাতে আঘাত করলে শব্দ হয়।
প্রশ্ন ২: ঠিক কোন জায়গায় বলা হয়েছে যে আদমকে “তীন” থেকে তৈরি করা হয়েছে?
উত্তর: প্রথম মানুষ অর্থাৎ আদম (আঃ)-এর সৃষ্টি বোঝাতে কুরআনের বেশ কয়েকটি সূরায় সরাসরি আরবি শব্দ “তীন” (طين) ব্যবহার করা হয়েছে। নিচে আরবি টেক্সটসহ সুনির্দিষ্ট আয়াতগুলো দেওয়া হলো যাতে আপনি শব্দটির অবস্থান দেখতে পারেন:
১. সূরা সাদ (৩৮:৭১)
ফেরেশতাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশের সময় এই আয়াতে আদমের সৃষ্টিকে সরাসরি ‘তীন’-এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে:
إِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِّن طِينٍ
“স্মরণ করো, যখন তোমার পালনকর্তা ফেরেশতাদের বলেছিলেন, ‘আমি কাদামাটি (তীন) থেকে একজন মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।'”
২. সূরা আল-মু’মিনুন (২৩:১২)
এই আয়াতে আদম (আঃ)-এর মাধ্যমে মানবজাতির সৃষ্টির সূচনার কথা বলা হয়েছে:
وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن سُلَالَةٍ مِّن طِينٍ
“নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি কাদামাটির (তীন) উপাদান থেকে।”
৩. সূরা আস-সাজদাহ (৩২:৭)
এই আয়াতে আদম (আঃ)-এর শারীরিক সৃষ্টির সূচনার সাথে তার পরবর্তী বংশধরদের জন্মের পার্থক্য দেখানো হয়েছে:
وَبَدَأَ خَلْقَ الْإِنسَانِ مِن طِينٍ
“…এবং তিনি মানুষের সৃষ্টি সূচনা করেছিলেন কাদামাটি (তীন) থেকে।”
৪. সূরা আল-আন’আম (৬:২)
মানবজাতির মাটির তৈরি অস্তিত্বকে প্রমাণ করে এমন আরেকটি আয়াত:
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن طِينٍ
“তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি (তীন) থেকে…”
৫. সূরা আল-ইসরা (১৭:৬১)
এই আয়াতে শয়তানের (ইবলিস) সেই অহংকারী উক্তি রয়েছে, যেখানে সে আদমকে মাটি দিয়ে তৈরি করায় অবজ্ঞা করেছিল:
قَالَ أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا
“সে [ইবলিস] বলল, ‘আমি কি এমন ব্যক্তিকে সিজদা করব যাকে আপনি কাদামাটি (তীন) দিয়ে সৃষ্টি করেছেন?'”
প্রশ্ন ৩: কিন্তু এখানে তো “আদম” নামের কোনো উল্লেখ নেই?
উত্তর: আপনার পর্যবেক্ষণ একদম সঠিক। ওপরের বেশ কয়েকটি আয়াতে এককভাবে শুধু ওই লাইনে সরাসরি “আদম” নামটি লেখা নেই। তার পরিবর্তে কুরআনে তাকে বোঝাতে “ইনসান” (মানবজাতি/মানুষ) বা “বাশার” (মানব সত্তা) শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে, সূরা আল-ইসরা (১৭:৬১)-তে একই আয়াতের ভেতর “আদম” নাম এবং “তীন” (কাদামাটি) শব্দ—দুটোই একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে। আয়াতটি নিচে দেওয়া হলো:
وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ قَالَ أَأَسْجُدُ لِمَنْ خَلَقْتَ طِينًا
“এবং স্মরণ করো, যখন আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, ‘তোমরা আদম-কে সিজদা করো’, তখন ইবলিস ছাড়া তারা সবাই সিজদা করল। সে বলল, ‘আমি কি এমন সত্তাকে সিজদা করব যাকে আপনি কাদামাটি (তীন) থেকে সৃষ্টি করেছেন?'” — (সূরা আল-ইসরা ১৭:৬১)
আরবি লেখায় শব্দ দুটি যেভাবে চিনবেন:
- لِآدَمَ (লি-আদামা): এর অর্থ “আদমের প্রতি বা আদমকে”। ওপরের আরবি লাইনে এটি ৪র্থ শব্দ।
- طِينًا (তীনান): এর অর্থ “কাদামাটি”। এটি এই আয়াতের একেবারে শেষ শব্দ।
অন্যান্য আয়াতে আদমের বদলে “মানুষ” কেন বলা হয়েছে?
আরবি সাহিত্যিক শৈলী অনুযায়ী, সৃষ্টির ইতিহাস বর্ণনা করার সময় কুরআন প্রায়শই আদম (আঃ)-কে সরাসরি নির্দেশ করতে বাশার বা ইনসান শব্দ ব্যবহার করে।
যেমন, আপনি যদি সূরা সাদের (৩৮:৭১-৭৩) আয়াতগুলো দেখেন—৭১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আমি কাদামাটি (তীন) থেকে একজন মানুষ (বাশার) সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।” এর ঠিক দুই আয়াত পরেই ৭৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তখন ফেরেশতারা সবাই একসাথে আদম-কে সিজদা করল।” এই প্রসঙ্গের কারণেই ইসলামিক স্কলারগণ নিশ্চিতভাবে বলেন যে, কাদামাটি দিয়ে যাকে তৈরি করা হয়েছিল, তিনি আদম (আঃ)।
প্রশ্ন ৪: কিন্তু কুরআনে তো বলা হয়েছে আদমকে “তুরাব” (মাটি) থেকে তৈরি করা হয়েছে?
উত্তর: আপনি পুরোপুরি সঠিক। কুরআনে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে আদমকে “তুরাব” (تُرَاب – ধুলা/শুকনো মাটি) থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই কথাটি সরাসরি সূরা আলি ‘ইমরানের ৫৯ নম্বর আয়াতে রয়েছে:
“নিশ্চয় আল্লাহর কাছে ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের মতোই। তিনি তাকে মাটি (তুরাব) থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তাকে বললেন, ‘হও’, ফলে সে হয়ে গেল।” — (সূরা আলি ‘ইমরান ৩:৫৯)
এর সাথে ‘তীন’ (কাদামাটি) সংক্রান্ত আয়াতের কোনো সাংঘর্ষিক বা বিপরীত অর্থ নেই। ইসলামিক স্কলার এবং প্রাচীন তাফসিরবিদগণ ব্যাখ্যা করেছেন যে, এই শব্দগুলো একই সৃষ্টি প্রক্রিয়ার ভিন্ন ভিন্ন শারীরিক স্তর বা ধাপকে নির্দেশ করে:
[ ধাপ ১: তুরাব ] ---> [ পানির সাথে মিশ্রণ ] ---> [ ধাপ ২: তীন ]
(শুষ্ক ধুলা / মাটি) (আঠালো কাদা / কাদা মাটি)
১. প্রথম ধাপ: তুরাব (تُرَاب): সৃষ্টির প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল পৃথিবী থেকে সংগ্রহ করা শুষ্ক ধুলা বা মাটি দিয়ে।
২. দ্বিতীয় ধাপ: তীন (طِين): এরপর সেই মাটির সাথে পানি মেশানো হয়, যা এটিকে কাদামাটিতে পরিণত করে।
আল্লাহ কত সহজে কোনো কিছু ছাড়াই জীবন দিতে পারেন (যেমনটা আদম ও ঈসা উভয়ের ক্ষেত্রেই ঘটেছে)—তা বোঝাতে কুরআনে ‘তুরাব’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আর যখন মানুষের শারীরিক আকৃতি গঠন ও তার উপাদানের ঘনত্বের বিবরণ দেওয়া হয়েছে, তখন ‘তীন’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। দুটি শব্দই সৃষ্টির ইতিহাসের ভিন্ন ভিন্ন ধাপের সঠিক বর্ণনা দেয়।