কুরআন অবতীর্ণ হবার আগে প্রি-ইসলামিক আরবের ক্যালেন্ডারে “রামাদান” নামের কোনো মাসের অস্তিত্বই ছিল না। তাহলে সুরা বাকারার ২:১৮৫ তে “শাহরু রামাদান” বলতে কোন মাসকে বুঝাইছে?

ধরেন, আপনি ইংরেজি বারো মাসের নাম জানেন। এখন আপনাকে যদি আমি বলি “স্বাধীনতার মাসে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি”। তার মানে কিন্তু মাসটার নাম “স্বাধীনতা” হয়ে যায়না। আপনি যেহেতু বাংলাদেশের ইতিহাস জানেন, তাই আপনি বুঝে নিলেন যে স্বাধীনতার মাস হলো “মার্চ মাস”। এখানে মার্চ মাসকে গ্লোরিফাই করা হয়েছে “স্বাধীনতার মাস” বলে।

এবার ১৪০০ বছর আগে টাইম ট্রাভেল করে আরবে যান। আপনি জানেন যে “রামাদান” নামক কোনো মাসের অস্তিত্ব নাই। আপনি নিচের ১২টি আরবি মাসের নাম জানেন:

১.মুতামির,
২.নাজির,
৩.খাওয়ান,
৪.ওয়াবসান,
৫.হানিন,
৬.রুব্বা,
৭.আস্সাম/মুনসিল,
৮. আদিল,
৯. নাতিক,
১০ওয়াইল,
১১.ওয়ারনাহ,
১২.বুরাক।

এখন কুরআনের সুরা বাকারা ১৮৫ আয়াতে “শাহরু রামাদান” উল্লেখ করে বলা হলো ঐ রাতে কুরআন গাইডেন্স হিসাবে অবতীর্ণ হয়েছে। ধরুন, আপনি আয়াতটি লাইভ শুনলেন নবী এর মুখে। আপনি কি কিছু বুঝবেন এইটা তৎকালীন প্রি ইসলামিক আরবি ক্যালেন্ডারে কোন মাসের কথা বলা হইছে?

আমরা যেমন স্বাধীনতার মাস বা বিজয়ের মাসকে গ্লোরিফাই করি একটি নির্দিষ্ট ইভেন্টের কারণে ( ২৬শে মার্চ, ১৬ ডিসেম্বর) তেমনি কুরআন অবতীর্ণ হবার যে ইভেন্ট (অর্থাৎ যেই রাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়) সেই মাসকে গ্লোরিফাই করা হয়েছে “শাহরু রামাদান” বা “তীব্র উত্তাপের মাস” বলে।

রামাদান শব্দের অর্থ হচ্ছে “তীব্র উত্তাপ”। কুরআন অবতীর্ণের ইভেন্টকে “তীব্র উত্তাপ” বলে গ্লোরিফাই করার কারণ হলো সমাজের অন্ধকার দূর করতে তীব্র উত্তাপের মত শক্তির প্রয়োজন হয়।

এখন মজার ব্যাপার হলো প্রি ইসলামিক ক্যালেন্ডারের “নাতিক” মাসকে বর্তমান ইসলামিক ক্যালেন্ডারে “রামাদান” নামক মাসটি দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হইছে। অর্থাৎ “রামাদান” নামে যে মাসটি এখন দেখতে পাচ্ছেন তা কুরআন অবতীর্ণের বহু পরে (খলিফা ওমরের শাসনামলে) প্রবর্তিত ইসলামিক ক্যালেন্ডারে একটি মাস হিসাবে স্বীকৃতি পাইছে।

মানে ব্যাপারটা হলো ডিসেম্বর মাসের নাম বদলায়ে ২০ বছর পরে অফিসিয়ালি “বিজয়ের মাস” রাখার মত অবস্থা। উল্লেখ্য, এক্ষেত্রে কিন্তু আমরা সুনির্দিষ্টভাবে জানি যে ১৬ই ডিসেম্বর আমরা বিজয় অর্জন করেছি।

সমস্যা হলো প্রি ইসলামিক “নাতিক” মাসেই (যা পরে রামাদান মাস দ্বারা প্রতিস্থাপিত হইছে) যে কুরআন অবতীর্ণ হইছে, তার কোনো প্রমাণ নাই। কুরআন অবতীর্ণ হবার ইভেন্টকে গ্লোরিফাই করা হয়েছে “শাহরু রামাদান” বলে, কিন্তু সেটা কবে, কোন রাতে, সেই তথ্য কুরআনে নেই। একইভাবে “লাইলাতুল ক্বদর”ও সেই বিশেষ রাতকেই ইঙ্গিত করে, তবে সেটা কবে সেটাও বলা নাই কুরআনে। এবং এটিকেও “সম্মানের রাত” (ক্বদর অর্থ সম্মান, লাইল অর্থ রাত) হিসাবে গ্লোরিফাই করা হয়েছে, “ক্বদর” নামে কোনো রাতের নাম নয় এটি, ঠিক যেমন “রামাদান” নামে কোনো মাস ছিল না। এগুলো শুধুমাত্রই “বিশেষণ”, কোনো বিশেষ্য নয়।

এত সম্মানের রাত ও সম্মানের মাস নিয়ে এত ধোয়াশা কেন কুরআনে- সেটাই হলো ফুড ফর থট! এটা যখন পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ, স্রস্টা কি পারতেন না স্পেসিফিক করে বলে দিতে যে কবে ছিল সেই রাত কিংবা সেই কিংবা সেই মাস?
সিয়াম

সাধারণসিয়াম (২ঃ১৮০-১৮৪)

স্পেশালসিয়াম (২ঃ১৮৫-১৮৭)

২ঃ১৮০-২ঃ১৯১ পর্যন্ত সঠিক অনুবাদঃ পুরো কনটেক্সট পড়লে সিয়ামের বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

২ঃ১৮০ “তোমাদের জন্য আদেশপত্র জারি হয়েছে যে (কুতিবা) যখন তোমাদের মধ্যে কেউ মৃত্যুর কাছাকাছি পর্যায়ে আসে, তখন সে যেন ভালোভাবে (খাইরান) সম্পদ বন্টনের দলিল (ওয়াসিয়াত) তৈরি করে রেখে যায় তার পিতা-মাতা ও নিকট আত্মীয়ের জন্য ন্যায্য উপায়ে (বিল মারুফি)- ইহা আল্লাহ সচেতন/সংযোগ স্থাপনকারী (মু্ত্তাকি) দের জন্য একটি অবশ্য কর্তব্য।”

২ঃ১৮১ “অতঃপর যে এই সম্পদ বন্টনের দলিল (ওয়াসিয়াত) পরিবর্তন করবে, তা শোনার পরও- সেই পাপের ভাগীদার হবে যে তা পরিবর্তন করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব শোনেন এবং জানেন।”

২ঃ১৮২ “কিন্তু কেউ যদি আশংকা করে যে দলিল লেখক (মুছছি) কোনো ভুল করতে পারে এবং সে যদি দলিল লেখকের ভুল সংশোধন করে ভারসাম্য করে (আসলাহা) দেয় নিজেদের মধ্যে, তাহলে তার কোনো পাপ হবে না। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল এবং করুণাময়।”

২ঃ১৮৩- “হে যারা ঈমান এনেছো! তোমাদের জন্য সিয়ামের আদেশপত্র জারি (কুতিবা) হয়েছে যেমনটা জারি হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীগণের প্রতি যাতে তোমরা সুরক্ষিত/সংযোগ স্থাপিত/খাঁটি মানুষ (মুত্তাকি) হতে পারো।”

২ঃ১৮৪ “সময় কালের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। তাই তোমাদের মধ্যে কেউ যদি ভ্রমণে থাকে অথবা অসুস্হ থাকে তাহলে অন্য সময়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করো। এবং কেউ যদি ফিদয়া/ক্ষতিপূরণ প্রদানের সামর্থ্য রাখে, তাহলে সে একজনকে খাদ্য প্রদান করবে। কেউ যদি স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত কিছু করে, তা তার জন্য ভালো। কিন্তু সিয়াম পালন সর্বোত্তম যদি তোমরা জানতে।

এ ধরনের সিয়াম অতীত পূর্বপুরুষদের জন্যও আদেশ হয়েছিল যখন কেউ কোনো পাপ/অপরাধ করে ফেলে। সিয়াম হলো নিজেদের ভুল সংশোধনের একটি উপায় যাতে আমরা মুত্তাকি/খাঁটি মানুষ হতে পারি যা আল্লাহর খলিফা/প্রতিনিধি হবার পূর্বশর্ত।

যেমন ২ঃ১৮৪ এর আগের আয়াত গুলোর প্রসংগে উইল পরিবর্তন এক ধরনের পাপ/অপরাধ। সেকারণে এ পাপ করলে কেউ যেন স্বেচ্ছায় কিছু সময় কালের জন্য সিয়াম পালন করে। যদি কেউ ভ্রমণে থাকে বা অসুস্হ হয়, তাহলেও সে যেন অন্য সময়ে এই সিয়াম পালন করে নেয়।

এই সিয়ামের বদলে বিকল্প হিসাবে আর্থিক ক্ষতিপূরন (ফিদয়া) এর ব্যবস্হাও আল্লাহ রেখেছেন আর তা হলো কোনো গরীবকে খাওয়ানো (২ঃ১৮০-১৮৪)

সিয়ামের পরিবর্তে এধরণের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা আছে ৫ঃ৯৫, ৪ঃ৯২ ইত্যাদি আয়াতে বিভিন্ন পাপের জন্য (অন্য মুমিনের সাথে লড়াই করা বা শপথ ভঙ্গ করা ইত্যাদি)।

এখন প্রশ্ন হলো সিয়ামটা আসলে কি এবং কিভাবে সেটা পালন করা যায়?

এর উত্তর আছে ১৯ঃ২৬ এ যেখানে মরিয়মকে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন

“অতঃপর ভক্ষণ করো/গ্রাস করো (কুল) এবং পান করো/আত্মস্হ করো (ওয়া আশরাবু) এবং দৃষ্টি শীতল করো। এবং মানুষের সাথে যদি দেখা হয়, তাহলে বলো আমি আজ আল্লাহর কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি সিয়াম পালনের, অতঃপর আজকে আমি কারো সাথে কথা বলবো না।”

অর্থাৎ সিয়ামের সংজ্ঞা হলো “কথা বলা থেকে বিরত থাকা এবং নিজেকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আত্মউপলব্ধি/গবেষণা বা সংশোধন করা।”

প্রশ্ন হলো নিজেকে গুটিয়ে ফেললে বা কারো সাথে কথা না বললে তা আমাদের মুত্তাকি বা খাঁটি মানুষ কিভাবে বানায়? উত্তর হলো এটি আমাদের সময় ও সুযোগ দেয় যে পাপ করেছি সেটা নিয়ে আত্মসমালোচনা করে পরিশুদ্ধ হবার। সিয়ামটা মুমিনদের জন্য জারি হয়েছে (২ঃ১৮৩)। একজন মুমিনের দায়িত্ব হলো তা সৎভাবে এবং যথাযথভাবে পূর্ণ করা। এ ধরনের সিয়াম পালনের সময় কারো সাথে দিনে রাতে কখনোই কথা বলা যাবে না।

এবার আমরা পরের আয়াতগুলো দেখবো যেখানে একটু “ভিন্ন রকম সিয়ামের” দেখা পাই।

২ঃ১৮৫ “ সুপরিচিত তীব্র উত্তপ্ত সময়ে (শাহরু রামাদান) কুরআন প্রচারের আদেশ হয়েছিল (উনজিলা) যা সমগ্র মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক (হুদা) এবং সুস্পষ্ট প্রমান (বাইতুনাতিন) পথ প্রদর্শন হতে (মিন আল হুদা) এবং সত্য মিথ্যার পার্থক্যকারী (আল ফুরকান)। কাজেই তোমাদের মধ্যে যারাই এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী (ফামান শাহিদা মিনকুম) সে যেন এই সময়ে সিয়াম পালন করে (ফালিয়াসমুহু) এবং কেউ যদি অসুস্থ অথবা ভ্রমণে থাকে সে যেন অন্য সময়কাল হতে (মিন আয়ামিন উখারা) প্রস্তুতি গ্রহণ করে (ফা ইদ্দাতুন)। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান এবং কঠিন করতে চান না, যাতে তোমরা প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারো (আল ইদ্দাতা) এবং যাতে তোমরা আল্লাহ মহত্ত্ব বিস্তৃত করতে পারো (তুকাব্বিরু) যে কারণে তিনি তোমাদের পথ দেখিয়েছেন এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ থাকো।

২ঃ১৮৬ “ এবং আমার বান্দারা যখন তোমাকে আমার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করে, আমি তো নিকটেই আছি। আমি তাদের আহ্বানে (দুআ) সাড়া দেই যখন তারা আমাকে ডাকে। কাজেই তারা যেন আমার প্রতি সাড়া দেয় এবং বিশ্বাস স্থাপন করে যেন আমি তাদেরকে সঠিক পথের দিশা দেখাতে পারি (ইয়ারশুদুনা)।

এর পরের আয়াতে এই “ভিন্ন সিয়ামের” বৈশিষ্ট্য পাওয়া যাবে।

২ঃ১৮৭ “তোমাদের জন্য সিয়ামের রাতে (সিয়াম আল লাইল) আলোচনা শুরু করার/কথা বলার অনুমতি (রাফাছা) দেওয়া হলো তোমাদেশ উপরে নির্ভরশীল (নিসাইকুম) দের সাথে। তারা তোমাদের আবরণ (লিবাসুন) এবং তোমরাও তাদের আবরণ। আল্লাহ জানেন যে তোমরা অতীতে আত্মপ্রতারণা করতে তবুও তিনি তোমাদের তওবা কবুল করেছেন এবং ক্ষমা করেছেন। কাজেই এখন তোমরা তাদেরকে/নিসাদের সুসংবাদ দাও (বাশিরুহুন্না) এবং আল্লাহ যা আদেশপত্র (কাতাবা) জারি করেছেন তা অনুসন্ধান করো (ইবতাগু) এবং তা ভক্ষণ করো/গ্রাস করো (কুলু) এবং আত্মস্হ করো (আশরাবু) যতক্ষণ পর্যন্ত আলোর রেখা সুস্পষ্ট না হয় মন্দতা/পাপাচারের অন্ধকার রেখা থেকে (মিন আল ফাজরি)। অতএব সিয়াম সম্পূর্ণ করো রাত পর্যন্ত (ইলা আল লাইলি)। এবং তাদেরকে সুসংবাদ দিও না যতক্ষণ তুমি সংলগ্ন/চিন্তামগ্ন থাকো (আকিফুনা) মান্যরত অবস্থায় (ফি আল মাসজিদি)। এটাই আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা, তাই সে সীমারেখার নিকটবর্তী হয়ো না। এভাবেই আল্লাহ তার নির্দেশ সমূহ সুষ্পষ্ট করেন যাতে মানুষেরা খাঁটি মানুষ (মুত্তাকি) হতে পারে।

এই আয়াতের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শব্দঃ

রাফাছা মানে approach/ আলোচনার সুত্রপাত করা নিসাদের সাথে যারা শারীরিক অসুস্থতার কারণে বাহিরে যেতে পারে না কিংবা যারা আপনার গৃহে কর্মচারী কিংবা আপনার দায়িত্বে থাকা এতিম অর্থাৎ যারা আপনার উপরে নির্ভরশীল অর্থনৈতিক বা শারীরিক ভাবে। সেকারণে তাদেরকে লিবাসুন বা আবরণ বলা হয়েছে। আমাদের আবরণ যেমন আমাদের সার্বক্ষনিক সংগী এবং আমরা যেভাবে আমাদের আবরণের যত্ন নিই, নিসাদেরও যত্ন নেয়া মুমিনদের দায়িত্ব। ৪ঃ১২৭ এ নিসার অন্তর্ভুক্ত কারা তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে। সমাজের এই নির্ভরশীল অংশটাই হলো নিসা।

নিসা মানে নারী নয়। নিসা শব্দটি এতিম, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী সবার জন্যই প্রযোজ্য তার লিঙ্গ যাই হোক না কেন।

স্পেশাল সিয়াম

সাধারণ/স্বাভাবিক সিয়ামের সময় কালে (২ঃ১৮০-১৮৪) কারো সাথে দিনে রাতে কখনোই কথা বলা যাবে না। কিন্তু এই স্পেশাল সিয়ামে (২ঃ১৮৫-১৮৭) দিনে সিয়াম পালন করে রাতে আলোচনা/কথা বলার বিধান আল্লাহ দিয়েছেন।

এই স্পেশাল সিয়ামটা শুধুমাত্র তাদের জন্যই প্রযোজ্য ছিল যারা কুরআন নাযিলের(প্রচারের) ঘটনাটির ঐতিহাসিক স্বাক্ষী ছিল (ফামান শাহিদা মিনকুম)। এই ঐতিহাসিক ঘটনাটি বিবাহবার্ষিকীর মত প্রতিবছর আসবে না।

কাজেই এই স্পেশাল সিয়াম (দিনে সিয়াম পালন, রাতে আলোচনা করা) সবার জন্য নয়। এই স্পেশাল সিয়ামের উদ্দেশ্য ছিল মুমিনেরা যেন সিয়াম পালনের মাধ্যমে নিজেদের কথা বলা থেকে বিরত থেকে একাগ্রচিত্তে (আকিফুনা) মান্যরত অবস্থায় (ফি আল মাসজিদি) দিনের বেলা কুরআন অধ্যয়ন ও আত্মস্থ করে যাতে মন্দতার/পাপাচারের অন্ধকার থেকে আলোতে আসতে পারে।

আল-ফজর মানে সবসময়, ভোর নয়। ভোরের আরবি হলো সুবাহ।

৩৮ঃ২৮ পড়লেই বুঝতে পারবেন যে মুত্তাকী শব্দের বিপরীত শব্দ হলো আল-ফুজারি। অর্থাৎ খাঁটি মানুষের বিপরীত শব্দ হলে পাপী/মন্দ মানুষ।

৩৮ঃ২৮ “আমরা কি যারা বিশ্বাসী এবং ভারসাম্য রক্ষাকারী (আমিলু আল সালিহাতি) তাদেরকে একইরকম প্রতিদান দিব তাদের মত যারা ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে (মুফসিদিনা)? নাকি আমরা মুত্তাকিদের একই প্রতিদান দিব তাদের মত যারা পাপীষ্ঠ/মন্দ (আল ফুজারি)?”

১৯ঃ২৬ অনুসারে মরিয়ম আল্লাহর কাছে সিয়াম পালনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অতঃপর সে কারো সাথে কথা বলবে না।

অর্থাৎ কথা না বলা হলো অন্যতম একটি শর্ত। কারো সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে মানুষ কি করে একা একা?

উত্তর হলো ১) পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করা বা পরিস্থিতিটা গ্রাস করা (কুল) এবং আত্মস্হ করা (আশরাবু) যেটা মরিয়ম করেছে।

২ঃ১৮৭ তেও কুরআন প্রচারের ঘটনা/পরিস্থিতিতে কুরআনের অধ্যয়ণ ও অনুসন্ধান করতে বলা হচ্ছে, আদেশ গুলো (কাতাবা) কুল ও আশরাবু করতে বলা হচ্ছে।

কাজেই সিয়ামের মূল ও প্রথম শর্ত হলো “কথা না বলা”/যোগোযোগ বিচ্ছিন্ন করে একা থাকা।

এরপর একা একা পরিস্থিতি/ঘটনা/পাপকাজ নিয়ে গভীরে চিন্তামগ্ন থেকে অনুসন্ধান/আত্মসমালচোনা বা পাপের সংশোধন করতে বলা হচ্ছে। এগুলো সবই সিয়াম পালনের অংশ।

অর্থাৎ “শুধুই কথা বলা থেকে বিরত থেকে ঘোড়ার ঘাস কাটা সিয়াম নয়।”

২ঃ১৮৮ “এবং তোমরা একে অপরের সম্পদ (আমওয়ালাকুম) অন্যায় ভাবে ভক্ষণ/গ্রাস করো না (তাকুলু) অথবা প্রশাসকের নিকট পাঠিও না যাতে সম্পদের কিয়দংশ গ্রাস করতে পারো অন্যায় ভাবে এবং সচেতনভাবে।”

২ঃ১৮৯ “তারা তোমাকে জিজ্ঞাসা করে কখন আওয়াজ তোলা/প্রতিবাদ করা উচিৎ (আহিল্লা)। বলুন “প্রয়োজনের সময় (মাওয়াকিতু) মানুষের জন্য (লিন্নাসি) এবং যুক্তিতর্কের/বিরোধের (আল-হাজ্জ) সময়। এবং এটি উদারতা নয় (আল-বিরা) যে কেউ ষড়যন্ত্রের জাল বুনে (বুয়ুতু, ৪ঃ৮১,৪ঃ১০৮) পিছনে থেকে, বরং উদারতা হলো যে আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করে (ইত্তাকু) এবং ষড়যন্ত্রকে (বুয়ুতু) সামনে এনে তা উন্মোচন করে দেয় (ওয়া আতু)। এবং আল্লাহর সাথে সংযোগ স্থাপন করো (ইত্তাকু) যাতে তোমরা সফলকাম হও।”

২ঃ১৯০ “লড়াই করো (কুতিলা) আল্লাহর পথে যারা তোমাদের সাথে লড়াই করে কিন্তু আগ্রাসন করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ আগ্রাসীদের পছন্দ করেন না।”

২ঃ১৯১ “এবং লড়াই করো (কাতিলু) তাদের সাথে যেখানেই তাদের অতিক্রম করা যায় এবং তাদেরকে উচ্ছেদ করো সেখান থেকে যেখান থেকে তারা উচ্ছেদ করেছিল তোমাদের। এবং অত্যাচার/নির্যাতন (ফিতনা) হলো লড়াই (কাতিল) এর চেয়েও জঘন্য পাপ। এবং নিষিদ্ধ মসজিদের ব্যাপারে তাদের সাথে লড়াই করো না যদি না তারা সে ব্যাপারে লড়াই করে তোমাদের সাথে। কিন্তু তারা যদি লড়াই করে, তাহলে তোমরাও তা প্রতিহত করো। এটাই সত্য অস্বীকারকারীদের (কাফির) প্রাপ্য কর্মফল।”

২ঃ১৮০-১৯১ এর বিষয়বস্তু হলো

১) উইল করা মুমিনের কর্তব্য যা কুতিবা বা আদেশ করা হয়েছিল।

২) যে উইল পরিবর্তন করে সে পাপ করে।

৩) সেই পাপের সংশোধন হিসাবে সাধারণ সিয়াম পালন করতে হবে (২ঃ১৮৩-১৮৪)। আর তা হলো নির্দিষ্ট সময়কাল পর্যন্ত কথা বলা থেকে বিরত থেকে আত্মসংশোধন করা।

৪) এই সাধারণ সিয়াম অতীত পূর্বপুরুষ থেকে ভবিষ্যত সকলের জন্য প্রযোজ্য। এটি হলো কথা বলা থেকে বিরত থেকে/ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে আত্মসংশোধন মূলক সিয়াম।

৫) এই সাধারণ সিয়ামের বিকল্প হিসাবে গরীব খাওয়ানো, দাস মুক্ত করা ইত্যাদি ব্যবস্থা আছে পাপের মাত্রার উপরে নির্ভর করে (৫ঃ৯৫, ৪ঃ৯২ ইত্যাদি)

৬) ২ঃ১৮৫-১৮৭ হলো স্পেশাল সিয়াম যেখানে টানা কথা বলা থেকে বিরত থাকার বদলে রাত পর্যন্ত বিরত থাকার বিধান দিয়েছেন। কারণ এটি আত্মসমালোচনা বা সংশোধনমূলক সিয়াম নয়। এটি ছিল কুরআন নাযিলের(প্রচারের) সময় মুমিমদের কুরআন অধ্যয়ন ও আত্মস্হ করার উদ্দেশ্যে জারিকৃত সিয়ামের আদেশ।

৭) এই সিয়াম পালন এবং কুরআন নাযিল (প্রচারের) সময়ে ২ঃ১৮৮ অনুসারে মুমিনদের উপরে আঘাত এসেছিল, তাদের সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল।

৮) সেকারণে ২ঃ১৮৯ তে প্রতিবাদের সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করছে মুমিনরা। মানুষের প্রয়োজনে এবং বিরোধের সময়েই প্রতিবাদ করতে হবে এবং তাদের সাথে লড়াই করতে হবে যারা এই অন্যায় নির্যাতন করেছিল। তবে আগ্রাসী হওয়া যাবে না। নির্যাতনকারীদেরও তাদের দখল করা মুমিনদের সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। সেজন্য লড়াই করতে হবে।

৯) ২ঃ১৯১ অনুসারে কাফিরদের সাথে তাদের নিষিদ্ধ মাসজিদ (মাসজিদ আল হারাম) /তাদের শিরকী বিশ্বাস নিয়ে লড়াই করার আপাতত প্রয়োজন নেই যদি না তারা এ ব্যাপারে লড়াই করে। কারণ মুমিনদের লড়াই করার মূল উপপাদ্য ছিল তাদের হারানো সম্পত্তি পুনরুদ্ধার করা।

এসব বিরোধের সম্ভাবনার কারণেই শুরুতেই ২ঃ১৮০ তে দলিল লেখক দ্বারা সম্পত্তি উইল করার আদেশ জারি করা হয়েছিল।
রহমত বরকতের মাস এ রোজা?

এ কেমন রহমত ও বরকতের মাস প্রচন্ড রোদের তাপ অথচ পানি পর্যন্ত খাওয়া যাবে না!?

আর মাত্র কয়েকদিন পরেই শুরু হতে যাচ্ছে রোজা পাশাপাশি রোদ্রের তাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে, দিন মজুর খেটে খাওয়া মানুষের জন্য এই রোজা যে কতটা ভয়ঙ্কর জুলুম তা কোন ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।

এ কেমন ধর্মান্ধতা? এ কেমন ধর্মের বিধান যা মানুষের নফসের উপরে জুলুম করতে বাধ্য করে?

এই রোজা যে কতটা ভয়ংকর জুলুম তা মসজিদের কোণে বসে ইমামতি হুজুরগিরি এবং বুজুর্গগিরি করে টের পাওয়া যাবে না, এবং টের পাওয়া যাবে না অফিসের এসি রুমে বসে থেকে, অথবা ঘরের ভিতরে শুয়ে শুয়ে মোবাইল ল্যাপটপ নিয়ে টাইম পাস করে।
বরং একজন দিন মজুর খেটে খাওয়া কৃষক শ্রমিকদের জিজ্ঞাসা করে দেখুন- যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোদে পুড়ে জীবিকা অর্জন করে, জিজ্ঞাসা করে দেখুন? প্রচন্ড রোদের তাপে ১১-১২ ঘন্টা ভাত পানি না খেয়ে থাকার কষ্টটা কি? যদিও আল্লাহর ভয়ে তারা নিজেদের উপরে জুলুম করে আর্থিক সংকট এবং অসুস্থতার সম্মুখীন হচ্ছে এবং দেহটা শুটকি মাছের মত শুকিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তাদের অবস্থাটা হচ্ছে বুক ফাটে তবুও মুখ ফাটে না, এ যেন এক নীরব যন্ত্রণা ।

অনেক কুরআনের ভাইরাও, এটা যে আল্লাহর বিধান নয় তা মেনে নিতে পারবেনা।অথচ এগুলো আমাদের সমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- কারণ আমরা নিজেরাও এই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে এসেছি, আমরা জানি কতটা কষ্ট এবং যন্ত্রণাময় ছিল ওই সময়টা, যদিও আল্লাহর সন্তুষ্টি ভেবে মনকে সান্ত্বনা দিতে বুঝিয়ে নিতাম।

অতএব জ্ঞানীদের বিবেক দিয়ে চিন্তা করে দেখা উচিৎ যেই আল্লাহ মানুষের প্রয়োজনে কিতাব নাযিল করেছেন এবং মানুষের জীবন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শান্তি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার বিধান দিয়েছেন, যেহেতু তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, সেই আল্লাই কি করে সেই মানুষের উপরেই অমানবিক বিধান দিয়ে খুশি হবেন ।

কি অদ্ভুত একজন মানুষ সারাদিন রোজা রেখে উপোস থেকে অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে কষ্ট করবে!
আর আল্লাহ আসমানের উপরে বসে খুশি হবেন!
না আল্লাহ এত নিষ্ঠুর হতে পারেন না, নিশ্চয়ই এটা ধর্মব্যবসায়ীদের চক্রান্ত যারা কোরআনের অর্থ অনুবাদ পরিবর্তন করে ফেলেছেন।
জ্ঞানীদের এতটুকু চিন্তা করে দেখা উচিৎ,
আল্লাহ কুরআন তার প্রয়োজনের ক্ষেত্রে নাযিল করেননি বরং তিনি মানুষের জীবন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নাজিল করেছেন, অতএব মানুষ নিজের উপরে জুলুম করে আল্লাহকে সন্তুষ্টি করার কথা আল্লাহ কখনোই বলবেন না।
Academic বিশ্লেষণটা বলে ধারণাটি দিচ্ছি। মূলতঃ সিয়াম শব্দটি উদ্ভূত হয়েছে আদি মূল (Proto root) সম (সোয়াদ-মীম) আর ত্রি-আক্ষরিক মূল (Triliteral root) সমাম (সোয়াদ-মীম-মীম) থেকে যার অর্থ হচ্ছে কথা কানে না তুলে কোন সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা (not to listen to SB or sth and/or, to be determined/decided/steadfast, persevering, কোন ব্যক্তি বা কোন কিছুর পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেয়া (to stand for or against Sb or sth).

প্রসঙ্গতঃ এর মূল (Root) হিসেবে বর্তমানে প্রচলিত সোয়াদ-ওয়াও-মীম (সাওম) পার্শিয়ানদের কর্তৃক ইচ্ছাকৃতভাবে ভুলভাবে নির্ণয় করা হয়েছে (কারণ মূলের ক্ষেত্রে কোন vowel আসতে পারবে না, যা আরবি ভাষার ১নং নিয়ম বিরোধী। আরবি ভাষাটাই semitic বা consonantal). অতএব, সাওম বা সিয়াম (কোনটাই plural নয় এবং একই মূল থেকে উদ্ভূত ভিন্ন derivatives মাত্র) এর মধ্যে “বিরত থাকা” বা “সংযমী হওয়া” type এর কোন অর্থই নেই। সুতরাং, এ যাবৎকাল “বিরত থাকা/Abstain” বা “সংযমী হওয়া/Restrain” অর্থ ধরে নিয়ে করা পৃথিবীর সমস্ত অনুবাদ ও গবেষণা মারাত্মক ভুল ও বিপথে গমন মাত্র।
বর্তমান ইসলাম ধর্ম হচ্ছে মানুষ তৈরী। কুরআন এ রোজা রাখার ব্যাপারে কিছুই নাই। অন্য ধর্মের উপবাসের সাথে কমপিট করতে যেয়েই আগের মুসলিম ধর্ম প্রবর্তকরা বা হুজুররা এসব রিচুয়ালের প্রবর্তন করেন। এর পেছনে অনেক ধান্দা ছিলো। সামনের দিনেও আরো অনেক অনুষঙ্গ যোগ হবে, বোঝাই যায়।
রমজান মাস যদি আল্লাহর বিধান হয়,তাহলে এত ঋতুর পরিবর্তন কেন,এটাতো বছরের নির্দিষ্ট সময়ে স্থীর থাকার কথা??

প্রচলিত রোজাটা সিয়াম নয়। সিয়াম হলো স্রষ্টার বিধান জানতে প্রয়োজনীয় কাজ যা করে স্রষ্টায় বিশ্বাস স্হাপনের পর পরই স্রষ্টার স্বরূপ, আদেশ, নিষেধ জেনে স্রষ্টা সচেতন বা মুত্তাকী হওয়া যায়। এটি ব্যক্তি ইচ্ছা নির্ভর যা কোন নির্দিষ্ট মাসে সীমিত নয়।

রোজা রমজান নয়, রমজানও রোজা নয়। আরবিতে “সিয়াম” ফার্সিতে “রোজা” বাংলায় “উপবাস বা কৃচ্ছ সাধন। রমজান আরব দেশের চন্দ্র মাসের নবম ও সবচেয়ে ছোট দিনের মাসটির নাম।
রমজান মাস স্থির রাখতে হলে পৃথিবীর সকল মুছলিমগণকে আরব দেশে হাজির হয়ে রোজা, ঈদ পালন করতে হবে।

সিয়ামের উপলব্ধিঃ

কোরআন পড়লে বিশেষ করে ৯ঃ১১২, ৩৩ঃ৩৫, ৬৬ঃ০৫ আয়াত গুলি থেকে যে কেউ সহজেই বুঝতে পারে যে এটি আল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কিছু স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি নিজেদের অজ্ঞতা ও ক্ষুদ্র স্বার্থের কারনে এই গুরুত্বপূর্ণ বিধানে শব্দবিভ্রাট ও অর্থবিভ্রাট করে এর মূল অন্তর্নিহীত বাস্তবতার শিক্ষা থেকে আমাদের বিভ্রান্ত করছে।

সিয়ামের মূল শিক্ষাটা একনিষ্ঠ ভাবে অবিচল বা অটল থেকে আল্লাহর নাজিলকৃত কিতাব থেকে আল্লাহর বিধান সম্মন্ধে প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এক্ষেত্রে মানুষ আল্লাহর উপরে ঈমান আনার অব্যবহিত পরেই সিয়াম পালনের মাধ্যমে কোরআনের প্রয়োজনীয় বিধান সম্মন্ধে সম্মক জ্ঞান অর্জন করবে যাতে সে মুত্তাকী বা আল্লাহ সচেতন হয়ে কুফর মুনাফেকী ও শির্কমুক্ত জীবন যাপন করতে পারে।

বর্তমানে প্রচলিত রোজা একটি ফার্সী শব্দ আর রোজা নামক রিচুয়ালের উপবাস প্রাচীন জুরাষ্টেরিয়ান রিলিজিয়ন থেকেই এসেছে বলেই প্রতীয়মান।

সিয়াম বুঝার জন্য নিম্নের আয়াত গুলি বাংলা মর্মার্থ সন্নিবেশ করা হলঃ

আল-বাকারাহ 2:183

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ كُتِبَ عَلَيْكُمُ ٱلصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى ٱلَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

হে যারা ঈমান আনলা! তোমাদের প্রতি সিয়াম প্রস্তাবিত করা হয়েছে, যেমন তোমাদের আগের লোকেদের প্রতি প্রস্তাবিত করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকী/আল্লাহসচেতন হতে পার।

আল-বাকারাহ 2:184

أَيَّامًا مَّعْدُودَٰتٍۚ فَمَن كَانَ مِنكُم مَّرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَۚ وَعَلَى ٱلَّذِينَ يُطِيقُونَهُۥ فِدْيَةٌ طَعَامُ مِسْكِينٍۖ فَمَن تَطَوَّعَ خَيْرًا فَهُوَ خَيْرٌ لَّهُۥۚ وَأَن تَصُومُوا۟ خَيْرٌ لَّكُمْۖ إِن كُنتُمْ تَعْلَمُونَ

(সিয়াম) নির্দিষ্ট কয়েকটি দিনের জন্য, অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে পীড়িত কিংবা মুসাফির সে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করে নেবে এবং সিয়ামে সক্ষমের উপর কর্তব্য হচ্ছে ফিদইয়া প্রদান করা, এটা অভাবীকে অভাবমুক্ত করা এবং যে ব্যক্তি নিজের খুশীতে সৎ কাজ করতে ইচ্ছুক, তার পক্ষে তা আরও উত্তম আর তার পরও সিয়াম পালন করাই তোমাদের পক্ষে উত্তম/কল্যানকর, যদি তোমরা বুঝ।

আল-বাকারাহ 2:185

شَهْرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِىٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلْقُرْءَانُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٍ مِّنَ ٱلْهُدَىٰ وَٱلْفُرْقَانِۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ ٱلشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُۖ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوْ عَلَىٰ سَفَرٍ فَعِدَّةٌ مِّنْ أَيَّامٍ أُخَرَۗ يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلْعُسْرَ وَلِتُكْمِلُوا۟ ٱلْعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُوا۟ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمْ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ

গভীর চিন্তার উত্তপ্ত মুহূর্ত/কাল/সময়- কুরআনের জ্ঞান নাযিল করা হয়, যা লোকেদের পথ প্রদর্শক এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট বর্ণনা এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী, কাজেই তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ সময়/কাল পাবে, সে যেন এ সময়ে সিয়াম পালন করে আর যে পীড়িত কিংবা সফরে থাকলে সে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করবে, আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান, যা কষ্টদায়ক তা চান না যেন তোমরা মেয়াদ পূর্ণ করতে পার, আর তোমাদেরকে সৎপথে পরিচালিত করার কারণে তোমরা আল্লাহর মাহাত্ম্য ঘোষণা কর, আর যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার।

আল-বাকারাহ 2:186

وَإِذَا سَأَلَكَ عِبَادِى عَنِّى فَإِنِّى قَرِيبٌۖ أُجِيبُ دَعْوَةَ ٱلدَّاعِ إِذَا دَعَانِۖ فَلْيَسْتَجِيبُوا۟ لِى وَلْيُؤْمِنُوا۟ بِى لَعَلَّهُمْ يَرْشُدُونَ

যখন আমার বান্দারা আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি তো নিকটেই, আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই; সুতরাং তাদের উচিত আমার নির্দেশ মান্য করা এবং আমার প্রতি ঈমান আনা, যাতে তারা সরলপথ প্রাপ্ত হয়।

আল-বাকারাহ 2:187

أُحِلَّ لَكُمْ لَيْلَةَ ٱلصِّيَامِ ٱلرَّفَثُ إِلَىٰ نِسَآئِكُمْۚ هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّۗ عَلِمَ ٱللَّهُ أَنَّكُمْ كُنتُمْ تَخْتَانُونَ أَنفُسَكُمْ فَتَابَ عَلَيْكُمْ وَعَفَا عَنكُمْۖ فَٱلْـَٰٔنَ بَٰشِرُوهُنَّ وَٱبْتَغُوا۟ مَا كَتَبَ ٱللَّهُ لَكُمْۚ وَكُلُوا۟ وَٱشْرَبُوا۟ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَكُمُ ٱلْخَيْطُ ٱلْأَبْيَضُ مِنَ ٱلْخَيْطِ ٱلْأَسْوَدِ مِنَ ٱلْفَجْرِۖ ثُمَّ أَتِمُّوا۟ ٱلصِّيَامَ إِلَى ٱلَّيْلِۚ وَلَا تُبَٰشِرُوهُنَّ وَأَنتُمْ عَٰكِفُونَ فِى ٱلْمَسَٰجِدِۗ تِلْكَ حُدُودُ ٱللَّهِ فَلَا تَقْرَبُوهَاۗ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ ءَايَٰتِهِۦ لِلنَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَتَّقُونَ

তোমাদের জন্য চিন্তার উত্তপ্ত কালের সিয়ামের রাতে তোমাদের অধিন্নস্ত নারীদেরও সিয়ামে সম্পৃক্ত করা জায়িয করা হয়েছে, তারা তোমাদের আচ্ছাদন আর তোমরা তাদের আচ্ছাদন (তোমরা একে অপরের পরিপূরক)। আল্লাহ জানতেন যে, তোমরা (তাদের সম্পৃক্ত না করে মূলতঃ) নিজেদের সঙ্গেই প্রতারণা করছিলে। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করলেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিলেন। অতএব, এখন থেকে তোমরা তাদের সিয়ামে একই ধরনের বুঝে সম্পৃক্ত কর এবং খোঁজ/অনুসন্ধান/তালাশ কর আল্লাহর কিতাব তোমাদের জন্য যা কিছু তিনি বিধিবদ্ধ করেছেন তা লাভ কর এবং তোমরা আহার/গ্রাস/ধারন কর ও পান/শোষন/বুঝতে থাক যে পর্যন্ত তোমাদের জন্য কালো রেখা হতে ঊষাকালের সাদা রেখা প্রকাশ না পায় (অর্থাৎ আল্লাহর বিধান সমূহ দিবালোকের মত স্পষ্ট না হয়)। এভাবেই রাতের আগমন পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ কর, (যাতে হিদায়াত থেকে অন্ধকারে চলে না যাও)আর মাসজিদে/আল্লাহর বিধানে ই’তিকাফ/সর্বদা লেগে থাক ও এ অবস্থায় কোন অবস্থায় সময়ের অপচয় করো না। এসব আল্লাহর আইন, কাজেই অপচয়ের নিকটবর্তী হয়ো না। আল্লাহ মানব জাতির জন্য নিজের আয়াত সমূহ বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা মুত্তাকী/আল্লাহ সচেতন হতে পারো।

এছাড়াও কোরআনে আরো কিছু আয়াত রয়েছে যেখানে সিয়াম পালনের তাগিদ রয়েছে। এই সিয়াম গুলি বিভিন্ন কৃত অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট বলেই প্রতীয়মান। যদি কখনো কোন মুত্তাকী বা আল্লাহ সচেতন ব্যক্তি তার মুত্তাকী বৈশিষ্ট হারিয়ে ফেলে, কেবল মাত্র সে ক্ষেত্রেই ঐ রকম অপরাধ সংঘটিত করতে পারে তাই তার বা তাদের শাস্তি ও সংশোধনের জন্যই আল্লাহ পুনরায় সিয়ামের বিধান দিয়েছেন।

২ঃ১৯৬ – হজ্জ ওমরাহ তে তিন দিন ও সাত দিন সহ দশ দিনের সিয়াম।

৫ঃ৯৫ – অযাযিত ভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার আইন অমান্য করলে বা শিকার করে ফেললে স্থানীয় আইন সহ আল্লাহর বিধান বুঝতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক দিনের সিয়াম।

৪ঃ৯২ – বিশ্বাসী চিনতে না পেরে ভুল করে হত্যা করে ফেললে দুই মাসের সিয়াম।

৫ঃ৮৯ – শপথ ভংগের কাফফারার জন্য তিন দিনের সিয়াম।

৫৮ঃ০৪ – জিহারের মত অশ্লিল আহাম্মকির জন্যও দুই মাস সিয়াম।

লাইলাতাস-সিয়াম= সিয়ামের রাত।

২:১৮৭ আয়াতে সিয়ামের রাতে যা হালাল তা বর্ণনা করা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, সিয়ামের রাত কোনটা?
দিনে সিয়াম তার পরে যে রাত আসে সেটাই কি সিয়ামের রাত??
আল্লাহ যেহেতু “সিয়ামের রাত” উল্লেখ করেছেন, তাহলে সিয়ামের রাত মানে সিয়াম অবস্থায় যে রাত।

তাহলে ২:১৮৭ আয়াত মতে সিয়াম রাতে। এবং সেই অবস্থায় যা বৈধ তা উল্লেখ করা হয়েছে। যাহা অনেকে সিয়াম অবস্থায় অবৈধ জানে ও আলোচনা আছে।
বিষয়টি আমার কাছে আয়াত অনুযায়ী এরকমই লাগছে, আয়াতের অর্থও এটাই দাড়ায়।

হয়তো অনেক উপলব্ধি অন্য রকম হবে। আমার উপলব্ধি আয়াতের শাব্দিকভাবে এরকমই।

কুরআনের সাথে নিরব বিরোধ রয়েছে হাদীসের, এটা অনেকেই এখন বুঝতে পারতেছে।
তাই প্রচলিত সিয়ামও হাদীসের কঠিন একটি ষড়যন্ত্র। আয়াত ভালো করে না পড়লে বিষয়টি ধরতে পারা খুবই কঠিন একটি কাজ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *